আশা-নিরাশার দোলাচলে সেই সৌরশক্তিচালিত নৌযান
বাংলাদেশের প্রথম সৌরশক্তি চালিত নৌযান হচ্ছে ইকো মেরিন ক্রুজ-আয়রন। যার নির্মাতা বাংলাদেশের একজন নাবিক ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। যিনি অনেক স্বপ্ন নিয়ে এই নৌযানটি তৈরি করেছেন। তবে সে অনুযায়ী তেমন সাড়া পাচ্ছেন না তিনি। যে আশা নিয়ে এই নৌযান তৈরি করেছিলেন এখনও সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছেন না।
তবে এখনই আশাহত হচ্ছেন না নির্মাতা। তার বিশ্বাস একদিন স্বপ্ন পূরণ হবে। আশানুরূপ সাড়া না পেলেও একেবারে সাড়া পাচ্ছেন না ঠিক তা নয়। এভাবেই হয়তো একদিন নিজের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবেন। আশা-নিরাশার দোলাচলের মধ্যেই এই আয়রন এখন ভাসছে রাজধানী ঢাকার অদূরে রূপগঞ্জের কাঞ্চন ব্রিজ সংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীতে।

ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, যে ধরনের প্রমোট করার দরকার তা হচ্ছে না। চেষ্টা করছি, সরকারি দুয়েকটা সংস্থাও কাজ করছে। কিন্তু এরকম না একেবারে। যারা আগ্রহ দেখাচ্ছে তাদের ফান্ড নেই আবার যাদের ফান্ড আছে তাদের চিন্তাধারা ভিন্ন। সবমিলিয়ে চলছে কোনো রকম। দেখা যাক কতটুকু আগাতে পারি। চেষ্টা চলছে এটাকে প্রমোট করার। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রডো) নামে একটি সংস্থা চেষ্টা করছে কিছু করার জন্য। তবে তাদের আবার ফান্ড কম। তারা কয়েকটা বোট নামিয়েছিল কিন্তু বোটগুলো তেমন সফলতা দেখাতে পারিনি। ফলে তারা কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। তারা আরেক সংস্থা দিয়ে চেষ্টা করছে কিছু করা যায় কিনা। প্রাইভেট সেক্টরে চেষ্টা করছি কিছু একটা করার জন্য। কিন্তু প্রাইভেট সেক্টর আবার বড় ফান্ড নিয়ে আসতে চায় না। একেবারে সাড়া পাচ্ছি না তা নয় আবার একেবারে অনেক বেশি সাড়া পাচ্ছি তাও না। বাইরের কিছু সংস্থা চেষ্টা করছে।

হতাশার কারণ
ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, যে জায়গায় এটা রাখার দরকার যে জায়গায় এটা রাখা উচিত সেখানে এটা নেওয়া হয়নি। এটা হাওরের দিকে নিতে পারলে ভালো হয়। শীতলক্ষ্যা তো আসলে ট্যুরিজমের জায়গা নয়। তারপরেও এখানে চলছে এতেই খুশি। আবার শীতলক্ষ্যা থেকে সরিয়ে নিলে দেখার সুযোগটা কম থাকবে। পরবর্তী কোনো প্রজেক্ট পেলে তখন এটাকে সরিয়ে হাওরের দিকে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

