সুস্থ হয়েও অনেকে ছাড়ছেন না পাবনা মানসিক হাসপাতাল


প্রকাশিত: ১০:৪৪ এএম, ২৬ জুন ২০১৫

পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলেও পাবনা মানসিক হাসপাতাল ছেড়ে বাড়ি যাচ্ছেন না ৩২ জন। তাদের কেউ নিতে আসে না বা ভুল ঠিকানার কারণে কর্তৃপক্ষও তাদেরকে আসল ঠিকানায় পৌঁছে দিতে পারছেন না। এ কারণে তারা এখনও হাসপাতালেই রয়ে গেছেন । আর এদেরকে নিয়ে কর্তৃপক্ষ পড়েছেন মহাসঙ্কটে।

অন্যদিকে, নানা সমস্যায় জর্জরিত ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট দেশের একমাত্র বিশেষায়িত পাবনা মানসিক হাসপাতাল এখন নিজেই এক রোগাক্রান্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।  মাত্র ৬ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়েই চলছে এই বিশেষায়িত হাসপাতালটি।  শুধু তাই নয় ৫০০ শয্যার হাসপাতালের জন্য অনুমোদন রয়েছে মাত্র ২০০ শয্যার জনবল।

এই ২০০ শয্যার জনবলের জন্য প্রথম শ্রেণির চিকিৎসকের যে ৩০টি পদ আছে তার মধ্যে আবার ২৪টি পদই রয়েছে শূন্য।  অন্যান্য কর্মকর্তা এবং কর্মচারীর পদেও একই অবস্থা।

কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছেন, জরুরি ভিত্তিতে কমপক্ষে ৬ জন মেডিকেল অফিসার এবং ২ জন কনসালটেন্ট নিয়োগ করা না হলে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে।  এছাড়াও ৫৮ বছর আগে নির্মিত বিভিন্ন ভবনের ইলেকট্রিক ও পানির লাইনগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।  সেই সাথে চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসযোগ্য কোনো বাসা বরাদ্দ নেই।  অব্যবস্থার সুযোগে হাসপাতালের আশপাশে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু বেসরকারি মানসিক হাসপাতাল।



হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর ডা. তন্ময় প্রকাশ বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশের একমাত্র মানসিক হাসপাতালটি পাবনা জেলা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে হেমায়েতপুরে অবস্থিত।  ১৯৫৭ সালে পাবনা জেলার প্রাক্তন এক সিভিল সার্জন ‘শীতলাই হাউজ’ নামে এক জমিদার বাড়িতে অস্থায়ীভাবে হাসপাতালটি স্থাপন করেন।  ১৯৫৯ সালে জেলা শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে হেমায়েতপুরে ১১২.২৫ একর জায়গায় হাসপাতালটি স্থানান্তরিত হয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে এর শয্যা সংখ্যা ছিল ৬০।  পরবর্তীতে বৃদ্ধি পেয়ে ২০০-তে দাঁড়ায়।  পরে ১৯৬৬ সালে আরো ২০০ শয্যা যুক্ত হয়।  মোট শয্যার ২৮০টি নন-পেয়িং এবং ১২০টি পেয়িং।

হাসপাতালটির মোট ১৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে পুরুষ রোগীদের জন্য ১৩টি (১১টি নন-পেয়িং, ২টি পেয়িং) এবং নারী রোগীদের জন্য ৫টি (৪টি নন-পেয়িং, ১টি পেয়িং) নির্দিষ্ট।  কয়েক বছর আগে শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০০-তে উন্নীত করা হলেও এখনো তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য।

এদিকে ৫০০ শয্যার এই বিশেষায়িত হাসপাতালে প্রথম শ্রেণির চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ৬ জন।

কর্তৃপক্ষ জানান, ৫০০ শয্যার হাসপাতাল হলেও এতদিনে মাত্র ২০০ শয্যার জন্য জনবল অনুমোদন রয়েছে এবং এই ২০০ শয্যার জনবলের জন্য প্রথম শ্রেণির চিকিৎসকের মঞ্জুরীকৃত ৩০টি পদের মধ্যে রয়েছেন মাত্র ৬টি।

সূত্র জানায়, হাসাপাতালের কনসালটেন্টের দুটি পদ, ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিস্ট ও আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তার দুটি এবং সহকারী রেজিস্ট্রারের তিনটি পদই শূন্য।  অাবেদনবিদ, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট ও বায়োকেমিস্টের একটি করে তিনটি পদের তিনটিই শূন্য।  ক্লিনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টের নয়টি পদে আছেন পাঁচজন।  আর চারজন সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কারের মধ্যে আছেন তিনজন।  একইভাবে চিকিৎসকসহ প্রথম ও ২য় শ্রেণির অন্যান্য কর্মকর্তা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মঞ্জুরীকৃত ৫২২ জনবলের মধ্যে শূন্য রয়েছে ১৫১টি পদ।

কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে বলছেন, এত স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসক ও জনবল দিয়ে মানসম্পন্ন সেবাতো দূরের কথা হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম চলমান রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরো জানায়, ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে হাসপাতালটিতে কিছু চিকিৎসা যন্ত্রপাতি দিয়েছিল সরকার।  এর মধ্যে একটি টিইইজি, একটি ইসিটি, একটি অটোকেভ ও একটি ইসিজি মেশিন চালু করা সম্ভব হয়নি।  একটি মাত্র অ্যাম্বুলেন্স কোনো মতে চালু রাখা হয়েছে।  মাঝেমধ্যেই এটি নষ্ট থাকে।  চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবহনের জন্য কোনো যানবাহন নেই।  হাসপাতালের পরিচালকের জন্য ২০ বছরেরও বেশি দিনের পুরোনো একটি জিপ গাড়ি থাকলেও প্রায়ই নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে সেটি।

হাসপাতাল সংলগ্ন উত্তর-দক্ষিণ এর পূর্ব-পশ্চিম সংযোগ সড়কটি জরাজীর্ণ হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় জরুরি ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণ ও কিছু জায়গায় সংস্কার প্রয়োজন।  প্রায় ৫৮ বৎসর আগে নির্মিত ভবনগুলোর ইলেকট্রিক ও পানি লাইনগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ায় তা অপসারণ এবং অনেক জায়গায় পুনর্নির্মাণ জরুরি।  রোগীদের আধুনিক এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য কর্মরত চিকিৎসকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের (বৈদেশিক ট্রেনিং) প্রয়োজন হলেও তার কোনো ব্যবস্থা নেই।



কর্মরত চিকিৎসক, কর্মকর্তা, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য সরকারি বরাদ্দকৃত কোনো বাসা নেই।  হাসপাতালের প্রতিষ্ঠালগ্নে যেসব আবাসিক কোয়ার্টার ও ডরমেটরি নির্মিত হয়েছিল তা রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংস্কারের অভাবে তা সম্পূর্ণভাবে নষ্ঠ হয়েছে।  নিরাপত্তাকর্মীর অভাবে ভবন ও কোয়ার্টারের দরজা-জানালা এবং মূল্যবান জিনিস রাতের অন্ধকারে খুলে নিয়ে গেছে চোর।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, হাসপাতালের আশপাশে বেশ কয়েকটি বেসরকারি মানসিক হাসপাতাল গড়ে উঠেছে।  এদের নিয়োগ করা দালালদের অত্যাচারে কর্তৃপক্ষ অতিষ্ট।  বহির্বিভাগে রোগী ভর্তি সংক্রান্ত বিষয়ে এবং দর্শনার্থী পরিদর্শনের ব্যাপারে স্থানীয় দালাল চক্রের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে প্রতিনিয়ত প্রায়ই অপ্রীতিকর ঘটনার সৃষ্টি হয়।

হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর ডা. তন্ময় প্রকাশ বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পাবনা মানসিক হাসপাতালের সেবার মান দৃষ্টান্তমূলক।  কিন্ত এভাবে সমস্যা জিইয়ে রেখে এই সেবা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত কঠিন।

তিনি আরো জানান, পাবনা মানসিক হাসপাতাল থেকে প্রতি বছর গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানসিক রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়।

এসএস/এআরএস/ এমএএস/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।