যুদ্ধে স্বামী-সম্ভ্রম হারানো চারুবালা ৫০ বছর ধরে দুর্গম চরে

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফরিদপুর
প্রকাশিত: ১০:৩৫ পিএম, ২০ এপ্রিল ২০২১

‘ভাঙা ছাপড়ায় একা একা পড়ে আছি। কেউ ভুলেও খোঁজখবর নেয়নি। কিছুদিন আগে শহীদ স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটির সদস্যরা আমার বাড়িতে এসেছিলেন। তারপর এলেন থানার ওসি। আমার আর কিছু চাওয়া-পাওয়ার নেই। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর কেউ তো আমার খোঁজ নিল।’

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার গাজীরটেক ইউনিয়নে পদ্মানদীর অপর পাড়ের দুর্গম চর রমেশ বালারডাঙ্গিতে বসবাসরত চারুবালা (৬৭) পুলিশের পক্ষ থেকে এক ঝুড়ি ফল পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে এ কথা বলছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হায়েনারা চারুবালার স্বামী চন্দ্রচরণ বিশ্বাস ও শিশুসন্তান পার্বতীকে মেরে ফেলে। তাকে ধর্ষণ করে ও বাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার পর ওই দুর্গম চরে অসহায় অবস্থায় একা একা ৫০টি বছর কাটিয়ে দিয়েছেন চারুবালা।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে চারুবালার হাতে ঝুড়িভর্তি ফল তুলে দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ফরিদপুরের চরভদ্রাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকারিয়া হোসেন।

সোমবার (১৯ এপ্রিল) বিকেলে রমেশ বালারডাঙ্গির ভাঙা ঘরে অসুস্থ চারুবালাকে (৬৭) দেখতে যান ওসি জাকারিয়া হোসেন। সঙ্গে ছিলেন থানার সেকেন্ড অফিসার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফিরোজ আলী মোল্লা এবং এসআই আওলাদ হোসেন।

তাদের কাছে পেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বীরাঙ্গনা চারুবালা বলেন, ‘৫০ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের সময় একদিন আমার স্বামী চন্দ্রচরণ বিশ্বাসকে গুলি করে মারে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা। আমার কোল থেকে কেড়ে নিয়ে দুই বছরের শিশু পার্বতীকে উঠোনের ওপর আছড়ে মেরে ফেলে। পরে আমাকে নির্যাতন করে ও সম্ভ্রমহানি ঘটায়। সেইদিনের সেই করুণ দৃশ্য আমি কোনোদিনও ভুলতে পারব না। আমার ও আমার পরিবারের এই করুণ কাহিনী জানার পর পায়ে হেঁটে ও ঘোড়ার গাড়িতে বহু কষ্ট করে এ দেশের মাটির সন্তান পুলিশ কর্মকর্তারা আমাকে দেখতে এসেছেন। জাতি আমাকে ভুলে যায় নাই, এর চেয়ে আজ আর আমার কাছে চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। আপনারা আমাকে মনে করেছেন। আমার শহীদ স্বামী-শিশুসন্তানকে স্মরণ করেছেন। আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই।’

jagonews24

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধে স্বামী ও শিশুসন্তান হারিয়ে চারুবালা পদ্মানদী থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে দুর্গম বালুচর ও ফসলি মাঠের জমির মধ্যে ভাই সিদ্ধিচরণ সরকারের আশ্রয়ে তার বসতভিটের উত্তর পাশে ছনবন ও পাটখড়ি দিয়ে গড়া একটি ভাঙা ঘরে থাকছেন।

চারুবালা বলেন, এখানে একা থাকি। তবু স্থানীয় প্রভাবশালী ও বখাটেরা আমার বসতি ভাঙাঘর ও সাধের এক টুকরো জমি কেড়ে নিতে হুমকি দেয়। এ ঘটনা জেনে ওসি জাকারিয়া প্রতিবেশীদের সবাইকে ডেকে জানিয়ে দেন, ‘চারুবালাকে কেউ যেন হুমকি না দেয়। এখন থেকে তিনি আমার দায়িত্বে থাকবেন। কোনো সমস্যা হলে সরাসরি আমাকে জানাবেন’।

ওসি জাকারিয়া হোসেন বলেন, ‘শহীদ পরিবারের সদস্য এবং বীরাঙ্গনা বাংলা মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পেরে আমি ও আমার সহকর্মীরা গর্বিত। ভবিষ্যতে তার সহায়তার জন্য যা যা করা দরকার তাই করা হবে।’

ফরিদপুর জেলা শহীদ স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি শেখ সাজ্জাদুল হক সাজ্জাত বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হায়েনারা চারুবালার স্বামী ও শিশুসন্তানকে মেরে ফেলে। তাকে ধর্ষণ করে ও বাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার পর ওই দুর্গম চরাঞ্চলে বীরাঙ্গনা চারুবালা অসহায় অবস্থায় একা একা ৫০টি বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। আমরা তাকে খুঁজে বের করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

এসআর/এইচএ/এমআরএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]