অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্বে মুক্ত হয় গাজীপুর

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি গাজীপুর
প্রকাশিত: ১০:৫৮ এএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০২০

আজ ঐতিহাসিক ১৫ ডিসেম্বর, গাজীপুর মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে বর্বর পাকহানাদার বাহিনীর কবল থেকে অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্বে গাজীপুর মুক্ত হয়েছিল। প্রতিবছর এই দিনটি গাজীপুরবাসীর জন্য অত্যন্ত স্মরণীয় ও গর্বের দিন।

ভাষাশহীদ কলেজের অধ্যক্ষ ও গবেষক অধ্যাপক মুকুল কুমার মল্লিক জানান, এদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত গাজীপুর-ঢাকা মহাসড়কের ছয়দানা এলাকা দিয়ে ঢাকার দিকে পালিয়ে যাওয়ার সময় পাকহানাদার বাহিনীর বিরাট একটি কনভয়ের ওপর মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর উপর্যুপরি প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ অব্যাহত থাকায় গাজীপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধারা সম্মিলিতভাবে প্রবেশ করতে পারেননি। পরদিন ১৬ ডিসেম্বর খুব ভোরে বিজয়ীর বেশে মুক্তিযোদ্ধারা গাজীপুরে প্রবেশ করেন। অবশ্য বেশ কয়েকজন অকুতোভয় নির্ভীক মুক্তিযোদ্ধা ১৫ ডিসেম্বর রাতেই গাজীপুরে প্রবেশ করেন।

১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার জয়দেবপুর যা বর্তমানের গাজীপুর। ওই দিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন জয়দেবপুরবাসী। সেদিন শহীদ হন নিয়ামত, হুরমত, মনু খলিফা আর আহত হন অনেকে। সারাদেশে স্লোগান ওঠে ‘জয়দেবপুরের পথ ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে গাজীপুরবাসীর রয়েছে বীরত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকহানাদার বাহিনী বাঙালির ওপর অতর্কিতে হামলা করার পর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে গাজীপুরের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ছাত্র, শ্রমিক-জনতা ভারতে চলে যান। ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে তারা এলাকায় এসে বিভিন্ন পয়েন্টে অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। নভেম্বর মাসে এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা জোরালোভাবে বৃদ্ধি পায়। এ সময় এলাকায় পাকহানাদার বাহিনীর অবস্থানের ওপর মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালায়। ৩ ডিসেম্বর সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলে মুক্তিবাহিনী তাদের আক্রমণ আরও জোরদার করে।

১৩-১৪ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা গাজীপুরে সেনানিবাসে সম্মিলিতভাবে আক্রমণ চালায়। এতে পাকহানাদার বাহিনী একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে পাকবাহিনী গাজীপুর ছেড়ে ঢাকায় পালিয়ে যাওয়ার মনস্থ করে। গাজীপুর এবং সমরাস্ত্র কারখানা ও রাজেন্দ্রপুর অর্ডিন্যান্স ডিপো থেকে পাকহানাদাররা ঢাকার পথে চান্দনা চৌরাস্তায় জড়ো হতে থাকে।

এছাড়া দেশের উত্তরাঞ্চল অর্থাৎ ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল থেকে পাকহানাদাররা মিত্র ও কাদেরিয়া বাহিনীর আক্রমণে টিকতে না পেরে ঢাকার দিকে পিছু হটতে থাকে। তারা টাঙ্গাইল সড়কযোগে পিছু হটে চান্দনা চৌরাস্তায় একত্র হতে থাকে। পিছু হটার সময় তারা কড্ডা ব্রিজটি পুরো ধ্বংস করে দেয়। ফলে পিছু ধাওয়াকারী মিত্র ও কাদেরিয়া বাহিনী কোনাবাড়ী হয়ে কাশিমপুরে অবস্থান নেয়।

চান্দনা চৌরাস্তায় জড়ো হওয়া পাকহানাদার বাহিনীর বিরাট একটা কনভয় ঢাকার দিকে রওনা দেয়। পথে ছয়দানা এলাকায় পৌঁছালে কাশিমপুর থেকে মিত্র ও কাদেরিয়া বাহিনী তাদের ওপর কামান ও মর্টারের শেল নিক্ষেপ করতে থাকে। একইসঙ্গে সড়কের দুইপাশে প্রবল গুলিবর্ষণে পাকহানাদার বাহিনী একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ধ্বংস হয় ট্যাংক, কামান, মর্টার, যানবাহন ও গোলাবারুদ। হতাহত হয় অসংখ্য পাকসেনা।

মুক্তিযুদ্ধের শেষপর্যায়ে ঢাকার কাছে এটাই ছিল পাকহানাদার বাহিনীর সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। পাকবাহিনীর ওপর গোলাবর্ষণ ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ওই দিনই গাজীপুর মুক্ত হয়। প্রতিবছরই নানা কর্মসূচির মাধ্যমে এ দিবসটি পালন ও শহীদদের স্মরণ করা হয়ে থাকে।

মো. আমিনুল ইসলাম/বিএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।