পলান সরকারকে বই ফেরত দিচ্ছেন না পাঠকরা


প্রকাশিত: ০৬:১৬ এএম, ০৬ মে ২০১৭

আলোর ফেরিওয়ালা পলান সরকার। এলাকায় তার পরিচিতি ‘বইওয়ালা দাদুভাই’, ‘আলোর ফেরিওয়ালা’ নামে। বয়স ৯৭, কিন্তু এখনো যুবক। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে গ্রামে গ্রামে বই বিলান তিনি। বিশেষ করে গৃহিণীদের এনেছেন পাঠকের তালিকায়। পিছিয়ে নেই অন্যান্যরাও।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা বাউসা থেকেই ছড়িয়ে যাচ্ছেন জ্ঞানের আলো। আলোকিত হয়ে উঠেছে আশেপাশের অন্তত ২০ গ্রাম। বয়স হয়েছে পলান সরকারের। শরীরে বাসা বেঁধেছে রোগ। স্মৃতির ফ্রেমে পড়ছে ধুলো। তবু ক্লান্তি নেই পলান সরকারের।

ছয় ছেলে তিন মেয়ের জনক পলান সরকার। তার স্ত্রী রাহেলা বিবি বছর ছয়েক হলো অসুস্থ্য হয়ে বিছানায়। তারপরও এখনো নিয়ম করে বইয়ের ঝোলা কাঁধে বের হন পলান সরকার। বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেন বই। কিন্তু মাঝে মধ্যে ফেরৎ নিতে ভুলে যাচ্ছেন।

পাঠকদের কেউ কেউ এসে পাঠাগারে দিয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ রেখে দিচ্ছেন নিজের কাছেই। ফলে দিনে দিনে খালি হচ্ছে পলান সরকারের পাঠাগার। চাহিদা বাড়লেও আর্থিক সংকটে কেনা হচ্ছে না বই।

বাউসা বাজারের অদূরে এখনকার গেদুর মোড়। সেখানেই পলান সরকারের বাড়ি, বাড়ির পাশে পাঠাগার। 

book

বৃহস্পতিবার দুপুরে গিয়ে বাড়িতে পাওয়া গেলো পলান সরকারকে। তখন বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তিনি। দরজায় কড়া নাড়তেই পাঞ্জাবি পরতে পরতে বেরিয়ে এলেন। হাত ধরে নিয়ে এলেন পাঠাগারে। সঙ্গে এলেন নাতনি বৈশাখী খাতুন।

কিছুক্ষণ পর পাঠাগারে এলেন পলান সরকারের ছেলে হায়দার আলী। উপজেলার খগড়বাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তিনি। তিনিই দেখাশোনা করেন পাঠাগার। বিকেল ৩টা থেকে পাঠাগার খোলা হয়। একসঙ্গে ৩০ জন বসে পড়তে পারবেন পাঠাগারে। রয়েছে সাত হাজারের উপরে বিভিন্ন ধরনের বই।

হায়দার আলী বলেন, তার বাবা এখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। ফলে তার কার্যক্রম কমে এসেছে কিছুটা হলেও। কানে কম শুনছেন, অনেক কিছুই তার মনে থাকছে না। পাঠাগারে এসে বই পড়লে রেজিস্টারে পাঠকের নাম লিপিবদ্ধ করতে হয়। কেউ বাড়ি নিয়ে গেলে সেই রেকর্ডও থাকে। কিন্তু তার বাবা বাড়ি বাড়ি গিয়ে যে বই দিয়ে আসেন তার কোনো রেকর্ড নেই। মনে না থাকায় অনেকেই তা ফিরিয়ে দিচ্ছেন না। ফলে কমে যাচ্ছে সংগ্রহে থাকা বই। হাত খরচের টাকা বাঁচিয়ে এখনও পলান সরকার বই কেনায় কী পরিমাণ বই হারিয়েছে তার হিসেব মেলানো ভার।

বইয়ের ফাঁকা তাক দেখিয়ে তিনি বলেন, বই কেনার মত আর্থিক সংগতি নেই। পাঠাগার চলছে বাবার একুশে পদকের জমানো টাকার লভ্যাংশ দিয়ে। সর্বশেষ দান-অনুদান এসেছে বছর তিনেক আগে। কি মন্ত্রনালয়, কি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কেউই খোঁজ রাখে না এ পাঠাগারের। পাঠাগার পরিচালনা ব্যয় মেটানোই ভার। সহায়তা পেলে এখনো পাঠাগারটি আধুনিক ও তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর করার স্বপ্ন দেখেন হায়দার আলী।

পাঠাগারজুড়ে থরে থরে সাজানো বই। একটি বইয়ের তাকে সাজানো পলান সরকারের যাবতীয় অর্জন। দেয়ালে ঝোলানো হরেক ছবি। মুগ্ধ পাঠকের অভিব্যক্তিও ঠাঁয় পেয়েছে পলান সরকারের পাঠাগারে। চোখ এড়ালো না ফাঁকা তাকগুলোও।

book3

পাঠাগারেই কথা হচ্ছিল পলান সরকারের সঙ্গে। হেঁটে হেঁটে বাইয়ের তাকে চোখ বুলাচ্ছিলেন তিনি। এরই মাঝে এগিয়ে যাচ্ছিল কথা। কথার ফাঁকে বিরাম নিচ্ছিলেন। বোঝা যাচ্ছিল শারীরিক অসুস্থতা। তারপরও বলে যাচ্ছিলেন অবিরাম।

