পঞ্চগড়ে আসমার দাফন সম্পন্ন, বাবা-মায়ের বিলাপ

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি পঞ্চগড়
প্রকাশিত: ০৯:২৩ পিএম, ২১ আগস্ট ২০১৯

ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে উদ্ধার হওয়া আসমা খাতুনের (১৭) মরদেহ পঞ্চগড়ে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার বেলা ১১টায় স্থানীয় শিংপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত নামাজে জানাজা শেষে শিংপাড়া গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে ভোর ৬টার দিকে মরদেহ পঞ্চগড়ে পৌঁছায়।

এসময় আসমা খাতুনের পরিবারসহ গোটা শিংপাড়া এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। পরিবারের সদস্য, আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায়। নিহত আসমা খাতুন পঞ্চগড় জেলা সদরের শিংপাড়া গ্রামের দিনমুজুর আব্দুর রাজ্জাকের মেয়ে। এবার স্থানীয় খানবাহাদুর মাদরাসা থেকে এবার জিপিএ-৪.৩ পেয়ে দাখিল পাস করেছিল। তিন বোন এবং এক ভাইয়ের মধ্যে সে দ্বিতীয়।
পরিবারের আর্থিক অনটনে তাকে আর কলেজে ভর্তি করা হয়নি।

নামাজে জানাজায় পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য মজাহারুল হক প্রধান, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার সাদাত সম্রাট, নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) মো. ইকবাল হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আব্বাস আলী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।

দাফন শেষে জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিনের প্রতিনিধি হিসেবে এনডিসি ইকবাল হোসেন নিহতের পরিবারকে নগদ আর্থিক সহায়তা ছাড়াও চাল, ডাল, তেলসহ শুকনা খাবার প্রদান করেন।

নিহত আসমার পরিবার জানায়, রোববার সকালে আসমা খাতুনের বাবা দৈনন্দিন কাজে বাড়ি থেকে বের হলে একটি কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে আসমা বাড়ি থেকে বের হন। এরপর আত্মীয়-স্বজনের বাড়িসহ বিভিন্নভাবে খোঁজ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

Panchagarh-Asma-Khatun

সোমবার সকালে কমলাপুর রেল স্টেশনে ময়মনসিংহ-ঢাকার বলাকা কমিউটার ট্রেনের একটি পরিত্যক্ত বগি থেকে গলায় ওড়না পেঁচানো তার মরদেহ উদ্ধার করে রেল পুলিশ। এ সময় তার ব্যাগে থাকা মোবাইল ফোন এবং জন্মসনদ দেখে পরিচয় সনাক্ত করে পুলিশ আসমার বাড়িতে খবর দেন। মরদেহ উদ্ধারের পর প্রাথমিক সুরতহালে তার শরীরের বিভিন্নস্থানে আঘাতের চিহ্ন এবং রক্তের দাগ পাওয়া যায়।

মরদেহের ময়নাতদন্তে তাকে শ্বাসরোধে হত্যাসহ ধর্ষণের আলামতও পাওয়া যায়। এ ঘটনায় ঢাকায় অবস্থানরত আসমা খাতুনের চাচা বাদী হয়ে ঢাকা রেলওয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় বাঁধন নামে তার এক সহপাঠি তরুণকে আসামি করা হয়। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য মতে, বাঁধনকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে আসমার গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য মজাহারুল হক প্রধান, জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন, পুলিশ সুপার মো. ইউসুফ আলীসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিহত আসমার বাড়ি পরিদর্শন করেন। তারা নিহতের পরিবারের খোঁজ খবর নেন এবং তাদের প্রতি সমবেদনা জানান। দিনমুজুর এ পরিবারে আসমা খাতুন যেন ছিল গোবরে পদ্মফুল। ভালো ফলাফলে এসএসসি পাস করলে সংসারে অভাবের কারণে তাকে আর কলেজে ভর্তি করা হয়নি। মেধাবী মেয়ের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরে হতবাক তারা বাবা-মা। চোখের পানি শুকিয়ে গেছে তাদের। কোনো কিছু জিজ্ঞেস কারায় কথা বলতে শুরু করলে বলতেই থাকেন। স্থানীয়রা তাদের দিকেই তাকিয়ে থাকেন আর আফসোস করে বলেন, আহা ! মেয়েটি বেশ মেধাবী আর দেখতে সুন্দর ছিল।

নিহতের বাবা মায়ের দাবি, আসমার বাড়ির পাশে হেলিপ্যাড সিতাগ্রাম এলাকার হানিফ ইসলামের ছেলে এ মারুফ হাসান বাঁধন। ঘটনার পর জানা গেছে, বাঁধনের সঙ্গে আসমার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। রোববার সকাল ১০টার দিকে তারা দুজন প্রায় একই সময়ে পৃথকভাবে তাদের বাড়ি থেকে বের হন। পরদিন আসমা খাতুনের মরদেহ উদ্ধারের পর থেকে বাঁধনেরও কোনো হদিস নেই। মারুফ হাসান বাঁধন এবং আসমা খাতুন একই সঙ্গে স্থানীয় খান বাহাদুর দাখিল মাদরাসা থেকে এবার দাখিল (এসএসসি) পাস করেন। আসমার বাড়িতে পাওয়া তার ব্যবহৃত বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক এবং খাতার একাধিক স্থানে বাঁধনের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্কের নমুনা রয়েছে। সে প্রায় সময় ফোনে বাঁধনের সঙ্গে কথা বলতো। ঘটনার আগের দিন বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সে ফোনে কথা বলছিল বলে দাবি করেন, আসমা খাতুনের চাচি জুলেখা বেগম।

চাচি জুলেখা বেগম বলেন, আমরা মেয়েকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি। আমাদের পাশের হেলিপ্যাড সিতাগ্রাম এলাকার বাঁধন তাকে ফুসলিয়ে নিয়ে গেছে। তাকে নির্যাতন করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এর সঠিক বিচার চাই। অপরাধীর ফাঁসি চাই।

আসমা খাতুনের সহাপাঠী বান্ধবি মনছুরা বেগম বলেন, আসমা আমার ভালো বান্ধবি ছিল। তার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বাঁধনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। আসমা প্রায় বলতো, সে বাঁধনকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবে না। তবে এভাবে কোথাও যাওয়ার ব্যাপারে সে কখনও কিছু বলেনি।

নিহত আসমা খাতুনের মা শেফালি বেগম বলেন, রোববার সকাল থেকে আসমার কোনো খোঁজ পাইনি। ভেবেছিলাম, সে কোনো ছেলের সঙ্গে কোথাও চলে গেছে। আমি কোথায় খুঁজবো। কোনো উপায় না পেয়ে পরদিন সকালে প্রতিদিনের মতো কাজে বের হই। স্থানীয় ইউপি সদস্যের জমিতে ক্ষেতের কাজ করছিলাম। এ সময় একজন এসে মেয়ের লাশ উদ্ধারের খবর দেয়। বলছিল, ঢাকার রেল স্টেশনে তার নাকি লাশ পাওয়া গেছে। সে কীভাবে কার সঙ্গে ঢাকায় গেলো। তাকে কেন মারলো। আমিতো অনেক কষ্ট করে তাদের মানুষ করার চেষ্টা করছিলাম। স্বামী-স্ত্রী দুজনই প্রতিদিন কাজে বের হই। সেদিনও কাজে গিয়েছিলাম। এখন কি হবে, কি করবো?

আসমার বাবা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমার মেয়ে আসমা বেশ মেধাবী ছিল। এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৩ পেয়েছিল। তাকে আর কলেজে ভর্তি করতে পারিনি। সারাদিন বাসায় থাকতো। মাঝেমধ্যে বান্ধবিদের সঙ্গে বাড়ির বাইরে বের হতো। কোনো দিন দূরে কোথাও যায়নি। সম্ভবত বিয়ের কথা বলে আমার অবুঝ মেয়েকে নিয়ে যায় বাঁধন। এরপর তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাকে গ্রেফতার করলে আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে। আমি এর উপযুক্ত বিচার চাই।

তবে অভিযুক্ত মারুফ হাসান বাঁধনের মা বিলকিস বেগম বলেন, আমার ছেলে আর আসমা এক মাদরাসায় পড়েছিল এটা ঠিক। কিন্ত তার সঙ্গে আমার ছেলের কোনো সম্পর্ক ছিল না। আমরা তাদের কখনও এক সঙ্গে দেখিনি। সোমবার সকাল ১০টার দিকে বাঁধনও তার নানা বাড়ি যায়। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মিলে যাওয়ায় তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে। সোমবার রাতে বাঁধন তার নানা বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের খোশবাজার এলাকায় ছিল। সে ঢাকা যায়নি। অনেকে তাকে ফোন করায় সে ভয় পেয়েছে। এজন্য হয়তো ফোন বন্ধ করে কোথাও রয়েছে।

পুলিশ সুপার মো. ইউসুফ আলী বলেন, ঘটনাটি আমাদের এলাকার বাইরে। ঢাকার রেল স্টেশনে মরদেহটি উদ্ধার হয়। এজন্য সেখানেই রেল পুলিশ মামলা নিয়েছে। তবে নিহতের বাড়ি যেহেতু পঞ্চগড়ে। এজন্য এখানে একজন অফিসারের নেতৃত্বে ছায়া তদন্ত শুরু করা হয়েছে।

সফিকুল আলম/এমএএস/পিআর