পানিবন্দি দিনরাত্রি, এর মাঝে ভয় সাপ-ডাকাতের
টানা কয়েকদিন পদ্মা নদীর রাজবাড়ী অংশে পানি বাড়তে থাকার পর এখন ধীরে ধীরে তা কমতে শুরু করেছে। যদিও এখনো পদ্মার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদী তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের প্রায় সাড়ে সাত হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
পানিতে জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল তলিয়ে যাওয়ায় ওইসব এলাকার মানুষের চলাচলসহ গবাদি পশুর তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি মানুষ জরুরি প্রয়োজনেও ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। অনেকের ঘরে চুলা জ্বালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। নৌকা ছাড়া কেউ পা বাড়াতে পারছে না। ভিটেবাড়িতে পানি ওঠায় ওইসব অঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে সাপ ও ডাকাত আতঙ্ক প্রবল হয়ে উঠছে।

নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলসহ জেলার চার উপজেলার হরিণবাড়ীয়া, মৌকুড়ী, কাঠুরিয়া, আম্বারিয়া, বেতকা, রাখালগাছি ও কুশাহাটার চরের বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। দিনের পর দিন পানিবন্দি থাকলেও চরের মানুষ দেখা পাচ্ছেন না কোনো স্থানীয় জনপ্রতিনিধির। মিলছে না বলার মতো ত্রাণ সহায়তা। এ অবস্থায় কাজ হারিয়ে অনেকে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
শুক্রবার (২৭ আগস্ট) সকালে পদ্মা নদীর পানি গোয়ালন্দ পয়েন্টে বিপৎসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে দেখা যায়। পাংশার সেনগ্রাম পয়েন্টে পানি ১০ সেন্টিমিটার কমলেও এখনো বিপৎসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আর বিপৎসীমার আট সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে মহেন্দ্রপুর পয়েন্টে পদ্মার পানি। পানি কমতে থাকায় গোদার বাজারের একটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের মৌকুড়ী ও কাঠুরিয়ার চরে গিয়ে দেখা যায়, ওই এলাকার শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি যাওয়া-আসা করছেন নৌকায় করে। একটু খাবার যোগান দিতে গবাদি পশুগুলোকে নৌকায় করে আশপাশের উঁচু ভূমিতে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির ফলে অনেকের বসতভিটা ও রান্নার চুলাও তলিয়ে গেছে। এতে চরম দুর্ভোগ ও অনাহার-অর্ধাহারে দিন পার করছেন সেখানকার মানুষ। সেইসঙ্গে রাত নামলেই সাপের উপদ্রব ও জলদস্যুদের নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে জনপদে। অনেকে রাত জেগে বাড়িঘর-মালামাল পাহারা দিচ্ছেন।

কাঠুরিয়া ও মৌকুড়ীর চরের জবেদা, মিনা বেগম, ছবদুল সরদারের মতো আরও অনেকে জাগো নিউজকে জানান, প্রায় এক মাস ধরে তারা পানিবন্দি আছেন। বাড়ির চারিদিকে পানি। ছোট ছোট শিশু বাচ্চা ও গরু-ছাগল নিয়ে তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। চুলার নিচে পানি ওঠায় রান্না করতেও সমস্যা হচ্ছে। কাজকর্ম না থাকায় উপার্জনও বন্ধ। এ অবস্থায় খুব কষ্টে দিন পার করেছেন তারা। রাতে সাপ ও ডাকাতের ভয় বাড়ছে। কিছুটা দুর্গম হওয়ায় চরাঞ্চলে কেউ যান না। নেই কোনো ত্রাণ সহায়তা। দূরের পথ হওয়ায় শহরেও যেতে পারছেন না অনেকে। পদ্মা পাড়ি দিয়ে রাজবাড়ী শহরে যেতে হয়, যে কারণে ঝড়-বৃষ্টিতে নদী উত্তাল থাকায় তারা শহরে যেতে পারেন না। চরের বাসিন্দা হওয়ায় সবসময় তারা সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে মিজানপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান জানান, তার ইউনিয়নের প্লাবিত নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের তিনি নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন। এ পর্যন্ত ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে কোনো ত্রাণ সহায়তা বরাদ্দ না পাওয়ায় তিনি নিম্নাঞ্চলে সহায়তা দিতে পারছেন না। তবে শিগগিরই সহায়তা আসবে বলে জানান তিনি।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাওহি মো. সায়েফ জাগো নিউজকে বলেন, ‘পানিবন্দি মানুষের তালিকা প্রস্তুত করে শুকনো খাবার ও ত্রাণ সহায়তা দেয়া শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নদী তীরবর্তী চর ও নিম্নাঞ্চলের সব পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হবে।’
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সৈয়দ আরিফুল হক জানান, প্রত্যেক উপজেলার যেসব এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে সেখানে এরই মধ্যে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছেছে। এছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণ মজুদ আছে। এখন পর্যন্ত জেলায় সাড়ে সাত হাজার পানিবন্দি পরিবারের তালিকা পাওয়া গেছে।
এমকেআর/এইচএ/এমএস