বলছিলেন, গ্রামের বহু মানুষ দরিদ্র ও নিরক্ষর। নিজের ও আশপাশের গ্রামগুলো থেকে অশিক্ষা ও অজ্ঞানতা দূর করতে শুরু করেন আলোর পানে অভিযাত্রা। কবে ঠিক এ যাত্রা শুরু তা জানাতে না পারলেও তা ৩০ বছরের বেশি সময় আগে বলে জানান পলান সরকার।

১৯২১ সালের ১ আগস্ট নাটোর জেলার বাগাতিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন পলান সরকার। বাবা-মা নাম রেখেছিলেন হারেজ উদ্দিন সরকার। তবে মা ‘পলান’ নামে ডাকতেন। পাঁচ বছর বয়সে বাবা হায়াত উল্লাহ সরকারকে হারান পলান। এরপর আর্থিক সংকটে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় চতুর্থ শ্রেণিতেই। পরে নানা ময়েন উদ্দিন সরকার মা মইফুন নেসাসহ পলান সরকারকে নিয়ে আসেন নিজ বাড়ি বাউসায়।

সেখানকার স্কুলে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণির পর ইতি টানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার। তবে থেকেই যায় বই পড়ার অভ্যাস। প্রথমে এরওর কাছ থেকে বই ধার করে এনে পড়তেন। যখন যে বই পেয়েছেন, সাগ্রহে পড়েছেন।

পলান সরকার বড় হয়েছেন নানা বাড়িতে। নানা ময়েজ উদ্দিন সরকার ছিলেন স্থানীয় ছোট জমিদার। যৌবনে তিনি নানার জমিদারির খাজনা আদায় করতেন। দেশ বিভাগের পর জমিদারি ব্যবস্থা বিলুপ্ত হলে বাউসা ইউনিয়নে কর আদায়কারির চাকরি পান। নানার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ৪০ বিঘা সম্পত্তিরও মালিক হন।

ব্রিটিশ আমলেই তিনি যাত্রাদলে যোগ দিয়েছিলেন। অভিনয় করতেন ভাঁড়ের চরিত্রে। হাসাতেন লোক। আবার যাত্রার পাণ্ডুলিপি হাতে লিখে কপি করতেন। মঞ্চের পেছন থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সংলাপও বলে দিতেন। এভাবেই বই পড়ার নেশা জেগে ওঠে তার।

১৯৬৫ সালে ৫২ শতাংশ জমি দান করে বাউসা হারুন অর রসিদ শাহ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন পলান সরকার। ১৯৯০ সাল থেকে বাউসা ওই বিদ্যালয়ে মেধাতালিকায় প্রথম দশটি স্থান অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের বই উপহার দিতেন তিনি।

এরপর অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও বইয়ের আবদার করলে সিদ্ধান্ত নেন তাদেরও বই দেবেন। শর্ত দেন পড়ার পর তা ফেরত দেয়ার। এরপর গ্রামের মানুষ ও তার কাছে বই চাইতে শুরু করেন। ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে বই পড়া আন্দোলন।

book

১৯৯২ সালে ডায়াবেটিকসে আক্রান্ত হন পলান সরকার। ওই সময় তিনি হাঁটার অভ্যাস করেন। এ থেকেই বিদ্যালয় কেন্দ্রিক বই বিতরণ প্রথা ভেঙে বাড়ি বাড়ি বই পৌঁছে দেয়া শুরু করেন। পথে পথে ঘুরতে শুরু করেন ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার হয়ে। পড়তে দেওয়ার জন্য বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদি লেখকদের বইগুলো রয়েছে পলান সরকারের সবচেয়ে পছন্দের তালিকায়। তাছাড়া লোকসাহিত্যসহ অন্যান্য জনপ্রিয় লেখকের বইও তিনি বিতরণ করেন।

এভাবেই চা দোকানি থেকে শুরু করে গৃহবধূ সবাই তার পাঠকের তালিকায় চলে আসেন। বদলে যায় দৃশ্যপট। নিজের গ্রামে তার বাড়িটিই হয়ে ওঠে পাঠাগার। তবে ২০০৯ সালে রাজশাহী জেলা পরিষদ তার বাড়ির আঙিনায় পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করে। দান-অনুদানে মিলে যায় বইসহ অন্যান্য আসবাব।

প্রথমে আশেপাশের দশগ্রামের মানুষই কেবল জানতেন পলান সরকারের কীর্তি। কিন্তু ২০০৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিটিভির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ তাকে তুলে আনে আলোকিত মানুষ হিসেবে। এরপর তিনি ২০১১ সালে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক লাভ করেন।

২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম ডে’ উপলক্ষে সারা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার দৈনিকে তার উপর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তার জীবনের ছায়া অবলম্বনে নির্মিত হয় নাটক, বিজ্ঞাপন চিত্র। শিক্ষা বিস্তারের অন্যন্য আন্দোলন গড়ে তোলায় ইউনিলিভার বাংলাদেশ পলান সরকারকে `সাদা মনের মানুষ` খেতাবে ভূষিত করে।

এফএ/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :