৪৬ বছরেও বলা হয়নি মাকে বলা ছেলের শেষ কথা


প্রকাশিত: ০৩:৪১ পিএম, ২৭ মার্চ ২০১৭

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে ৪৬ বছর। আমি আজও শহীদ রঞ্জিতের মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারিনি। বলতে পারিনি রঞ্জিতের বলে যাওয়া কথাগুলো।

সেই কথাগুলো না বলার বেদনা আজও আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। যখন আমি একা থাকি তখন মনে হয়, আমি আজও কেন রঞ্জিতের মাকে খুঁজে পেলাম না। কেন বললাম না রঞ্জিতের শেষ কথাগুলো। রঞ্জিতের মাকে দিয়ে যাওয়া কথাগুলো ৪৬ বছরেও বলা হয়নি। আমি আজও খুঁজছি সেই গর্বিত মাকে।

এমন আক্ষেপ ও বেদনা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা বর্তমানে ময়মনসিংহ মহানগর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সদস্য সচিব সেলিম সরকার রবার্ট।

সেলিম সরকার বলেন, ’৭১’র ৩ নভেম্বর ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের তেলিখালী সীমান্ত ফাঁড়িতে পাকহানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার আগে আমার সহযোদ্ধা বন্ধু ছিলেন রঞ্জিত গুপ্ত। তার বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার সদর উপজেলার বিদ্যাগঞ্জ গ্রামে।

রঞ্জিত গুপ্ত যুদ্ধে যাওরার আগে বলেছিল, ‘আমি যদি যুদ্ধে গিয়ে মারা যাই এবং কোনো দিন যদি দেশ স্বাধীন হয়, তবে আমার মাকে গিয়ে বলিস, মা আপনার ছেলে শহীদ হয়েছে। সেই সঙ্গে মাকে বলবি, মা আপনার এক পুত্র দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে, শহীদ হয়েছে। আপনার আরেক পুত্র আমি বেঁচে আছি।’

কিন্তু এ কথাগুলো ৪৬ বছরেও আমি বলার সাহস পাইনি। খুঁজে পাইনি আজও রঞ্জিতের গর্বিত মাকে। এটা আমার জীবনের বড় দুঃখ। যখনই একা একা থাকি তখনই এ কথাগুলো মনে হয়। আর আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হতে থাকে। বুকটা যেন ভেঙে যায়। এই বিষয়টি আমার জীবনের একটি স্মরণীয় মর্মান্তিক ঘটনা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা সেলিম সরকার বলেন, ১৯৭১ সালে আমি ক্লাস টেনের ছাত্র। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক জনসভা শোনার জন্য ঢাকায় গিয়েছি। সেই সভায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের জন্য মনে মনে প্রস্তুতি নিতে থাকি।

প্রতিদিন সংগ্রাম আর আন্দোলন বাড়তে থাকে। ময়মনসিংহে প্রতিদিন মিটিং-মিছিল হয়। আমি যোগ দেই। এভাবে চলছিল। এর মধ্য দিয়ে আসে ২৫ মার্চের কালরাত।

পাকহানাদারদের পৈশাচিক বর্বরতা। যা বর্তমানে গণহত্যা দিবস। পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম একটি কালরাত। পরের দিন ময়মনসিংহে খবর আসলো ঢাকায় পাকহানদারদের নির্মম গণহত্যার খবর।

ময়মনসিংহের শহরতলী খাগডহরে ইপিআর ক্যাম্প (বর্তমান বিজিবি সেক্টর হেড কোয়ার্টার) সেখানে ২৬ তারিখ রাত থেকেই ইপিআরের পাকসেনাদের সঙ্গে বাঙালি সেনাদের যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। বাঙালি সেনারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই খবর ছড়িয়ে যায় গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।

সকাল থেকে মানুষ, যার যা ছিল বন্দুক, লাঠি, রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ইপিআর ক্যাম্পের চারদিক ঘিরে ফেলে। বাঙালি সেনাদের উৎসাহ ও সাহস দিতে থাকে। এই যুদ্ধে কয়েকজন পাকসেনা নিহত হয়। এক সময় পাকসেনারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

এরপর থেকে আওয়ামী লীগের নেতা রফিক উদ্দিন ভূইয়ার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে থাকে। শুরু হয় জেলাস্কুলের ছাত্রাবাস মাঠে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ।

