ডিসেম্বর এলেই পরিষ্কার
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গ করা শহীদ ও দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা রাজবাড়ির সূর্য সন্তানদের স্মৃতির উদ্দেশে তৈরি করা হয়েছিল এখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিফলক ও বধ্যভূমি।
প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর এলাকাবাসী এ স্মৃতিফলকের দেখভাল করলেও ধীরে ধীরে সে উৎসাহে ভাটা পড়ে। এরপর থেকে ক্রমেই অযত্ন আর অবহেলায় এ বধ্যভূমি অনেকটা পরিত্যক্ত ও অব্যবস্থাপনায় পড়ে থাকে। বলতে গেলে বছরের প্রায় ১১ মাস এটি অরক্ষিত ও অপরিষ্কার থাকে। ডিসেম্বর মাস এলেই হাতেগণা কয়েকদিনের জন্য এ স্মৃতিফলকের ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়।
রাজবাড়ি অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত রাজবাড়ি-কুষ্টিয়া সড়কের পাশে রাজবাড়ি কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের সামনে নির্মিত হয় মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিফলক। যুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতায় শহীদ হওয়া বাঙালিদের গণকবর রাজবাড়ি শহরের লোকশেড এলাকায় রয়েছে বধ্যভূমি।
এ অঞ্চলের সবচেয়ে গৌরবগাথার সাক্ষী হয়ে থাকা এ দুই স্থান সারাবছর থাকে জীর্ণশীর্ণ। আগাছা আর ময়লা আবর্জনার স্তূপ। শুধু ডিসেম্বর এলেই তা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিফলকটি রাজবাড়ি-কুষ্টিয়া সড়কের পাশে হওয়ায় যানবাহন চলাচলের কারণে ধুলা-বালুতে ভরে আছে। স্মৃতিফলকের বেদী ও চারপাশে বাদাম, বিভিন্ন খাবারের প্যাকেট, সিগারেটের উচ্ছিষ্টসহ নানান আবর্জনা জমে আছে। চারপাশ ভরে আছে আগাছায়।
এমনকি ফলকের নামফলকের উপরের অংশ খসে পড়েছে। কিন্তু এ নিয়ে ভ্রুক্ষেপ নেই দায়িত্বশীলদের। এছাড়া অনেক সময় নানান বয়সী লোকজনদের স্মৃতিফলকের স্থানে আড্ডা দিতে দেখা যায়।
এদিকে শহরের লোকশেডে নির্মিত বধ্যভূমিটি একটু জনমানব শূন্য। কিন্তু এর ভেতরে অবাধে যাতায়াত করছে স্থানীয়রা। বধ্যভূমির ভেতরে বিভিন্ন স্থানে অনেকেই গরুর গোবর শুকিয়ে জ্বালানি বানাচ্ছে। রেলিংয়ের উপর দিয়ে কাঁথা, লেপ, তোষক রোদে শুকাচ্ছে।
এছাড়া গরু-ছাগলও ভেতরে বিচরণ করছে অবাধে। পেছনের অংশে রেলিংয়ের কিছু অংশ ভেঙে নিয়ে গেছে কেউ। কিন্তু তা আর মেরামত করা হয়নি। বধ্যভূমির চারপাশে আগাছা ভর্তি। এর সামনের অংশজুড়ে নোংরা আবর্জনার স্তূপ। জানা গেলো, এখানে রাতে বসে মাদকের আড্ডা। মাদক গ্রহণের কিছু সরঞ্জামও ভেতরে পড়ে থাকতে দেখা গেলো।
বধ্যভূমির পাশের বাসিন্দা গৃহবধূ জহুরা বেগম জানান, এখানে আগে একজন পাহারাদার ছিলেন। তিনি এটি পরিষ্কার রাখতেন। এখন আর ওই ব্যক্তি নেই। তাই অযত্ন অবহেলায় এ রকম অবস্থা। ভেতরে গরু-ছাগল ঢুুকছে হরহামেশাই। গেট থাকলেও তা ভেঙে গেছে। কর্তৃপক্ষ সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেয় না।
স্থানীয় বাবলু সরদার জানান, এখন বছরে একবার এটি পরিষ্কার করা হয়। পেছনের পাইপগুলো চোরে নিয়ে গেছে। এখানে একজন লোক নিয়োগ করা হলে আগের মতো পরিছন্ন থাকতো। তার দাবি এখানে জাতীয় পতাকা উড়ুক ও আগের পরিবেশ ফিরে আসুক।
স্থানীয় হাফিজুল শেখ বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। মা-বাবার কাছে শুনেছি দেশ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে। এখানে বধ্যভূমি অবহেলিতভাবে পড়ে রয়েছে। এ বধ্যভূমিটি রক্ষার্থে সরকারে হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
এসব বিষয়ে জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার মোহাম্মদ আলী জানান, মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিফলক ও বধ্যভূমি এলাকায় প্রাচীর নির্মাণের জন্য ২০-২৫ দিন আগে জেলা প্রশাসককে জানিয়েছেন তারা। সেখানের অব্যবস্থাপনা এখন চরমে পৌঁছেছে।
এছাড়া মদ, গাঁজা, ফেনসিডিলের আসর বসছে। মল-মূত্র ত্যাগ করছে অনেকে। দেখার কেউ নেই। এখন পর্যন্ত সরকার কোন ব্যবস্থা নেয়নি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে ফান্ড নেই। ফান্ড আসলে কাজ করবে। তিনি দ্রুত মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিফলক ও বধ্যভূমি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
রাজবাড়ি গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রোকৌশলী মো. জাকির হোসাইন জানান, পরিষ্কার পরিছন্ন বা রঙের কাজ শুরু করা হয়েছে। দিবসের আগেই সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত করা হবে।
রুবেলুর রহমান/এএম/পিআর