অর্ধশতাধিক সাঁকোর গ্রাম টোংরাইল

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফরিদপুর
প্রকাশিত: ০৫:৩৫ পিএম, ০২ এপ্রিল ২০২১

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার রুপাপাত ইউনিয়নের একটি গ্রাম টোংরাইল। সবুজ শ্যামল এই গ্রামের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সুদীর্ঘ একটি খাল। খালটি এখন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাধীন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া এই খালের উপর গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক বাঁশের সাঁকো।

আগে নৌকাই ছিল এই গ্রামের লোকজনের চলাচলের একমাত্র বাহন। তবে প্রতিদিনের চলাচলের জন্য এখন তারা ব্যবহার করেন এই বাঁশের সাঁকো। খালের ওপাড়ে থাকা পরিবারগুলো নিজেদের প্রয়োজনে নিজের খরচেই তৈরি করে নিয়েছেন এসব সাঁকো। সবমিলিয়ে এই সাঁকোর সংখ্যা প্রায় ৬০টির মতো। কোনোটিতে দুটি বাঁশ আবার কোনোটিতে চার-পাঁচটি বাঁশ পাতা হয়েছে হেঁটে যাওয়ার জন্য। গ্রামটিতে প্রথমবার গেলে মনে হবে, এটি যেন বাঁশের সাঁকোর গ্রাম।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরত্বের প্রত্যন্ত এই টোংরাইল গ্রামের জনবসতি খুব বেশি নয়। গ্রামের জনসংখ্যা সবমিলিয়ে চার হাজারের মতো। ভোটার সংখ্যা ছয় শতাধিক। মাত্র শ’ তিনেক পরিবারের বসতি এখানে। গ্রামটির বেশিরভাগ অধিবাসীই কৃষক। খাল পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা একসময়ের মেঠো পথটির অর্ধেক অংশ এখন পিচঢালা পাকা সড়ক হয়েছে।

একই উপজেলার পাশের শেখর ইউনিয়নের তেলজুড়ি গ্রামে কুমার নদ থেকে এই খালের উৎপত্তি। এরপর মুড়া গ্রামের ভেতর দিয়ে এসে টোংরাইল গ্রাম হয়ে কালিনগর গ্রামে পৌঁছে ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মধুমতি নদীর সঙ্গে মিশেছে খালটি। দুই পাশে কৃষি জমি ও ঘরবাড়ি ছাপিয়ে খালটি বয়ে গেছে এঁকেবেঁকে। সারাবছরই কমবেশি পানি থাকে আর ভরা বর্ষায় পানিতে টইটুম্বুর হয়ে ওঠে খালটি।

তবে এই খালের উপর কোনো সেতু না থাকায় গ্রামবাসীর ভোগান্তিও কম নয়। স্বপন দাস (৪১) নামে ওই গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানান, খালের ওপাড়ে চলাচলের রাস্তা রয়েছে। তবে সেতু না থাকায় যানবাহন ওপাড়ে যেতে পারে না। ক্ষেতের ফসল নিয়ে এই বাঁশের সাঁকো পাড়ি দিতে তাদের অনেক ভোগান্তি হয়। এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

গ্রামের কৃষক সুনীল বিশ্বাস (৫৮) জানান, জন্মের পর থেকেই তিনি এই খাল দেখে আসছেন। তখনও বাঁশের সাঁকো ছিল। টোংরাইল ব্রিজের পর কালিনগর পর্যন্ত সড়কের কিছুদূর পর রাস্তা খুবই খারাপ।

jagonews24

টোংরাইল গ্রামের বাসিন্দা ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী সুমন রায় (২৪) জানান, টোংরাইল খালের উপড়ে প্রায় ৬০টির মতো বাঁশের সাঁকো রয়েছে।

তিনি আরও জানান, গ্রামে কৃষিজীবী মানুষ বেশি হলেও প্রত্যেক ঘরেই স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রী রয়েছে। তবে গ্রামে একটি মাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া আর কোনো বিদ্যালয় নেই। প্রাইমারি পাস করে অনেকে পাশের গ্রাম বনমালিপুর জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়।

স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার রবিন বিশ্বাসও জানালেন সেতু না থাকায় ভোগান্তির কথা। তিনি বলেন, গ্রামের অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিতে অনেক কষ্ট হয়। এলাকায় কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক নেই এখনো। পাশের সুতালিয়া গ্রামে একটি পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। তবে সেখানে কোনো ডাক্তার থাকেন না বলে এখন আর কেউ সেখানে যান না।

তিনি আরও জানান, ২০১৮ সালে গ্রামটিতে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেন সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান। এছাড়া তিনি প্রাইমারি স্কুলের ভবন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সাহায্য, গভীর নলকূপ স্থাপনের ব্যবস্থা করেন। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে এলাকার রাস্তাঘাট উন্নয়ন এবং স্কুল ও হাসপাতাল নির্মাণের দাবি জানান রবিন বিশ্বাস।

তবে বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঝোটন চন্দ বলছেন, টোংরাইল খাল ওই গ্রামের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এজন্য উপজেলা প্রশাসন খালটির অস্তিত্ব ও স্বকীয়তা বজায় রাখতে তৎপর।

তিনি আরও বলেন, খাল পাড়ে অবৈধ স্থাপনা তুলে বা পলিথিন ও প্লাস্টিকসহ অন্যান্য বর্জ্য ফেলে কেউ যাতে খালের প্রবাহ নষ্ট না করে সেজন্যও তারা দৃষ্টি রাখছেন।

এমআরআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।