খাঁচায় বাস ছোট্ট শিখার

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি রাজবাড়ী
প্রকাশিত: ১১:৫০ এএম, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১

শিখা দাসের বয়স ১০ বছর। যে বয়সে দূরন্তপনা আর বইখাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সে খাঁচায় বন্দি থাকতে হচ্ছে তাকে। জন্মের পর থেকেই একলেমিশিয়া (খিচুনি) রোগে আক্রান্ত শিখা। নিজে কিছুই করতে পারে না। একটু ছুট পেলেই হামাগুড়ি দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটে চলে। অন্য বাচ্চাদের কামড়ে দেয়। তাই খাঁচায় বন্দি রাখেন বাবা।

শিখার পরিবার জানায়, জন্মের পর থেকে তার চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা খরচ করে তারা এখন নিঃস্ব। টাকার অভাবে ২ বছর ধরে শিখার কোনো ধরনের চিকিৎসা করাতে পারছেন না। এ অবস্থায় সরকারসহ সমাজের বৃত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করেছে পরিবারটি।

শিখা দাস রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মাঝবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব ফুল কাউন্নাই এলাকার মদন কুমার দাসের মেয়ে। মদন পেশায় একজন নরসুন্দর (নাপিত)। তার আরও দুটি সন্তান রয়েছে। সম্পদ বলতে তিনি নিজেই।

জানা যায়, জন্মের একবছর পর শিখার অস্বাভাবিকতা টের পায় পরিবারটি। এরপর থেকে চিকিৎসা শুরু করে। দেশে সব ধরনের চেষ্টার পর ভারতে নিয়ে কয়েক দফায় চিকিৎসা করায়। বাড়িতে থাকা অবস্থায় তার পায়ে রশি বেঁধে রাখা হত। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিখার অস্বাভাবিক আচরণ বাড়তে থাকায় প্রায় ৩ বছর বারান্দার এক পাশে নেট দিয়ে ঘেরা খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। নিজে কিছুই করতে পারে না সে। নিজের হাত নিজেই কামড়ায়। এখন চিকিৎসা বলতে প্রতিরাতে দুইটি করে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়। ওষুধ না খাওয়ালে সারারাত জেগে থাকে।

shikha-(3).jpg

সরকারি সহয়তা বলতে একটি প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড রয়েছে তার। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

স্বজন ও প্রতিবেশীরা বলেন, শিখা ১০ বছর ধরে অসুস্থ। ওর বাবা সেলুনে কাজ করে। রোজগারের সব টাকা শিখার পেছনে খরচ করে আজ নিঃস্ব। খুব কষ্ট করে সংসার চালায়। এখন টাকার অভাবে মেয়ের চিকিৎসা করাতে পারছেন না। মেয়েটা বাইরে এলে সবাইকে কামড়ায়, অস্বাভাবিক আচরণ করে। এ জন্য বাচ্চারা ভয় পায়। শিখার চিকিৎসায় সরকারসহ দেশের বৃত্তবানরা সহযোগিতা করলে হয়তো অন্য শিশুদের মতো হেসে খেলে বেড়াতে পারতো।

শিখার বাবা মদন কুমার দাস ও মা চন্দনা রানী দাস বলেন, মেয়েটা জন্মের পর থেকেই অসুস্থ। তখন থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের বড় বড় ডাক্তার দেখিয়েছেন। এখন আর পারছেন না। শিখার চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা খরচ করেছেন। সেলুনে কাজ করে মেয়ের চিকিৎসাসহ সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে এখন মেয়েকে খাঁচায় আটকে রেখেছেন।

shikha

তারা জানান, বাইরে বের হলে বাচ্চাদের মারে, কামড়ায়, থু থু দেয়। যে কারণে বাচ্চারা ওকে দেখলে ভয় পায়। সেসময় বাবা-মা হিসেবে তাদের খুব খারাপ লাগে। সব সময় মেয়েকে সময় দিতে না পেরে প্রায় ৩ বছর ধরে খাঁচায় আটকে রেখেছেন।

তারা আরও বলেন, ৯ বছর ধরে তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়াতে হয়। আগে একটি করে লাগলেও এখন দুটি করে ঘুমের ওষুধ খাওয়ান। ঘুমের ওষুধ না খাওয়ালে খিচুনি হয়। এখন টাকার অভাবে কোনো চিকিৎসাও করাতে পারছেন না। যদি দেশের হৃদয়বান ব্যক্তি ও সরকার তাদের মেয়ের চিকিৎসায় এগিয়ে আসত তাহলে শিখাকে ভালো করতে পারতেন।

রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম টিটোন বলেন, জন্মের পর সঠিকভাবে ব্রেন বেড়ে না ওঠায় মেয়েটি মানসিকভাবে অসুস্থ। এ রোগীর খুব বেশি চিকিৎসা নেই। ফলে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে ওষুধ খেলে কিছুটা ভালো থাকবে। সেজন্য নিয়মিত ওষুধ খাওয়াতে হবে। ওষুধ বন্ধ করলে মানসিক সমস্যা আরও বেড়ে যাবে।

রুবেলুর রহমান/এফএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]