১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষের দিকে মুক্ত ময়মনসিংহে ঢাকা থেকে রেল ও সড়ক পথে ময়মনসিংহে প্রবেশ করে পাকিস্তানি বাহিনী। ঢাকার সঙ্গে সড়ক পথ ছিল তখন ময়মনসিংহ থেকে টাঙ্গাইল হয়ে।

পাকবাহিনী ময়মনসিংহ প্রবেশ করে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় তারা অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করে। অনেকে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন।

সেদিনের স্মৃতিচারণে মুক্তিযোদ্ধা সেলিম বলেন, ’৭১’র মে মাসের দিকে আমার বন্ধুদের সঙ্গে কড়ইতলী দিয়ে ভারতের শিববাড়িতে যাই এবং সেখান থেকে ঢালু যুবশিবির ক্যাম্পে যাই। ঢালু যুবশিবির প্রধান ছিলেন অধ্যক্ষ মতিউর রহমান (বর্তমান ধর্মমন্ত্রী) তাকে রিক্রট করে মেঘালয় জেলার তোড়া মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠান।

পরে প্রশিক্ষণ শেষে আগস্টে দেশে পাঠানো হয় যুদ্ধ করার জন্য। সেলিম সরকার দেশে এসে বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে সীমান্ত ফাঁড়িতে বেশ কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি সেসব যুদ্ধের মধ্যে স্মরণীয় দুটি যুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। তিনি দুটি যুদ্ধের বর্ণনা দেন।

হালুয়াঘাটের বান্দরঘাটা সীমান্ত ফাঁড়িতে পাকবাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ৬ আগস্ট। রাত ৩টায়। মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর বাঙ্কারে গ্রেনেড হামলা করে অসংখ্য পাকবাহিনীকে হত্যা করে ওই ফাঁড়ি দখল করতে সক্ষম হয়।

যুদ্ধে পাকিস্তানিদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। অস্ত্র ও গোলা বারুদ দখলে নিই আমরা। এই যুদ্ধে আজিজ ও হাকিম নামে দুই মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। যুদ্ধ সারা রাত ও সারাদিন চলে। ১৯৭১ সালের ৩ নভেম্বর হালুয়াঘাটের আরেক সীমান্ত ফাঁড়ি তেলিখালি।

সেখানে শেষ রাতে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনী ১৩ রাজপুত ৯৫-ব্রিগেড ৫৭-মাউন্টেন ডিভিশনের সৈন্যরা যৌথভাবে পাকবাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ চালায়।

শেষ রাত থেকে পরের দিন সারাদিন যুদ্ধ চলে। এই ক্যাম্পে ২০৪ জন পাকসেনার মধ্যে ২০৩ জন পাকসেনা নিহত হয়। রাজাকার পাঁচজন নিহত হয়। একজন ধরা পড়ে।

এই যুদ্ধে আবুল হাশিমের ব্রাভো কোম্পানিসহ মুক্তি যোদ্ধাদের ৫টি কোম্পানি অংশ নেয়। মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানির মধ্যে আবুল হাশমী কোম্পানি, আব্দুল আলিম ভুত, আব্দুল গণি, সার্জেন্ট হালিম ও নাজমুল হক তারা কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধারা অংশ নেন। তেলিখালি যুদ্ধে সাতজন মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর ২৪ জন শহীদ হন।

পরে ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী যৌথভাবে যুদ্ধ করে। মিত্রবাহিনীর কমান্ডার সান্দসিং (বাবাজি) ও মুক্তিবাহিনীর ঢালু যুব শিবির প্রধান অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের নেতৃত্বে বীরের বেশে মুক্ত ময়মনসিংহে প্রবেশ করেন মুক্তিযোদ্ধারা।

তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অসম দেশ প্রেমের কথা বলতে গিয়ে উদাসীন হয়ে বলেন, আমরা তো যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। কোনো কিছু পাওয়ার আশায় নয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য।

১৯৭১ সালের মতো আজ আবার দেশের মুক্তিকামী মানুষ ঐক্যবদ্ধ। জাতির জনকের কন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধারা আজ প্রধানমন্ত্রীর জন্যই সম্মানিত হচ্ছেন।

তিনি বলেন  যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার কারণে স্বাধীনতাবিরোধীরা সেলিম সরকারকে আজ প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে।

আতাউল করিম খোকন/এএম/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।