স্মার্টকার্ড বিতরণে ৪০ লাখ টাকা নিলেন নির্বাচন কর্মকর্তা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঝালকাঠি
প্রকাশিত: ০৯:২৭ পিএম, ২০ মে ২০১৮
ফাইল ছবি

ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ায় উপজেলায় স্মার্টকার্ড বিতরণে ৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেন নির্বাচন কর্মকর্তা জয়ন্তী রানী চক্রবর্তী ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটর রেজাউল জোমাদ্দার।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় পরিচয়পত্রের হারানো কার্ডধারী ও টোকেন গ্রহণকারীদের কাছ থেকে তারা এই টাকা হাতিয়ে নেন। সোশাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন পত্রিকায় এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হওয়ার পর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সোহেল সামাদ বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছেন।

তবে উপজেলা নির্বাচন অফিসের ওই দুইজন কর্মকর্তার নগদ টাকা নেয়ার দৃশ্য ফেসবুকে ভাইরাল হলে বিপাকে পড়েন সংশ্লিষ্টরা। পরে তারা আত্মসাৎ করা টাকার একটি অংশ ব্যাংকে জমা দিতে বাধ্য হন।

কাঁঠালিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জয়ন্তী রানী চক্রবর্তীর দাবি, উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকে সোনালী ব্যাংকের দূরত্ব বেশি হওয়ায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনুরোধে জনসাধারণের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে ব্যাংক চালানের টাকা তিনি হ্যান্ডক্যাশ নিয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি তা ব্যাংকে জমা দিয়েছেন।

স্মার্টকার্ড গ্রহণকারীরা জানান, গত ১০, ১১ ও ১২ মে কাঁঠালিয়া ৬নং আওরাবুনিয়া ইউনিয়নের আকনের হাট ইউপি কার্যালয় ও আওরাবুনিয়া মডেল হাইস্কুলে স্মার্টকার্ড বিতরণ করা হয়।

উপজেলা নির্বাচন অফিসের ডাটা এন্টি অপারেটর রেজাউল জোমাদ্দার (প্রকল্পভুক্ত) নির্দিষ্ট একটি কক্ষে বসে টোকেন দেন। তিনি একাধিক লাইনে দাঁড়ানো স্মার্টকার্ড নিতে আসা মানুষের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র হারানো বাবদ ৩৪৫ টাকা এবং নতুন ভোটারের স্লিপ বাবদ ২৩০ টাকা করে মোট ৫৭৫ টাকা নিয়ে নিজের স্বাক্ষরিত ও সিল দেয়া একটি মানি টোকেন ধরিয়ে দেন।

এ সময় তিনি টাকা গ্রহণের কোনো রশিদ, নাম ঠিকানা এন্ট্রি ও রেজিস্ট্রার করেননি। সেই মানি টোকেন দিয়ে শতশত ভুক্তভোগী নির্দিষ্ট কক্ষ থেকে স্মার্টকার্ড গ্রহণ করেছেন।

এ বিষয়ে আওরাবুনিয়া ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য মো. মোশারেফ হোসেন জানান, পরিচয়পত্র ও স্লিপ হারানো বাবদ ব্যাংকে চালান দেয়ার নামে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও কর্মচারী রেজাউল অন্তত পাঁচ লাখ টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছেন।

সংবাদকর্মীরা টাকা নেয়ার দৃশ্য ধারণের চেষ্টা করলে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জয়ন্তী চক্রবর্তী ও ডাটা এন্টি অপারেটর রেজাউল কৌশলে পালিয়ে যান।

দুই নির্বাচন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর প্রতারণার মাধ্যমে ব্যাগভর্তি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়।

আওরাবুনিয়া ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা দিলিপ মিস্ত্রি ও ২নং ওয়ার্ডের তনিমা রানী জানান, আইডি কার্ড হারিয়ে যাওয়ায় নির্বাচন অফিসের লোকদের নগদ ৩৪৫ টাকা দিয়ে টোকেনের মাধ্যমে স্মার্টকার্ড নিয়েছি।

আওরাবুনিয়া ৩নং ওয়ার্ডের ভোটার আল মামুন খান, ৪নং ওয়ার্ডের সাইফুল ইসলাম, রাজিব হোসেন ও ৬নং ওয়ার্ডের হাফিজ নকীব, নজরুল জোমাদ্দার, নয়ন হাওলাদার ও ফিরোজ হাওলাদারসহ অনেকেই জানান, তাদের আইডি কার্ড খুঁজে না পাওয়ায় ফটোকপি নিয়ে আসলে কার্ডের জন্য ৩৪৫ টাকা এবং স্লিপের জন্য ২৩০ টাকা দিয়ে একটি স্লিপ নিয়ে অন্য রুম থেকে স্মার্টকার্ড সংগ্রহ করি।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্মার্টকার্ড বিতরণে দুর্নীতির মাধ্যমে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও তার লোকজন ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকার বেশি আত্মসাৎ করেছেন।

টাকা নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর রেজাউল জোমাদ্দার বলেন, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার আদেশেই টাকা নেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কর্মকর্তা জয়ন্তী রানী চক্রবর্তী বলেন, অভিযোগ সঠিক নয়। ব্যাংক চালানের টাকা আমাদের গ্রহণ করার আইনি অধিকার না থাকলেও জনসাধারণের দুর্ভোগের কথা ভেবে টাকাগুলো নেয়া হয়েছে। সব টাকা ব্যাংকে জমা হয়েছে। কি পরিমাণ হারানো কার্ডধারী উপজেলায় রয়েছে ও কত টাকা নেয়া হয়েছে তা বলতে তিনি অপরাগতা প্রকাশ করেন।

এ ব্যাপারে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. সোহেল সামাদ বলেন, গত ১১ ও ১২ মে শুক্রবার ও শনিবার ব্যাংক বন্ধ থাকায় জনসাধারণের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে চালানের টাকা জামা নেয়া হয়েছিল। পরে ব্যাংকে সব টাকা জমা করা হয়েছে। তবে ব্যাংক চালানের টাকা নির্বাচন অফিসের গ্রহণ করার অধিকার নেই বলেও জানান তিনি।

মো. আতিকুর রহমান/এএম/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :