ছাত্রলীগ নেতার অপবাদে প্রাণ দিলো লিমা
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় এক ছাত্রলীগ নেতার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস লিমা (১৪) নামে এক স্কুলছাত্রী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।
গত রোববার (১৩ মে) সকালে সদর উপজেলার মাছিহাতা ইউনিয়নের চাপুরই গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা উদয় খান (২০) ওই গ্রামের রহিজ খানের ছেলে।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা জানায়, চাপুরই গ্রামের দুবাই প্রবাসী নুরুল হক ভূইয়ার মেয়ে লিমা স্থানীয় চাপুরই আজিজুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়তো।
লিমার প্রতিবেশীর বাড়িতে কাজ করার সূত্রে জেলার আখাউড়া উপজেলার কল্যাণপুর গ্রামের রাজমিস্ত্রি ইয়াছিন মিয়ার সঙ্গে পরিচয় হয় তার।
কাজের ফাঁকে ইয়াছিনের সঙ্গে শান্তা নামে ওই গ্রামের এক মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। লিমার মাধ্যমে শান্তার কাছে ইয়াছিন খবর আদান-প্রদান করতো।
এই সুযোগে ৭নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতি উদয় খান লিমাকে স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে উত্ত্যক্ত করতো। একপর্যায়ে উদয় সন্দেহ করে, লিমার সঙ্গে ইয়াছিনের প্রেমের সম্পর্ক আছে।
এ অবস্থায় রোববার সকালে উদয় ইয়াছিনকে চাপুরই গ্রামে ডেকে আনে। পরে তাকে স্থানীয় খেওয়াই সেতুতে নিয়ে যায়। লিমার কাছে থাকা ইয়াছিনের একটি সিম কার্ড ফেরত নেয়ার কথা বলে লিমাকেও ডেকে আনতে বলে উদয়।
ইয়াছিনের কথা মতো লিমা ওইদিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে খেওয়াই সেতুতে যায়। সেখানে উদয়ের সঙ্গে তার দুই বন্ধু সুমন মিয়া ও লোকমান মিয়াও ছিল। তারাও চাপুইর গ্রামের বাসিন্দা।
কথার এক ফাঁকে উদয় ও তার বন্ধুরা লিমার সঙ্গে ইয়াছিনের প্রেমের সম্পর্কের অপবাদ দিয়ে তাকে মারধর শুরু করে। এ সময় ইয়াছিনের সঙ্গে লিমাকেও মারধর করে উদয়।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে মামাতো ভাই মনির মিয়া লিমাকে উদ্ধার করে বাড়িতে পাঠায়। এ ঘটনা স্থানীয় অনেকেই প্রত্যক্ষ করেন। এ লজ্জায় বাড়িতে এসে নিজ ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে লিমা।
লিমা ও ইয়াছিনকে মারধরের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মনির মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, আমি গরু নিয়ে মাঠে যাচ্ছিলাম। এ সময় শুনি দুইজন ছেলে-মেয়েকে ছেলেরা মারধর করছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি ইয়াছিনকে মারধর করছে উদয়। সেই সঙ্গে লিমাকেও মারধর করা হয়। পরে আমি লিমাকে তাদের হাত থেকে উদ্ধার করে বাড়িতে পাঠাই।
মাছিহাতা ইউনিয়ন পরিষদের ৭নং ওয়ার্ডের সদস্য শরীফ ভূইয়া জাগো নিউজকে বলেন, আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি লিমা বাড়ি চলে যাওয়ার পর ইয়াছিনকে ধরে চাপুইর আজিজুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ে আটকে রাখে। স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাকে বিষয়টি জানালে আমি এসে কথা বলার পর ইয়াছিনকে ছেড়ে দেয়া হয়। ইয়াছিনের সঙ্গে লিমাকেও মারধর করা হয়েছে। পরে লিমা আত্মহত্যা করেছে।
লিমার ভাই রজব ভূইয়া জাগো নিউজকে বলেন, লিমা কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে এসে ওর রুমে ঢুকে দরজা আটকে দেয়। এরপর খবর পাই ইয়াছিনকে স্কুলে আটকে রাখা হয়েছে। আমরা স্কুল থেকে ফিরে এসে লিমার রুমের দরজায় কড়া নাড়লেও কোনো সাড়া দেয়নি। পরে জানালা দিয়ে দেখতে পাই, ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস লাগিয়েছে লিমা। উদয় ওকে মারধর করেছে, সবার সামনে অপমান করেছে। সেই অপমান সইতে না পেরে লিমা আত্মহত্যা করেছে। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত উদয়য়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। মঙ্গলবার দুপুরে চাপুইর গ্রামে উদয়ের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে উদয়ের পরিবারের লোকজনের দাবি সে নির্দোষ।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত কোনো মামলা করা হয়নি বলে জানিয়েছেন সদর মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নবীর হোসেন।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, এ ঘটনায় লিমার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা দেয়া হয়নি। তবে বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আজিজুল সঞ্চয়/এএম/পিআর