জৌলুস হারিয়ে বিলুপ্তির পথে রাজবাড়ীর সিনেমা হল

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি রাজবাড়ী
প্রকাশিত: ০৪:১৮ পিএম, ০৯ এপ্রিল ২০২১

একসময় রাজবাড়ীতে হল ব্যবসার জৌলুস থাকলেও এখন তা বিলুপ্তির পথে। হলে নেই কোনো দর্শক।

জেলার পাঁচ উপজেলায় ২০টি হলের মধ্যে নামমাত্রে চালু রয়েছে তিনটি। তবে হলের পরিবেশ ও অবকাঠামো ভালো না হওয়ায় দর্শক মেলে না।

জানা যায়, রাজবাড়ীর ২০টি হলের মধ্যে সদরে ছয়টি, পাংশায় চারটি, গোয়ালন্দে তিনটি, বালিয়াকান্দিতে ছয়টি এবং কালুখালীকে একটি রয়েছে। যার মধ্যে সচল রয়েছে রাজবাড়ী শহরে সাধনা, গোয়ালন্দের দৌলতদিয়ায় মনোরমা ও কালুখালীতে বৈশাখী।

সাধনা নিয়মিত চলু থাকলেও দর্শক অভাবে বন্ধ থাকে বেশির ভাগ শো। এছাড়া দৌলতদিয়ার মনোরমা ও কালুখালীর বৈশাখীতে বিভিন্ন উৎসবে ছবি প্রদর্শিত হয়।

রাজবাড়ী শহরে ষাটের দশকে প্রথম চালু হয় চিত্রা হল। এরপর একে একে রেলওয়ে মিলনায়তনে হোসনে বাগ, শহরে বসুন্ধরা ও সাধনা, গোয়ালন্দ মোড়ে মোনালিসা ও শহরের পাট বাজারে পদ্মা হল স্থাপিত হয়। বর্তমানে সাধনা ছাড়া বাকিসব বন্ধ রয়েছে।

jagonews24

সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ না হওয়া, ভারতীয় চ্যানেলের প্রভাব ও ভিডিও পাইরেসির কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে হল ব্যবসা।
সাধনা হলের আগে নাম ছিল বনানী। দিনে চারটি শো চলার কথা থাকলেও দর্শক অভাবে চলে মাত্র এক-দু’টি শো। সেসব শো’তেও দর্শক হয় কয়েকজন। যা দিয়ে বিদ্যুৎ বিলের টাকায় উঠে না।

বালিয়াকান্দির বহরপুরে ১৯৮৪ সালে ললিতা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর কয়েক মাস পর শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় মধুমতি। ২০১০ সালে লোকসানের কারণে ললিতা এবং ২০১৩ সালে পারিবারিক কারণে মধুমতি বন্ধ হয়ে যায়।

এছাড়া জামালাপুর বাজারে অনিক, মৃগীতে আনারকলি, নারুয়ায় শ্যামলী ও বহরপুর বাজারের লাবণী হল লোকসানে বন্ধ হয়ে যায়।

অপরদিকে পাংশায় ১৯৮৪ সালে তাজ, ১৯৮৮ সালে নূপুর, ১৯৯০ সালে চন্দনা এবং সোনাপুরে ১৯৯৬ সালে স্বর্ণালী হল চালু হয়।

এসব হলের মধ্যে ১৯৯০ সালে তাজ, ২০০২ সালে নূপুর, ২০১০ সালে স্বর্ণালী এবং ২০১৩ সালে চন্দনা হল বন্ধ হয়ে যায়।

অন্যদিকে গোয়ালন্দে গোধূলী, মুন ও মনোরমা ছিল। তবে ২০০৪ সালে গোধূলী ও ২০০৭ সালে মুন বন্ধ হয়ে যায়। দৌলতদিয়ার মনোরমা এখন শুধু উৎসবে চালু থাকে।

