প্রকল্পের অর্থ লুটপাট : পানিবন্দি কলাপাড়ার সহস্রাধিক মানুষ
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর ইউনিয়নের নিজামপুর এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ সিডর ও আইলার সময় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সেই থেকে গণমাধ্যমে একের পর এক সংবাদ প্রকাশিত হতে থাকে। সরকার কয়েক দফা বাধঁটি মেরামতের উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু সরকারের এসব উদ্যোগ ভেস্তে যায় শুধুমাত্র লুটপাটের কারণে।
এতে এখানকার সাতটি গ্রামের সহস্রাধিক মানুষ আজ পর্যন্ত ভাসছেন জোয়ারের পানিতে। সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে পোহাতে ক্লান্ত এখানকার মানুষগুলো এখন আর গণমাধ্যমের সঙ্গেও কথা বলতে চান না।
তাদের বক্তব্য, মোরা ভাসি জোয়ার ভাটায় আর আপনারা খালি ছবি তুলেন, কি অইবো আপনাদের সঙ্গে কথা বলে?
সূত্র জানিয়েছে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ মেরামত ও নির্মাণ প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হচ্ছে। এতে উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার মানুষ এখনও পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এসব এলাকার কৃষি কাজ, গবাদি পশু পালনসহ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। পাউবোর কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ না করেই প্রকল্পের সমুদয় টাকা নিয়ে যাওয়ায় সুফল পায়নি সাগরপাড়ের মানুষ। গঙ্গামতি এন্টারপ্রাইজসহ কয়েকটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে চলা কাজগুলো অনুসন্ধান করলে বেরিয়ে আসবে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
জানা যায়, ২০০৭ সালের ১৫ই নভেম্বর দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে মহিপুর থানার সদর ইউনিয়নের নিজামপুর, সুধীরপুর, কমরপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের প্রায় ১৫ কি.মি. বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়। সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত এসব বেড়িবাঁধের মেরামত ও র্নিমাণ কাজ কয়েক দফা শেষ হলেও প্রকল্পের নির্দেশনা না মেনে ও নিম্নমানের উপকরণ সামগ্রী ব্যবহার করায় উপকূলীয় এলাকার অন্তত ২০ হাজার মানুষ এর কোনো সুফল পাননি। সামান্য জলোচ্ছ্বাস ও অস্বাভাবিক জোয়ারে তারা এখনও পানিবন্দি হয়ে ছুটে আশ্রয় কেন্দ্রে।
কেউ কেউ আবার এলাকা ছেড়ে মহিপুর-আলীপুর ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে লবন পানি প্রবেশ করে ফসলের জমি নষ্ট হচ্ছে ও কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। দেখা দিয়েছে গো-খাদ্য সংকট। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে জোয়ার আতঙ্ক। কর্মহীন হয়ে পড়েছে এ সকল এলাকার কর্মজীবী মানুষ।
জলাবদ্ধতায় চাষাবাদ বন্ধ থাকায় অনেক পরিবারের দিন কাটছে অর্ধাহারে, অনাহারে। এমনকি এসব বানভাসী মানুষ পাচ্ছে না কোনো ধরনের সাহায্য। আর যারা দাতা সংস্থা ও সরকারের উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ মেরামত ও নির্মাণ প্রকল্পের শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে তারা কেউ দেশে আবার কেউ বিদেশে অবস্থান করে বিলাসি জীবন-যাপন করছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত সাগরতীরের হাজার হাজার মানুষ প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছেন, কলাপাড়া-রাঙ্গাবালীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ মেরামত ও নির্মাণ প্রকল্পের কাজের তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও পাউবো’র দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে।
মহিপুরের স্থানীয় বাসিন্দা জাকির হোসেন জানান, স্কুল-মাদরাসার শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের একমাত্র পথ বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হওয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি দিনদিন কমে যাচ্ছে।
ষাটোর্ধ আবুল হাশেম জানান, বাধঁ বিধ্বস্ত তার বাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন তিনি অন্যের বাড়ির সামনে আশ্রয় নিয়ে থাকছেন।
নিজামপুর গ্রামের করিমন বিবি জানান, জোয়ারের সময় রান্না হয় না। ফলে অনেক সময় তাদের দিন কাটে অনাহারে। এমনকি রাতে জোয়ারের সময় তাদের র্নিঘুম রাত কাটাতে হয়। ছোট ছেলে-মেয়েদের পানিতে ডুবে যাওয়ার শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।

নিজামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া জানায়, একটু বড়রা স্কুলে যেতে পারলেও ছোটরা অনেকেই স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। সামনে সমাপনী পরীক্ষা। তাই বাধ্য হয়ে তাকে স্কুলে যেতে হয়। প্রতিদিন ভিজে স্কুলে যেতে হয় আর ফিরতে হয়। অনেক সময় বই-খাতা ভিজে যায়।
মহিপুর থানা যুবলীগের আহ্বায়ক এএম মিজানুর রহমান বুলেট জানান, এলাকার অভ্যন্তরীন অনেক সড়ক নষ্ট হয়ে গেছে। জোয়ারের সময় মসজিদগুলো তলিয়ে যায়। কোনো মানুষ জোয়ারের সময় মারা গেলে তাকে ভাটা ছাড়া দাফন করা যায় না। এসব এলাকার অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে অন্য এলাকায় গিয়ে বসবাস করছেন।
মহিপুর প্রেসক্লাবের সম্পাদক মনিরুল ইসলাম জানান, স্থায়ী বাঁধ র্নিমাণের আশ্বাস থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। আশ্বাস নয় কাজের বাস্তব প্রতিফলন চায় ভোগান্তির স্বীকার এসব এলাকার বানভাসী মানুষ।
পাউবো’র কলাপাড়া অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের জানান, জরুরি ভিত্তিতে ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার বেড়িবাঁধ মেরামত করা হয়েছে। ওখানে দরকার এখন স্থায়ী বেরিবাঁধ নির্মাণ। এ প্রকল্পের প্রস্তাবনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পেলে স্থায়ী বেরিবাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করা হবে বলে জানান তিনি।
আরএআর/এমএস