সেদিন গ্রেনেড হামলায় মরে গেলেই ভালো হতো!

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক ভৈরব (কিশোরগঞ্জ)
প্রকাশিত: ০৪:৫১ পিএম, ২১ আগস্ট ২০১৮

‘২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় সেদিন মরে গেলেই ভালো হতো। শরীরে স্প্লিন্টার ঢুকে ক্ষতবিক্ষত হয়েছি সেদিন। কিন্তু মরিনি। শরীরে অসহ্য ব্যথা-যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরণ ভালো। আর যন্ত্রণা সইতে পারছি না’।

অনেক দুঃখ-কষ্ট নিয়ে ভারাক্রান্ত মনে এভাবেই কথাগুলো বলেন দীর্ঘ ১৪ বছর আগে ২১ অাগস্ট গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত ভৈরবের নাজিম উদ্দিন।

২০০৪ সালের ২১ অাগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের শোভাযাত্রার কর্মসূচি ছিল। শেখ হাসিনার বক্তব্যের পরপরই তা শুরুর কথা ছিল। কিন্তু গ্রেনেড হামলায় মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে যায়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন নাজিম উদ্দিন। গ্রেনেডের স্প্লিন্টার ঢুকে ক্ষতবিক্ষত হন তিনি। সেই থেকে ধুঁকে ধুঁকে চলছে নাজিমের জীবন। পরিবারে মা-বাবা, স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে দিন চলছে তার।

সেদিনের বিষয় নিয়ে গতকাল সোমবার তার সঙ্গে কথা হয়। ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন নাজিম উদ্দিন। বলেন, ‘এখনো ঠিকমতো রাতে ঘুমাতে পারি না। প্রায় রাতেই ঘুমের মধ্যে ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠি। কে যেন আমাদের তাড়া করছে, আমাকে মারতে আসছে। আজো ভুলিনি সেদিনের কথা’।

নাজিম উদ্দিনের ভাষ্য, আমার বাবা ভৈরবের কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আকবরনগর গ্রামের মফিজ উদ্দিন তখন মেম্বার। আমি ছিলাম আওয়ামী লীগ কর্মী। আমরা সেদিন এখান থেকে রওনা দিয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের শোভাযাত্রার কর্মসূচিতে উপস্থিত হই। আওয়ামী লীগের নেত্রী ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানের সঙ্গেই আমরা সেখানে যাই। মঞ্চের খুব কাছেই ছিলাম আমি। তখন বিভিন্ন নেতারা বক্তব্য দিচ্ছেন আমরা তা শুনছি। হঠাৎ বিকট শব্দ হলো। চারিদিকে ধোঁয়ায় ঘিরে গেছে। আমি তখন দেখলাম আমাদের নেত্রী আইভি রহমান আক্রান্ত। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে যাই। সামনে যেতেই আমার পা ও বুকে গ্রেনেড লাগে। এরপর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এরপর কি হয়েছে তার কিছুই মনে নেই আমার।

পরে আমার বাবা ও স্থানীয় নেতাকর্মীর কাছে শুনেছি, সেদিন আমাকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। এরপর শেখ হাসিনার সহায়তায় উন্নত চিকিৎসার জন্য আমাকে ভারতের পিয়ারলেস হাসপাতালে পাঠায়। তিন মাস চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে আসি আমি।

চিকিৎসকরা বলেছিলেন, আমার শরীরে আরও স্প্লিন্টার রয়েছে। সেগুলো অপসারণ করতে পরবর্তীতে অপারেশন করতে হবে। কিন্তু অর্থের অভাবে আজও অপারেশন করতে পারিনি। ভাগ্যক্রমে সেদিন বেঁচে গেলেও এখনো পুরোপুরি সুস্থ হইনি। শরীরে থাকা স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছি। এখনো প্রতিদিন ওষুধ খেতে হয়।

নাজিম উদ্দিন বলেন, শরীরের এই অবস্থার জন্য কোনো কাজকাম করতে পারি না। ঠিকমতো হাঁটতে পারি না। অর্থের অভাবে সংসার চালাতে ব্যর্থ। ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ দিতে পারি না। চিকিৎসা খরচ চালাতে চালাতে সব শেষ। এখন বসতভিটা ছাড়া কিছুই নেই। ঘটনার ১৪ বছর পেরিয়ে গেলে এখন আমার খবর রাখে না কেউ। গত ১৪ বছর অনেক কষ্টে বেঁচে আছি। এভাবে যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো ছিল।

প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালের ২১ অাগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রার কর্মসূচি ছিল। শেখ হাসিনার বক্তব্যের পরপরই তা শুরুর কথা ছিল। কিন্তু গ্রেনেড হামলায় সেই কর্মসূচি শোকে পরিণত হয়। এ হামলায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন।

আসাদুজ্জামান ফারুক/এএম/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।