শাস্তি পাওয়া সেই ইন্টার্ন চিকিৎসকের হাতে হ্যান্ডমাইক


প্রকাশিত: ১০:৩২ এএম, ০৫ মার্চ ২০১৭

বগুড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে দুর্ব্যবহারকারী চার ইন্টার্ন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া সেই চারজন ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দিয়ে জোর করেই ধর্মঘট করাচ্ছেন। সেই সঙ্গে সকাল ১০টার পর এক ঘণ্টার জন্য মানববন্ধনে নিয়ে আসা হয়েছে মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের।

রোববার সকালে মানববন্ধন ও ধর্মঘট চলাকালে শাস্তি পাওয়া সেই ইন্টার্ন চিকিৎসক কুতুব উদ্দিন হ্যান্ডমাইক হাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করেন। এ নিয়ে শাস্তমন্ত্রীকে দুষলেন ইন্টার্ন চিকিৎসক কুতুব উদ্দিন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ইঙ্গিত করে কুতুব উদ্দিন বলেন, শাস্তি দিলে দুপক্ষকেই দেয়া উচিত। একটি বিশেষ এলাকার লোক হওয়ায় রোগীর স্বজনদের ছাড় দেয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটি মিথ্যা রিপোর্ট দিয়েছে। তাই শাস্তি প্রত্যাহারসহ আমাদের দাবি না মানলে ধর্মঘট চলতেই থাকবে। এ সময় তার সঙ্গে শাস্তি পাওয়া অন্যরাও ছিলেন।

এদিকে, রোববার বেলা ১১টায় শজিমেক হাসতালের বহির্বিভাগের সামনে কাঁদছে ৬ বছরের শিশু আকলিমা। শ্বাসকষ্ট রোগে আক্রান্ত শিশুটি। মা আবেদা বেগমের কোলে হাপিয়ে হাঁপিয়ে। বাইরে থেমে থেমে চলছে বৃষ্টি ঝড়ো বাতাস।

এই বৈরি আবহাওয়ার মধ্যেই তারা এসেছে ২০কিলোমিটার দূরে মহাস্থানের চন্ডিহারার নামাপাড়া গ্রাম থেকে। ৯টায় বহির্বিভাগ খোলার কথা। আবেদার মতোই অন্যান্য আরও দুই শতাধিক রোগী এসেছেন সকাল ৮টায়।

কিন্তু বহির্বিভাগ খোলা হচ্ছে না। কারণ বাইরে ক্যাম্পসে তখন চলছে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বিক্ষোভ সমাবেশ। টানা কর্মবিরতির কারণে তারা নিজেরাও হাসপাতালের কাজে যোগ দিচ্ছেন না।

আবার রোববার সকালে বহির্বিভাগে কর্মরত অন্যদের শাসিয়ে গেছে যাতে বেলা ১২টার আগে কোনো কাজকর্ম চালু করা না হয়। সে কারণে এই অচলাবস্থা।

সকালে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (শজিমেক) গিয়ে মিলেছে আগত রোগীদের নানা দুর্ভোগের চিত্র। হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে ৫৫ বছরের বৃদ্ধ মা হালিমা খাতুনকে নিয়ে ট্যাক্সির জন্য দাঁড়িয়ে আছেন কন্যা মেহেরুন নেছা।

বললেন, ‘মা লিয়া আসিসনু। এটি কেম্বা মিছিল চলিচ্চে। মাইকিং করিচ্চে। হামার মাও ভয় খাছে। এটি বলে থাকপিনা। তাই অন্যটি লিয়্যা যাচ্চি।’

জেলার সোনাতলা থেকে আসা একজন রোগীর ছেলে আবু তাহের পেশায় ব্যাংকার। সকালে তার অসুস্থ বাবাকে হাসপাতালে দেখে কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন।

হাসপাতালের গেটে জানালেন, এটি বড় হাসপাতাল। ২-৪ জন শিক্ষার্থী হাজার হাজার রোগীকে জিম্মি করে আন্দোলন চালাবে, আর সরকার শক্ত পদক্ষেপ নেবে না এটি মানা যায় না। আসলে তাদের সঙ্গে ইন্ধনদাতাদেরও উপযুক্ত শাস্তি দেয়া দরকার।

