বসতভিটা রক্ষার চেষ্টাই কাল হলো তাদের

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
প্রকাশিত: ০৭:৪৯ পিএম, ২২ এপ্রিল ২০১৯

স্বামী প্রতিবন্ধী। তাই সাজেদা খানমকে ২৯ শতক জমি লিখে দিয়ে বসতভিটা করে দিয়েছিলেন তার বাবা মৌলানা বদিউল আলম। সেই থেকে তিন ছেলে ও চার মেয়ের বাবা-মা হয়ে জীবনযুদ্ধ চালাচ্ছিলেন সাজেদা খানম (৫৬)। সাত সন্তানের মধ্যে পাঁচজনকে স্নাতকোত্তর পাস করিয়েছেন সংগ্রামী এই মা। মানসিক প্রতিবন্ধীসহ বাকি দুজনও উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছে।

এই পরিবারটির মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁইটুকুর প্রতি সম্প্রতি দৃষ্টি পড়ে প্রভাবশালী শফিকুল ইসলাম ওরফে শফিকুর রহমানের। তার কবল থেকে নিজের ভিটাটি রক্ষার চেষ্টায় আদালতে মামলা করেছিলেন সাজেদা। এটিই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিনা নোটিশে ধরে নিয়ে শফিকের বসতভিটায় হামলার অভিযোগে দায়ের করা মিথ্যা মামলায় মেয়েসহ সাজেদাকে কারাগারে পাঠায় পুলিশ।

কক্সবাজার সদরের খরুলিয়া এলাকার এ ঘটনাটি নিয়ে কারান্তরীণ সাজেদার দুই মেয়ের একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর কক্সবাজার জেলাসহ পুরো দেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনার আসল রহস্য বের করতে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসাইন গতকাল রোববার বিকেলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আদিবুল ইসলাম ও সদর মডেল থানা পুলিশের ওসি (তদন্ত) খাইরুজ্জামানকে ঘটনাস্থলে পাঠান। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর দুপক্ষকে আপাতত শান্ত থাকতে নির্দেশনা দিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। রোববার রাতে জামিনে কারামুক্ত হন মা-মেয়ে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সদরের ঝিলংজা ইউনিয়নের খরুলিয়া মাস্টারপাড়া এলাকায় প্রতিবন্ধী আবু বক্কর ছিদ্দিকের স্ত্রী সাজেদা বেগম ওয়ারিশ সূত্রে ২৯ শতক জমিতে ৪০ বছর ধরে ভোগদখল করে আসছেন। সাজেদার অন্য বোনদের পাওয়া জমির কিছু অংশ কিনেছেন খরুলিয়ার ঘাটপাড়ার মৃত আবু বক্কর ছিদ্দিকের ছেলে নব্য বিত্তশালী শফিকুল ইসলাম ওরফে শফিকুর রহমান। তার করা দলিলের তফশিলে কৌশলে সাজেদার বসতভিটার দাগটিও উল্লেখ করেন তিনি। তার কেনা অংশটির চেয়ে আরও বেশি দখল নিলেও দুই বছর ধরে সাজেদার বসতভিটাও তার কেনা অংশ দাবি করে তা কব্জায় নিতে মরিয়া শফিক। এরপরই তিনি ফিল্মি স্টাইলে সাজেদার পরিবারের ওপর নির্যাতন শুরু করেন।

সাজেদার ছেলে আসহাব উদ্দিন বলেন, ‘আমরা শফিকের জমি জবরদখল করছি উল্লেখ করে তিনি আমাদের নামে থানায় একটি অভিযোগ দেন। এর নোটিশ পেয়ে মা (সাজেদা) কক্সবাজার জেলা জজের প্রথম আদালতে একটি মামলা করেন। এরপর থেকেই আমাদের পরিবারের ওপর খড়্গ নেমে আসে। ৪ এপ্রিল শবে মেরাজের রাতে শফিকের লোকজন পুলিশের সহযোগিতায় বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় মাসহ বোনদের মারধর করা হয়। প্রতিবাদ করতে চাইলে সদর থানার এসআই আরিফুল ইসলাম উল্টো তাদের গালমন্দ করে গ্রেফতার করতে উদ্যত হন।