এছাড়া একই অবস্থা কালুখালীর বৈশাখী হলের। উপজেলার একমাত্র হল হলেও এটি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

jagonews24

বন্ধ হয়ে যাওয়া হলগুলোর মধ্যে কয়েকটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। আর দাঁড়িয়ে থাকাগুলো গুদামে পরিণত হয়েছে।

সাধনা হলের কর্মচারী রবি চন্দন দাস বলেন, তিনি একাধারে অপারেটর, টিকিট কাউন্টারের মাস্টার ও গেটম্যানসহ হলের যাবতীয় দেখাশুনা করেন। বর্তমানে হলে দর্শক আসে না। চারটি শো’র মধ্যে কোনো কোনো শোতে একজন দর্শকও হয় না। দর্শক হলেও পাঁচ-সাতজনের বেশি না।

তিনি আরও বলেন, হলের পরিবেশ মোটামুটি ভালো রয়েছে। ব্যবসা না হলে মালিক কাজ করবে কী দিয়ে। এছাড়া মাস শেষে মালিক আমার বেতনই দিতে পারে না। এরপর বিদ্যুৎ বিল দিতে হয় মালিকের পকেট থেকে। ভালো গল্পের ছবির অভাব ও মুক্তির আগেই ইন্টারনেটে ছবি পাওয়ায় দর্শক এখন হলে আসে না।

হল সংলগ্ন ব্যবসায়ী কল্পনা রাণী ও হারান জানান, প্রায় ৩০ বছরের বেশি সময় তারা হলের পাশে দোকান দিয়ে ব্যবসা করছেন। আগে হলে দর্শক সিরিয়াল দিয়ে টিকেট নিত।

তারা আরও বলেন, তখন সিনেমার সঙ্গে তাদের ব্যবসাও ভালো হতো। কিন্তু এখন ভালো ছবি আসে না। দর্শকও হয় না।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, হলে দর্শক না হওয়ার অনেক কারণ আছে। দর্শকের রুচি বদলেছে কিন্তু হলের অবস্থা সেই আগের মতোই রয়েছে। বর্তমানে যেসব ছবি নির্মিত হচ্ছে, সেগুলোর মান ভালো নয়। যে কারণে দর্শক হলমুখী হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, জেলায় ২০-২২টি হল ছিল। কিন্তু এখন মাত্র তিনটি আছে। সেগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। হলের পরিবেশ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হলে দর্শকরা আর হলে ফিরবে না।

jagonews24

কালুখালীর বৈশাখী হলের মালিক মো. জালাল বলেন, দুইটি সিনেমা হল রয়েছে। একটি কালুখালীতে আরেকটি মধুখালীতে। বৈশাখী হল কোনো রকমে চালু রেখেছি। এখানে দর্শক হয় না, দর্শক আসলে শো চলে।

তিনি আরও বলেন, হল ব্যবসা আগের মতো নেই। এখন শুধু লোকসান আর লোকসান। দর্শক নিয়মিত হলে আসলে হলেরও পরিবেশও ভালো থাকে।

ভিডিও পাইরিসি বন্ধ ও ভালো ছবি নির্মাণ করলে দর্শকরা আবারও হলমুখী হবে বলে তিনি আশাবাদী।

সাধনা ও মনোরমা হলের মালিক ও রাজবাড়ী পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া জানান, সাতটি সিনেমা হলের মধ্যে এখন দুইটি রয়েছে। লোকসানের কারণে অন্যগুলো বন্ধ করেছি। যে দুটি চালু রয়েছে, সেগুলোও বন্ধের উপক্রম।

তিনি আরও জানান, ভারতীয় ছবি দু’দেশে একসঙ্গে মুক্তি পেলে কিছুটা ব্যবসা হতে পারে। ব্যবসা না হলে হলের পরিবেশ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা সম্ভব নয়।

রুবেলুর রহমান/এসএমএম/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।