লেবু বিক্রি করেই চলে কবিরের সংসার, দিতে চান ফলের দোকান

উপজেলা প্রতিনিধি উপজেলা প্রতিনিধি কালীগঞ্জ (গাজীপুর)
প্রকাশিত: ০৮:৩৩ পিএম, ০৪ মে ২০২১
বিভিন্ন মৌসুমী ফল ও সবজি বিক্রি করেন কবির

গ্রীষ্মের তাপদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত। এদিকে চলছে রমজান। সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারে এক গ্লাস লেবুর শরবত শরীর ও মনে প্রশান্তি আনে। কিন্তু বাজারজুড়ে অপ্রাপ্তি আর উচ্চমূল্যের কারণে লেবু এখন সাধারণের নাগালের বাইরে। খরায় লেবুর ফলন নেই বললেই চলে। যে কারণে বাজারে লেবুর ঘাটতি। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছুটা দৈন্যদশা কাটিয়ে উঠছেন লেবু বিক্রেতা মো. কবির হোসেন।

নরসিংদী জেলার রায়পুরা পৌর এলাকায় নিজের বাড়ি হলেও প্রায় এক বছর ধরে গাজীপুরের কালীগঞ্জের অলিগলিতে বিভিন্ন রাস্তায় আনারস, কাঁচা-পাকা আম, লেবু বিক্রি করে বেড়ান। এই গরম থেকে রেহাই পেতে তার মাথার উপরে বিশাল ছাতা টানানো। এতে কড়া রোদ থেকে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই রক্ষা পাচ্ছেন।

কালীগঞ্জ পৌর এলাকার মুনশুরপুর গ্রামে বাদল মিয়ার বাড়িতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভাড়া থাকেন কবির হোসেন। বাজারে যখন যেই ফল বা সবজির ঘাটতি থাকে, তা তিনি সংগ্রহ করে কালীগঞ্জ এলাকায় ভ্যানে নিয়ে বিক্রি করে বেড়ান। প্রায় ২০ বছর ধরে এই ব্যবসা করছেন তিনি। নিজ এলাকায় ব্যবসার পরিস্থিতি ভালো নয় বলে, কালীগঞ্জে গত এক বছর ধরে অবস্থান করছেন এবং আগের থেকে বেশ ভালোই আছেন বলে জানান এই ফল বিক্রেতা।

jagonews24

টাকা-পয়সা হলে একটা ফলের দোকান দেয়ার ইচ্ছা কবিরের

কবির হোসেন জানান, দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠায় ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ৬ষ্ঠ শ্রেণির বেশি আর এগুতে আগাতে পারেননি তিনি। বাবাও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা করতেন। যে কারণে সংসারের অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। সংসারের বড় ছেলে হওয়ায় পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে তাকে বাবার সঙ্গে কাজে যোগ দিতে হয়েছে। খুব কাছ থেকে শিখেছেন কীভাবে ব্যবসা করতে হয়। তারপর বিয়ে করলে তার সংসারে তিন ছেলে ও তিন মেয়ে আসে। এত বড় সংসারের খরচ রায়পুরায় থেকে তিনি বহন করতে পারছিলেন না। তাই কালীগঞ্জের মুনশুরপুর গ্রামের বাসা ভাড়া নিয়ে স্থানীয় বিভিন্ন রাস্তা-ঘাটে চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন মৌসুমী ফল বা সবজি বিক্রি করেন কবির।

তিনি আরও জানান, প্রতিদিন ভোরে গাজীপুরের চৌরাস্তার এলাকার আড়ৎ থেকে সিলেটি লেবু কিনে নিয়ে আসেন। এক বস্তা লেবু আনেন ৪ হাজার টাকা দিয়ে। সারাদিন এই লেবু বিক্রি করে ৫-৬শ টাকা লাভ হয়। কিন্তু মাঝে মাঝে খারাপ লেবুও বস্তায় পড়ে গেলে লোকসান গুনতে হয়।

কবির বলেন, ‘আল্লাহ তবুও অনেক ভালো রাখছেন। যদি কখনো টাকা-পয়সা হয় তাহলে একটা ফলের দোকান দেব। দোকানটা দিতে পারলে কষ্ট কমে আসবে। এটাই আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা।’

jagonews24

কবিরকে দেখে ব্যবসা শুরু করেছে ১৪ বছর বয়সী আপন

এদিকে কবিরকে দেখে আগ্রহী হয়ে কালীগঞ্জ বাজার বাসস্ট্যান্ডে ভ্যানে করে লেবু ব্যবসা করছে কালীগঞ্জ পৌর এলাকার মুনশুরপুর গ্রামের ১৪ বছর বয়সী মো. আপন।

তিনি বলেন, ‘পরিবারে আয়-রোজগার করার মতো কেউ নেই। বাবা বেশ কিছুদিন হয় মারা গেছেন। মাকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন চলছে। একদিন কবির কাকার সঙ্গে দেখা হলে তিনিই উৎসাহ দেন ভ্যানে করে লেবু ব্যবসা করার। কিছুদিন হয় শুরু করেছি। এখন পর্যন্ত ভালোই আয় হয়েছে। সামনে এই সিজন (মৌসুম) গেলে অন্য কিছু করবো।’

কালীগঞ্জ ড্রাগ হাউজের স্বত্বাধিকারী ইমতিয়াজ আহমেদ রানা বলেন, ‘এই ভ্রাম্যমাণ লেবু ব্যবসায়ীকে (কবির হোসেন) আমি প্রায় এক বছর ধরে দেখছি। তিনি বিভিন্ন মৌসুমে বাহারি রকমের ফল ও সবজি বিক্রি করেন। খুবই ভালো ও পরিশ্রমী মানুষ তিনি। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, বাজারে যখন যেটা পাওয়া যায় না, তিনি তখন সেটা বিক্রি করেন। তুলনামূলকভাবে অনেক কম দামেই বিক্রি করেন। এই মুহূর্তে বাজারজুড়ে লেবুর সংকট হওয়ায় তিনি লেবু বিক্রি করছেন মাত্র আট থেকে দশ টাকা হালি দরে। এতে সাধারণ ক্রেতারাও উপকৃত হচ্ছে। যদিও তিনি স্থানীয় নন, কিন্তু এই কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে গেছেন।’

আব্দুর রহমান আরমান/এমএসএইচ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]