তিনি জানান, গত ১৬ এপ্রিল তারা আবার বসতঘরে হামলা চালায়। একটি স্প্রে দিয়ে সবুজ গাছগুলো ঝলসে দেয়া হয়। রাতে এসআই আরিফ পুলিশ নিয়ে এসে নামাজরত মা ও ছোট বোন সাজিয়াকে কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই থানায় নিয়ে যায়। ঘটনা জেনে গণমাধ্যমকর্মীরা থানায় যোগাযোগ করলে জমি দখলের ঘটনায় মা-মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসা হয়েছে এবং ছেড়ে দেয়া হবে বলে জানিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু ১৭ এপ্রিল শফিকের ছোট ভাইয়ের দায়ের করা মামলায় মা সাজেদা ও মেয়ে সাজিয়াকে করাগারে পাঠানো হয়।

এদিকে মা ও ছোট বোন কারান্তরীণ হওয়ার পর বড় দুই বোন তাদের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনার মর্মান্তিক বিবরণ দেয় তাদের এক স্বজনের কাছে। তিনি সেটি ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেন। শনিবার এটি ভাইরাল হলে সর্বত্র নিন্দার ঝড় ওঠে।

ভুক্তভোগী সাজেদা বেগম বলেন, ‘আমি তখন নামাজ পড়ছিলাম। নামাজ শেষ করতেই না করতেই পুলিশ আমাকে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে আমাদের মা-মেয়েকে প্রহারও করা হয়। শফিককে জমি না দিলে বাড়ির সবাইকে কারাগারে পাঠানোর হুমকি দেয় পুলিশ। আমার বসতবাড়ি বিক্রি করব না বলায় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। এখনো শফিকের ভাই ও ভাড়াটিয়া দুর্বৃত্তদের অব্যাহত হুমকিতে ভীতসন্ত্রস্ত।

স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, ছাত্রজীবনে শফিক শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রামুর গর্জনিয়া ইউয়িনের বর্তমান চেয়ারম্যান চট্টগ্রাম এইট মার্ডারসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে থাকা শফিক তখন ক্যাডার শফিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন বেশি। কিন্তু ১/১১ এর পর থেকে শফিক প্রবাস জীবন কাটাচ্ছেন। চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম বর্তমানে সরকার দলীয় এমপি সাইমুম সরোয়ার কমলের হাত ধরে নব্য আওয়ামী লীগার। নজরুলের সহচার্যে শফিকও বর্তমানে এমপি কমলের কাছের লোক। সেই সূত্রে পুলিশের অনুকম্পা পাচ্ছেন শফিক।

এছাড়াও ক্ষমতার অবৈধ ব্যবহারে ইদানিং নিরহ বহু মানুষের ভিটে বাড়ি দখল করেছে শফিক। আর প্রতিটি দখল প্রক্রিয়ায় কৌশল হিসেবে নানা মিথ্যা ঘটনায় মামলা সাজিয়ে হয়রানি করেছেন। প্রয়োজনে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করেছেন তিনি। অনেকে মামলার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সাজেদা খানমের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার পাওয়ায় এটি নিয়ে গণমাধ্যম সোচ্চার হলেও অনেক ঘটনা চাপা পড়েছে।

ভুক্তভোগী সাজেদা বলেন, পুলিশ বার বার শফিকের সঙ্গে সমঝোতা করতে বলেছে। কিন্তু কোনো সমঝোতা নয়, অকারণে আমাদের ওপর ঘটে যাওয়া অন্যায়ের যথাযথ বিচার চাই।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, মূল ঘটনাটি জানতে ঊর্ধ্বতন কর্মকতাকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছিল। তারা এটা নিয়ে কাজ করছে। পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

সায়ীদ আলমগীর/আরএআর/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :