অপরিকল্পিত অবমুক্ত, বন্যপ্রাণির জন্য হুমকি
জাত ভেদে বিভিন্ন প্রাণির বেঁচে থাকার জন্য ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ দরকার। বন্যপ্রাণিরা তাদের উপযোগী পরিবেশেই বেড়ে ওঠে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে ধরা পড়া বণ্যপ্রাণিকে সবসময় উপযুক্ত স্থানে অবমুক্ত করা হচ্ছে না। বলে হুমকির মুখে পড়ছে তাদের জীবন।
দিনে দিনে দেশের বনগুলোতে খাদ্য এবং উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে বন্যপ্রাণিরা লোকালয়ে আসছে এবং ধরাও পড়ছে। এরপর যেগুলোকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে সেগুলোকে আবার অবমুক্ত করা হয় কোনো বনে। কিন্তু যে বনে অবমুক্ত করা হয় দেখা যায় সে বনে একই পরিবেশে ভিন্ন অভ্যাসে অভ্যস্ত বিভিন্ন প্রাণিকে অবমুক্ত করা হয়। অজগর সাপ, মেছো বাঘ, মেছো বিড়াল বা বনরুই এগুলো আলাদা আলাদা পরিবেশের প্রাণি হলেও একই বনে অবমুক্ত করায় তাদের জীবন হুমকিতে পড়ছে বলে মনে করছেন বণ্যপ্রাণি বিশেজ্ঞ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলেন, মেছো বাঘ যেখানে হাওরের মাছ খেয়ে জলাশয়ের পাশের ঝোপঝাড়ে বড় হয় এটাই তার বাসস্থান। সেই মেছো বাঘকে একটি সংরক্ষিত বনে অবমুক্ত করলে সে সেখান থেকে পালাবে এবং এই বনে তার বেঁচে থাকা কঠিন। আর বেঁচে থাকা হুমকিতে পড়লে বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হবে। এছাড়া নিজ এলাকা থেকে নতুন জায়গায় ভিন্ন পরিবেশে অবমুক্ত করায় একদিকে যেমন প্রাণিটি সঙ্গীর অভাবে বংশ বিস্তার করতে পারছে না, অন্যদিকে ভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে পালাতে গিয়ে মানুষের হাতে ধরা পড়ছে বা গাড়ির চাকার নিচে পিষ্ট হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, অনেক সময় দীর্ঘদিন মানুষের সংস্পর্শে থাকা বন্যপ্রাণিকে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই এবং অসুস্থ প্রাণিকেও সংরক্ষিত বনে অবমুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। এতে মহাবিপদ হতে পারে প্রাণিদের। উল্লুক গবেষণা ও সংরক্ষণ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী তানভীর আহমেদ জানান, দেশে বন্যপ্রাণি অবুমুক্ত করার প্রধান জায়গা সংরক্ষিত বন। যেগুলোতে বেশ কিছু বিপন্ন-মহাবিপন্ন প্রাণি টিকে আছে। বাইরের অসুস্থ কোনো প্রাণি বনে ছেড়ে দিলে বিপন্ন প্রাণি আক্রান্ত হওয়ার ভয় থাকে। তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। সেই সঙ্গে অবমুক্ত করার আগে তার জন্য এই পরিবেশ উপযুক্ত কি-না তা ভালো করে যাচাই করা উচিত।

বাংলাদেশের সংরক্ষিত একটি বন লাউয়াছড়া। এখানে বিরল এবং বিপন্ন প্রজাতির বিভিন্ন প্রাণি রয়েছে যা এই বনকে অন্য বন থেকে আলাদা মর্যদা দিয়েছে। গবেষক এবং দর্শনার্থীদের কাছে প্রিয় এই বন দিনে দিনে হুমকির মুখে পড়ছে অপরিকল্পিত বন্যপ্রাণি অবমুক্ত করার কারণে। সিলেট বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বন্যপ্রাণি উদ্ধার করার পর তা এনে অবমুক্ত করা হয় লাউয়াছড়ায়। সম্প্রতি কুড়িগ্রামে ধরা পড়া একটি বনরুইকেও এনে অবমুক্ত করা হয়েছে বহু দূরের এই লাউয়াছড়া বনে। এতে লাউয়াছড়া বনের উপর যেমন চাপ বাড়ছে, তেমনি মারাত্মক হুমকিতে পড়ছে অবমুক্ত করা প্রাণিটির জীবন। প্রাণি বিজ্ঞান এবং বন্যপ্রাণি বিশেজ্ঞদের মতে কোনো প্রাণিকে নিজ আবাসস্থল থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে অবমুক্ত করলে সেই প্রাণির জীবন স্বাভাবিক থাকে না। স্বাভাবিক জীবন না থাকলে বংশবৃদ্ধিও ঘটে না। যে কোনো প্রাণি যে জায়গায় বড় হয় বা বেড়ে উঠে সে জায়গায় তার কাছে আদর্শ।
শুধু লাউছড়ায় অবমুক্তের ঘটনা নয়, আমাদের দেশে বিভিন্ন সময় এক স্থান থেকে উদ্ধার করে অন্য স্থানে নিয়ে বন্যপ্রাণিকে অবমুক্ত করা হয়। যা অবৈজ্ঞানিক এবং প্রকৃতিগত ভাবে বন্যপ্রাণির ক্ষতির কারণ। যে কোনো প্রাণিকে নতুন জায়গায় অবমুক্ত করলে সে নিজের বাসস্থানে ফিরে যেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ক্ষেত্র বিশেষ ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরেও চলে যেতে পারে। এই পথ পাড়ি দিতে গিয়েই সে সড়ক দুর্ঘটনা বা মানুষের হাতে পরে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়।
২০১৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ির লঙ্গরপার এলাকা থেকে একটি অজগর সাপ উদ্ধার করা হয়। পরে ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৬ কি.মি দূরে লাউয়াছড়া বনের জানকিছড়ায় সাপটিকে অবমুক্ত করা হয়। নাম দেয়া হয় হাসান। এর আগে তার গায়ে স্যাটেলাইট রেডিও ট্রেকার বসান পাইথন প্রজেক্টের গবেষক শাহারিয়ার সিজার রহমান। কিন্তু ৬ কি.মি দূরে এনে অবমুক্ত করার পর হাসানের একমাত্র লক্ষ্য দাঁড়ায় আগের আবাসস্থলে ফিরে যাওয়া। এক বছরে ধরে বিভিন্ন পথে প্রায় ১৫/১৬ কি.মি ঘুরে হাসান আবারও চলে যায় তার পূর্বের আবাস স্থল ফুলবাড়ী।
সরীসৃপ গবেষক শাহারিয়ার সিজার জানান, এই পথ পাড়ি দিতে বারবার তার জীবনে হুমকি এসেছে। সে দুইবার করে রেললাইন এবং সড়ক অতিক্রম করছে। সে সময়ে তার জীবন বিপন্ন হতে পারত। তাই আমাদের এ বিষয়ে চিন্তা করা উচিত যে একটি বন্যপ্রাণিকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে অবমুক্ত করলে তা ওই প্রাণির জন্য আসলেই উপকার হচ্ছে, নাকি তার জীবন হুমকিতে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি প্রাণির নিজস্ব পছন্দের এবং উপযুক্ত পরিবেশ আছে। যা বিবেচনায় নিয়ে অবমুক্ত করলে প্রাণির জন্য ভালো হয়। যেমন মৌলভীবাজারের বাইক্কাবিল এবং লাউয়াছড়া দুইটি সংরক্ষিত এলাকা। দুই জাগায়তেই প্রাণি অবমুক্ত করা যায়। তবে, মেছো বাঘের জন্য লাউয়াছড়ার চেয়ে বাইক্কাবিল বেশি উপযুক্ত। কারণ সেখানে তার প্রিয় পরিবেশ পাবে।

এছাড়া প্রায় ২ বছর আছে সাতক্ষীরার শ্যমনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের মিরগাং গ্রামের এক বনজীবী শখের বসে একটি বাচ্চা ভোঁদড় ধরে এনে লালন-পালন করতে থাকেন। ইচ্ছে ছিল একে বড় করে মাছ শিকারের কাজে লাগাবেন। কয়েক মাসে ভোঁদড়টিকে তিনি নিজের পুকুরে বসবাসে অভ্যস্ত করে ফেলেন। এরই মধ্যে ঘটনাটি নজরে আসে সুন্দরবনের ওয়াইল্ড টিমের সদস্য ও গবেষক ইসমে আজমের। তিনি এই বনজীবীকে জানান, এভাবে বন্যপ্রাণি পোষ মানানো অপরাধ, বনবিভাগ এর জন্য শাস্তি দেবে। এ কথা শোনার পর ওই ব্যক্তি ভয় পেয়ে পরেরদিন বাড়ি থেকে ৩ কি.মি দূরে ভোঁদড়টিকে ছেড়ে দিয়ে আসেন। কিন্তু উনি বাড়িতে আসার আগেই সেটি চলে আসে। পরেরদিন তিনি ৪০ কি.মি দূরে ভোঁদড়টি অবমুক্ত করেন। কিন্তু এর ৪ দিন পর নানা পথ ঘুরে ভোঁদড়টি আবার তার পুকুরে চলে আসে। তিনি বুঝতে পারেন যে নিজের পুকুরে ছোট থেকে বড় করায় প্রাণিটি পুকুরেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। পরে তিনি প্রতিদিন যে দিকে যেতেন সে দিকেই অবমুক্ত করতেন। এভাবে ৩ মাস করার পর ভোঁদড়টির অভ্যাস পরিবর্তন হয় এবং সে বনে স্থায়ী হয়।
এ বিষয়ে গবেষক ইসমে আজম বলেন, প্রতিটি প্রাণি যে স্থানে বড় হয়, ঘুরেফিরে সে তার নিজের জায়গার চলে যায়। তাই বন্যপ্রাণি অবমুক্ত করতে হলে তার নিজ এলাকায় এবং উপযোগী পরিবেশেই অবমুক্ত করতে হবে।
লাউয়াছড়া একটি রেইন ফরেষ্ট। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে এখানে মেছো বাঘ অবমুক্ত করা হয়েছে। এমনকি হাকালুকিসহ বিভিন্ন হাওর থেকে আটক মেছো বাঘও অবমুক্ত করা হয় এখানে। ফলে তারা জলাশয়ের অভাবে ভোগে।
জাবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণি বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান জানান, মেছো বাঘের জন্য জলাশয়ের আশপাশ ভাল। একটা প্রাণি কয়েকটি ভিন্ন পরিবেশেও থাকতে পারে। এরমধ্যে ভালো উপায় হচ্ছে যে প্রাণিকে যে স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়, সেখানেই অবমুক্ত করা। তবে, সেখানে তার নিরাপত্তা এবং জীবনের হুমকি থাকলে সে ক্ষেত্রে বিকল্প জায়গায় অবমুক্ত করা যায়। যেমন উল্লুক উঁচু গাছে থাকে। তাকে গাছ নেই এমন বনে অবমুক্ত করলে সে টিকতে পারবে না।
এমএমজেড/পিআর