দেখা গেছে, টানা চতুর্থ দিনেও কাজে যোগ দেয়নি বগুড়া শজিমেক হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। রোববার আউটডোর ও মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দিয়ে হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে।

অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রলীগ নামধারী কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক মেডিকেল কলেজ বন্ধ রেখে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের তাদের সঙ্গে আসতে বাধ্য করে। অনেকেই এতে রাজি না হলে হুমকি ধামকি দেয়া হয়।

তবে নাম প্রকাশে সাংবাদিদের কাছে এসব তথ্য দিতে রাজি হয়নি কেউ। সকাল ১০টা থেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে মানববন্ধন ও মিছিল করে। এই সময় হাসপাতালে চিকিৎসা সেবায় কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে।

মানববন্ধন থেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মুখপাত্র শাস্তি পাওয়া কুতুব উদ্দিন হ্যান্ডমাইক নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের বিরুদ্ধে সরাসরি বিষদগার করেন।

রোববার সকালে প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটকের সামনে রাস্তার উপর ইন্টার্ন চিকিৎসকসহ কলেজের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধনে যোগ দেয়।

পরে তারা ১১টার দিকে মিছিল নিয়ে মেডিকেল কলেজের দিকে যায়। মানববন্ধন কালে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা হাসপাতালের বহির্বিভাগ দুপুর ১২টা পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করে। এছাড়া ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মেডিকেল কলেজের ক্লাস ১ ঘণ্টার জন্য বন্ধ রেখে মানববন্ধনে শিক্ষার্থীদের আসতে বাধ্য করে।

বহির্বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, অনেক রোগী বাহিরে বসে আছে। বহির্বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ করে কর্তব্যরতরা অন্য জায়গায় বসে রয়েছেন।

বগুড়ার ধাওয়া পাড়া থেকে বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসা রোকেয়া বেগম জানান, দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরে জানিয়ে দেয়া হয় মানববন্ধন কর্মসূচির জন্য ১২টার আগে কোনো টিকেট দেয়াসহ রোগী দেখা হবে না।

শহরের চেলোপাড়া থেকে আউটডোরে চিকিৎসা নিতে রেজাউল জানান, তার শিশুর চিকিৎসার জন্য আউটডোরে গেলেও বলে দেয়া হয় ১২ টার আগে টিকেট দেয়া হবে না।

শজিমেক জরুরি বিভাগের ইনচার্জ মাইকেল ডেভিড জানান, ইন্টার্ন চিকিৎসকরা আন্দোলনে থাকলেও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলছে। গত ৪ দিনে পর্যায়ক্রমে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। চলতি মার্চ মাসের ১ তারিখে জরুরি বিভাগে ১৫৩ রোগী, ২ মার্চ ১৫৪ জন, ৪ মার্চ  ২২৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

বগুড়া শজিমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. নির্মূলেন্দু চৌধুরী জানান, ইন্টার্ন চিকিৎসকরা প্রতিদিন আউটডোরে ১ ঘণ্টা রোগী না দেখার প্রস্তাব করলেও তা মানা হয়নি। হাসপাতালে রোগী সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সরা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে সেবা প্রদান করছেন।

জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক শরিফুল রেজোয়ান জানান, ইন্টার্ন চিকিৎসকরা না থাকায় অতিরিক্ত সময় দিতে হচ্ছে হাসপাতালে। এতে চিকিৎসকদের একটু কষ্ট হচ্ছে। তারপরেও পেশার কারণে অনেক কিছুই মেনে নিতে হচ্ছে। তবে বিষয়টি অনুধাবন করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মসূচি শিথিল করা প্রয়োজন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেডিকেল কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, তাদেরকে এক রকম জোর করেই সকাল ১০টার পর এক ঘণ্টার জন্য মানববন্ধনে নিয়ে আসা হয়েছে। ১ ঘণ্টা কলেজ বন্ধ থাকা বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর একেএম আহসান হাবীবকে বারবার ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিফ করেননি।

লিমন বাসার/এএম/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।