উত্তাল সমুদ্রে জীবনযুদ্ধে শিশুরা


প্রকাশিত: ১০:৪৮ এএম, ১২ জুন ২০১৭

উপকূলীয় এলাকায় দিন দিন বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের পরিমাণ। দারিদ্র্যের কারণে অনেকটা বাধ্য হয়েই উপকূলের এসব শিশু ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হচ্ছে।

অনেক শিশু পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই নদীতে কাজ শুরু করে। অন্যের নৌকায় কাজ করে জীবিকা চলে তাদের। আবার শিশু বয়স থেকেই অনেক অভিবাবক শিশুদের নদীতে মাছ শিকার করতে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে নদীতেই হারিয়ে যাচ্ছে এদের উজ্বল ভবিষ্যৎ।

সেই সঙ্গে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। তবে এ শিশুদের সমাজের মূল স্রোতধারায় সংযুক্ত করতে ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানালেন জেলা প্রশাসক। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এর তেমন কোনো প্রভাব লক্ষ্য করা যায়নি।

দু মুঠো ভাত-ডালের সংস্থান করতে উপকূলের শিশুরা প্রতিদিন নেমে পড়ছে উত্তাল সাগরে রেণু পোনা শিকার করতে। এ থেকে তাদের যা আয় হচ্ছে তা দিয়ে পরিবারের সবার তিন বেলা খাবারের সংস্থান হচ্ছে।

patuakhali

এ কাজ করতে গিয়ে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি এসব শিশু সমাজের বোঝা হিসেবে বেড়ে উঠছে। ফলে অনেকটা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে এসব শিশুর ভবিষ্যত।

তবে শুধু রেণু পোনা আহরণই নয়, উত্তাল সাগরে মাছ শিকারেও যাচ্ছে শিশুরা। এছাড়া শুঁটকি তৈরি, বিচ্ছিন্ন চরে গরু-মহিষ চরানোসহ নানা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী, কলাপাড়া, গলাচিপা, দশমিনা ও বাউফল উপজেলার অনেক বিচ্ছিন্ন চরের কোমলমতি শিশুরা।

কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম প্রান্তে রেণু পোনা সংগ্রহ করে তা গণনায় ব্যস্ত শিশু বেলাল হোসেন (৯)। কারও সঙ্গে তার কথা বলার সময় নেই। তবুও সাংবাদিক পরিচয় জেনে একটু কথা বলতে ইচ্ছে হলো তার।

তার ভাষ্য, মা ও দুই ভাইসহ চারজনের সংসার তাদের। মা শুঁটকি পল্লীতে কাজ করেন। আর বাবা বেশ কয়েক বছর আগে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন।

পরিবারে ভাইদের মধ্যে বেলাল সবার বড়। মায়ের আয় থেকে পরিবারের সবার নিয়মিত তিন বেলা পেট পুরে খাবারের সংস্থান হয় না। তাই বাড়তি আয়ের জন্য চিকন কারেন্ট জাল দিয়ে সাগরে রেণু পোনা সংগ্রহ করছে বেলাল।

রেণু পোনা ধরে বেলাল প্রতিদিন দেড় থেকে ২০০ টাকা আয় করে। তবে বেলালের ইচ্ছা লেখাপড়া করবে। কিন্তু সংসারের অভাবে সেটি আর করা হয়ে উঠছে না। নিজের ইচ্ছাপূরণ না হলেও ছোট দুই ভাইয়ের ইচ্ছাপূরণে ব্যস্ত বেলাল। তাদের স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করেছে। তার মতো উপকূলের অনেক বেলাল ঝুঁকিপূর্ণ এসব কাজে নিয়োজিত রয়েছে।

patuakhali

তবে এসব শিশুর জীবনমান উন্নয়নে ইউনিসেফের সহযোগিতায় মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের মাধ্যমে জেলায় গলাচিপা উপজেলায় ইইসিআর নামে একটি পাইলট প্রকল্প চালু হলেও বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানালেন, ওই প্রকল্পের মাধ্যমে শিশুশ্রম প্রতিরোধ, শিশুদের বাল্যবিয়ে না দেয়া ও নিয়মিত বিদ্যালয় পাঠানোর জন্য সচেতন করার পাশাপাশি অভিভাবকদের জন্য আর্থিক সহযোগিতাও চালু ছিল। বর্তমানে এটি বন্ধ থাকলেও আবারও চালু হবে বলে জানালেন তারা।

পটুয়াখালী জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শাহিদা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, উপকূলের ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত শিশুদের জন্য ওই প্রকল্পটি চালু করতে পারলে শিশু শ্রমের পরিমাণ যেমন কমানো সম্ভব হতো, তেমনি তাদের ইচ্ছাগুলোকেও বাস্তবে রূপ দেয়া যেত।

এ বিষয়ে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ড. মাছুমুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, উপকূলের এসব শিশুর সমাজের মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে আনতে বর্তমান সরকার সমাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে শিশুদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর যে, রূপকল্প-২০২১ ঘোষণা করেছেন। তা বাস্তবায়নে দারিদ্র্য দূরীকরণসহ শিশুদের অধিকার রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এরপরও উপকূলের শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে আমরা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে স্থানীয়ভাবে কাজ করছি।

সমাজে পিছিয়ে পড়া এসব শিশুর জীবন মান উন্নয়নে ব্যর্থ হলে সরকারের এসডিজি ও ভিশন ২০২১ বাস্তায়নেও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে শিশুশ্রম প্রতিরোধে সমাজিক সচেতনতার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আশার আহ্বান জানান সংশ্লিষ্টরা।

মহিব্বুল্লাহ চৌধুরী/এএম/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।