কর্মহীন হাওরবাসীর বেঁচে থাকার সংগ্রাম


প্রকাশিত: ০৮:০৯ এএম, ২৪ মে ২০১৭

জ্যৈষ্ঠের এ সময়টাতে নতুন ধান ঘরে তোলার আয়োজনে ব্যস্ত থাকার কথা হাওরবাসীর। কিন্তু বানের ঘোলা পানি যেন কৃষকের স্বপ্ন-সাধ কেড়ে নিয়েছে! ধানকাটা উৎসবে গলাছেড়ে গান গাওয়ার বিপরীতে এখন হাওরে কেবলই হাহাকার। কোটি কোটি চোখ সরকারি-বেসরকারি ত্রাণের দিকে! কিন্তু এ ব্যবস্থাও যে অপ্রতুল! তাইতো দিগন্তবিস্তৃত ঢেউখেলানো পানির নিচেই বার বার চোখ চলে যায় শ্রমজীবী মানুষের। ওখানেই যে তলিয়ে আছে কৃষকের কষ্টে বোনা পাকা ধান!

অকাল বন্যায় ফসল ডুবে যাওয়ায় চরম দুর্দশায় পড়েছেন কিশোরগঞ্জের হাওরবাসী। পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে দিশেহারা অনেকে। এলাকায় খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। পানিতে ডুবে যাওয়া পঁচা ধান সংগ্রহের শেষ চেষ্টায় লিপ্ত হাজার হাজার কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ। জেলার ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের বিভিন্ন দুর্গত হাওরে এখন চোখে পড়বে ছোট ছোট কিস্তি নৌকা নিয়ে হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ পানির নিচ থেকে ডুব দিয়ে আধা পচা ধান সংগ্রহ করছেন।

এসব ধান বাড়িতে এনে রোদে শুকিয়ে সেখান থেকে কিছুটা ধান সংগ্রহের চেষ্টায় লিপ্ত তারা। আর পঁচা খড় রোদে শুকিয়ে গরুর খাবারও সংগ্রহ হচ্ছে।

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার টেংগুরিয়া এলাকার কৃষক ইমাম হোসেন। আর পাঁচ বছর পরই শতবর্ষে পা দেবেন তিনি। কিন্তু বানের পানি ফসল কেড়ে নেয়ায় শেষ জীবনে এসেও দুই ছেলে আর নাতিকে নিয়ে সকাল থেকে ডুবিয়ে আধা পঁচা ধান কাটছিলেন তিনি। শীতে কাপছিলো তার শরীর। তারসঙ্গে পানির নিচ থেকে ধান কেটে নৌকায় তুলছিল তার দুই ছেলে আফিল উদ্দিন (৪৮), রহম আলী (৪৬) ও এক নাতি।

ইমাম হোসেন জানান, এনজিও এবং মহাজনের কাছ থেকে চড়া সূদে ঋণ নিয়ে এবার তিনি ৩০ কানি জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। এসব জমিতে দেড় হাজার মণ ধান হতো। কিন্তু অকাল বন্যায় ধানের সঙ্গে যেনো তার ভাগ্যও ডুবে গেছে। ‘বাবা, সব তো গ্যাছেই। আমার না, বেবাকেরই গ্যাছে। না কাইট্যাতো আর পারি না। আল্লায় যহন বিপদে ফালাইছে, কী আর করবাম। পানির তলে ডুব দিয়া তাই ধান কাটতাছি। নাইলে কাইয়াম কি?’ বলছিলেন ইমাম হোসেন।

Haor

একই উপজেলার সিংপুর গ্রামের আম্বিয়া খাতুনের কান্না যেনো কিছুতেই থামছিল না। তিনি একজন শ্রমজীবী। স্বামী, এক ছেলে, ছেলের বউ আর এক মেয়েকে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি। ঘরে খাবার নেই। ৩ মাস বয়সী নাতির মুখে খাবার দিতে পারছেন না।

৬৫ বছর বয়সী আম্বিয়া জানান, ছেলে ও ছেলের বউকে নিয়ে তিনি সিলেটে ইটখোলাতে কাজ করতেন। বৈশাখে ধান কেটে সংসারে কিছুটা স্বচ্ছলতা আসবে, এমন ভাবনায় বাড়িতে আসেন। কিন্তু কৃষকের ধানের সঙ্গে যেন তার পরিবারের আনন্দও ভেসে গেছে। বলছিলেন, ‘পেটে ভাত নাই। নাতিডার মুহে দুধ দিতাম পারতাছিনা। ধান পানির তলে। কাম নাই। কাইয়াম কি?  বাবারে অহন মরন ছাড়া আর গতি নাই।’

ইমাম হোসেন ও আম্বিয়ার মতো কিশোরগঞ্জের হাওরে এখন এমন দৃশ্য যেনো স্বাভাবিক ঘটনা। হাজার হাজার মানুষ বোরো ধান হারিয়ে অন্তত কিছুটা ফসল ঘরে তোলার শেষ চেষ্টায় ব্যস্ত। অনেকের ঘরে খাবার নেই। মাথায় মহাজনী ঋনের বোঝা। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে কাজের সন্ধানে এলাকা ছাড়ছেন অনেকে।

সিংপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম জানান, এ গ্রামের অনেকেই কাজ না থাকায় ঢাকায় চলে গেছে। তারা বিভিন্ন বস্তিতে থেকে রিকশাচালক ও ফেরিওয়ালার কাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি, আগের ব্যাংক ঋণ আদায় স্থগিত করে নতুন করে ঋণ দেয়া এবং হাওরের জলাশয়গুলো উন্মুক্ত করে দেয়ার দাবি এলাকাবাসীর।

ইটনা উপজেলার মৃগা হাওরে দেখা গেছে শত শত নিম্ন আয়ের মানুষ পানির নিচে ডুবে থাকা পঁচা ধান সংগ্রহ করছে। তাদের সঙ্গে কাজ করছে শিশুরাও। মৃগা গ্রামের আব্দুল আলী জানান, `কৃষকের ক্ষেত তলাইয়া যাওয়ায় ধান গেছে, নদীতে মাছ নাই। আমরা অহন কিভাবে বাঁচি! সরহারের কয়েক কেজি চাউলে কয়দিন চলে? তাই ছেরারে (ছেলে) সাথে লইয়া ডুবাইয়া ধান লইতাছি।` তার কথায় এতে অন্তত কিছুটাতো খাবার জোটবে!

কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, সাম্প্রতিক বন্যায় কিশোরগঞ্জের ১০টি উপজেলায় এ পর্যন্ত ৬২ হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। যার ক্ষতির পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকা। ফসল ডুবিতে দেড় লাখ কৃষক ক্ষতগ্রস্ত হয়েছেন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ৬শ মে. টন জিআর চাল ও ৩২ লাখ নগদ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। ৫০ হাজার কৃষককে ভিজিএফএর আওতায় আনা হয়েছে। আরও এক লাখ কৃষকককে এ সুবিধার আওতায় আনতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস জানান, হাওরে দরিদ্রদের জন্য ত্রান সহায়তার পাশাপাশি সরকারের কর্মসৃজন প্রকল্প চালু করা হচ্ছে। ঋণের কিস্তি আদায় স্থগিত করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে ত্রান দেয়ার পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে বিজিএফ কর্মসূচি ও খোলা বাজারে চাল বিক্রি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিকে আরও এক  লাখ কৃষককে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় আনতে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানালেন জেলা প্রশাসক।

নূর মোহাম্মদ/এফএ/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।