আয় কমেছে সিএনজি চালকদের
প্রথম দিকে শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের মাঝে ব্যক্তিগত গাড়ির মতো ব্যবহার হতো সিএনজি অটোরিকশা। শহরে অতিমাত্রায় সিএনজি বাড়ার পাশাপাশি গ্রামগুলোতেও জনপ্রিয় হয়ে উঠে এ তিন চাকার যান।
বাসের অপেক্ষায় বসে না থেকে সিএনজি ভাড়া করে পথচলা শুরু হয় সাধারণ মানুষের। দেশের অন্যান্য মহাসড়কের মতো ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কেও ব্যতিক্রম হয়নি।
দেশের অন্যতম ব্যস্ত ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে তিন চাকার যান চালাতে প্রতিনিয়ত যানজট শুরু হয়। বাড়তে থাকে সড়ক দুর্ঘটনা।
জানা যায়, মহাসড়কগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ২০১৫ সালের ১ আগস্ট থেকে মহাসড়কে সিএনজি চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। শ্রমিকদের আন্দোলন রুখতে আর চালকদের অভ্যাসে ফিরিয়ে আনতে ১ আগস্ট থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও পুলিশি টহলে মহাসড়কে অনেকটাই কমে আসে সিএনজি-অটোরিকশা চলাচল।
সরেজমিনে দেখা যায়, বর্তমানে মহাসড়কে সিএনজি চলাচল নিষিদ্ধ হওয়ায় স্থানীয় সড়কগুলোতে সিএনজির চাপ বেড়েছে দ্বিগুণ। মহাসড়কের প্রবেশ পথে সিএনজির ভিড় দেখা গেলেও পুলিশি আতঙ্কে অধিকাংশ সিএনজি মহাসড়কে ঢুকতে সাহস পায় না।
এদিকে অধিকাংশ সিএনজি গ্যাস পাম্প মহাসড়ক সংলগ্ন হওয়ায় গ্যাস সংগ্রহ না করতে পেরে স্থানীয় সড়কগুলোতেও সিএনজি চালাতে পারছে না তারা। এতে কয়েক হাজার সিএনজি চালকদের উপার্জন অর্ধেকে নেমে এসেছে। পাশাপাশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে মহাসড়ক হয়ে ভ্রমণকারী ৯ উপজেলার যাত্রী সাধারণের।
রোগিবাহী সিএনজির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা সহনীয় হলেও উত্তর টাঙ্গাইল ও দক্ষিণ টাঙ্গাইলের রোগীবাহী সিএনজি মহাসড়ক হয়ে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসতে চায় না চালকরা।
ফলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক হয়ে জেলার অন্যতম স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালে যেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে জেলার প্রতিটি উপজেলার রোগীদের।
এ কারণে সবচেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছে স্বল্পআয়ের মানুষেরা। না পারছে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে না পারে সিএনজি চালকদের রাজি করতে। দুর্ঘটনা বন্ধে মহাসড়কে সিএনজি চলাচল নিষিদ্ধ করার আগেই পর্যাপ্ত লোকাল বাসের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন যাত্রীরা। এ কারণে লোকাল যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
এ প্রসঙ্গে সিএনজিচালক লাভলু মিয়া বলেন, মহাসড়ক ব্যবহার করতে না পেরে অধিকাংশ রিজার্ভ টিপ বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় সড়কে সিএনজি চাপ থাকায় দিনে তিন চারটির বেশি টিপ পাওয়া যায় না।
এক ভাড়াটে সিএনজি চালক বলেন, স্থানীয় সড়কে সিএনজি বেশি থাকায় প্রতিদিনের উপার্জন কমে এসেছে অর্ধেকে। বর্তমানে যে উপার্জন হচ্ছে তাতে মালিকের প্রতিদিনের জমা ৫০০ টাকা দেয়ার পর চালকের পারিশ্রমিক থাকছে না।
এদিকে মহাসড়কে সিএনজি চলাচল নিষিদ্ধ হওয়ায় চালক ও যাত্রীদের নিরাপত্তা বেড়েছে। মহাসড়কে অবাধে সিএনজি চলাবস্থায় প্রতিনিয়ত ঘটতো ছিনতাই। ফলে মাঝে মাঝেই রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখা যেত অজ্ঞাত মরদেহ।
পুলিশের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, সিএনজি ছিনতাই করে চালকের মরদেহ ফেলে গেছে দুর্বৃত্তরা। পুলিশ ও চালকসহ সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, মহাসড়ক হয়ে ছিনতাইকারীরা সিএনজি নিয়ে লাপাত্তা হতো। কিন্তু মহাসড়কে সিএনজি চলাচল নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে গত দেড় বছরে সিএনজি ছিনতাই বা চালকের মরদেহ পাওয়া যায়নি।
এছাড়া মহাসড়কে সিএনজি চলাচল বন্ধ হওয়ায় দুর্ঘটনাও অনেকাংশে কমেছে বলে স্বীকার করেন একাধিক সিএনজি চালক। এতে চালক ও যাত্রীদের নিরাপত্তা বেড়েছে বলেও মনে করছেন চালক ও যাত্রীরা।
সিএনজি চালক মিন্টু মিয়া বলেন, মহাসড়কে সিএনজি চলাচল নিষিদ্ধ হওয়ায় উপার্জন কমেছে। তাই তাদের এখন অনেক রাত পর্যন্ত সিএনজি চালাতে হচ্ছে। তবে এখন রাতে সিএনজি চালালেও তদের কোন ভয় নেই।
কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, মহাসড়কে সিএনজি বন্ধ হওয়ার পর থেকে সিএনজি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেনি। সেক্ষেত্রে নিরাপত্তার সঙ্গে কম উপার্জন ভালো বলে মনে করেন তিনি।
স্থানীয় শ্রমিক নেতা রহুল আমীন বলেন, মহাসড়কে সিএনজি চলাচল নিষেধ হওয়ায় শ্রমিকদের উপার্জন কমেছে। তবে সড়ক দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তা অনেকাংশে বেড়েছে।
তার অভিযোগ, শ্রমিক সিএনজি নিয়ে পাম্পে যাওয়ার জন্য মহাসড়কে পাড়ি দিতে পুলিশের কাছে বিড়ম্বিত হতে হচ্ছে। চালকদের পুলিশ বলেন, মহাসড়ক বাই পাস হওয়ার নিয়ম আছে। কিন্তু মহাসড়ক ব্যবহার করার নিয়ম নেই।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের সঙ্গে গোপনে সমন্বয় করতে পারলে সেক্ষেত্রে সমস্যা হয় না। মহাসড়কে সিএনজি বন্ধের পদক্ষেপে সরকারকে সাধুবাদের পাশাপাশি পুলিশের হয়রানি বন্ধের জোর দাবি জানান এ শ্রমিক নেতা।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা-টাঙ্গাইল হাইওয়ে পুলিশের মির্জাপুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. খলিলুর রহমান বলেন, পাম্পে যেতে মহাসড়ক ব্যবহারের জন্য সকাল ৮ পর্যন্ত সময় দেয়া আছে। পাম্পের মালিকদেরও সে নিয়ম বলা আছে। সেক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে সিএনজি পাম্পে গেলে পুলিশ কোনো হয়রানি করছে না।
তিনি আরও বলেন, হাইকোর্টের দেয়া আদেশ মতে এ মহাসড়কে সিএনজি মুক্ত রাখতে পেরেছি। তবে পৌরসভা ও ক্রসিং এলাকায় এ নিয়ম সিথিলযোগ্য। তবে চারলেনের কাজটি শেষ হলে মহাসড়কে ছোট যান চলাচলের আলাদা রাস্তা থাকবে। তখন সব সমস্যাই সমাধান হবে।
আরিফ উর রহমান টগর/এএম/পিআর