বাজেটের অভাব
আল মাহমুদ বলেন, আরও দুইটা বোট তৈরি করার ব্যাপারে কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে। কিন্তু এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বড় ধরনের কোনো বাজেট পাওয়া যায়নি। বড় ধরনের বাজেট না হলে টেকসই হবে না। যার কারণে শুরু করতে পারছি না। ওইগুলো ভিন্ন ধরনের যাত্রীবাহী করতে চাচ্ছি। যেগুলোর গতি বেশি থাকবে এবং যাত্রী বহন করা যাবে।
ব্যবসা নয়, উৎসাহিত করাই মূল উদ্দেশ্য
নির্মাতা বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে কিছুটা সাড়া পাচ্ছি। আসলে শীতলক্ষ্যা তো টুরিজমের জন্য পারফেক্ট না। অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার অফার আসছে। কিন্তু এই মুহূর্তে এটা এখান সরিয়ে নিতে চাচ্ছি না। কারণ অন্য জায়গা নিয়ে গেলে মানুষের দেখার সুযোগ কম থাকবে। আসলে আমার ব্যবসা করার উদ্দেশ্য নেই। যদি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য থাকতো তাহলে হয়তো ভালো করা যেত। আমার টার্গেট সেটা না। আমার টার্গেট হচ্ছে বোট বিল্ডিং করা। এ ধরনের পরিবেশবান্ধব নৌযান জনপ্রিয় করে তোলা। এ ধরনের নৌযানের দিকে যেন মানুষের আগ্রহ বাড়ে। আর সেই জায়গায় আমি তেমন সাড়া পাচ্ছি না।

অনেকেই উৎসাহিত হচ্ছেন। তবে আমাদের দেশে একটা নতুন টেকনোলজি মানুষ সহজে গ্রহণ করে না। মানুষ যেটাতে অভ্যস্ত সেটাই গ্রহণ করে থাকে। সেইসঙ্গে আমাদের দেশে যারা বিনিয়োগ করে তাদের দক্ষতার অভাব রয়েছে। তারা অনেক সময় বুঝতে চায় না। তারপরেও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
আয়রন নির্মাণের গল্প
২০১৫ সালের কথা। টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে গিয়েছিলেন নাবিক ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। হাওরের অপার সৌন্দর্য উপভোগে বারবার বাধ সাধছিল ইঞ্জিনের শব্দ। অতিরিক্ত শব্দের জন্য অন্যদের সঙ্গে ঠিকঠাক কথাও বলতে পারছিলেন না তিনি। ডিজেলচালিত নৌযান, শব্দদূষণের কারণে জীববৈচিত্র্যের হুমকির বিষয়টিও নজরে আসে তার।

তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেন যেভাবেই হোক পরিবেশবান্ধব একটি নৌযান তৈরি করবেন। কিন্তু দেশে এরকম কোনো ডিজাইন পাচ্ছিলেন না। পরে ইন্টারনেটে বিদেশের বিভিন্ন নৌযানের ডিজাইন দেখেন। সে অনুযায়ী যোগাযোগ করেন ফরাসি নৌ-স্থপতি মাইকেল ও কনোরের সঙ্গে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তাদের কাছে একটি নৌযানের ডিজাইন চাইলেন। ডিজাইনও চলে এলো শিগগির। শুরু হলো চূড়ান্ত চিন্তা-ভাবনা এবং তৈরির কাজ।
এভাবে স্বপ্ন দেখতে দেখতে যেন অসাধ্য সাধন করে ফেলেন নাবিক ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। শুধু তার স্বপ্নের নৌযানই বানালেন না, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অ্যাওয়ার্ডও জিতলেন। পরিবেশবান্ধব ভ্রমণ সুবিধা সম্বলিত এটিই বাংলাদেশের প্রথম সৌরশক্তিচালিত নৌযান।

ইকো মেরিন ক্রুজ-আয়রনের সার্ভিস ম্যান জুলহাস মোল্লা বলেন, এরকম একটি পরিবেশবান্ধব নৌযানে কাজ করতে পেরে গর্ববোধ করছি। আমাদের এখানের যাত্রীরা সকলেই সুষ্ঠু মনমানসিকতা সম্পন্ন। আমাদের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করার জন্য এরকম নৌযান খুবই প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ড অর্জন
এরইমধ্যে ইকো মেরিন ক্রুজ-আয়রন জিতে নিয়েছে গুস্তাভ ট্রুভে অ্যাওয়ার্ড-২০২১। বৈদ্যুতিক নৌযান প্রতিযোগিতার একমাত্র আন্তর্জাতিক আসরের এই প্রতিযোগিতার কাস্টমাইজ ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ নৌযান হিসেবে বিজয়ী হয় আয়রন। অসংখ্য মানুষের ভোট এবং বোট অ্যাসোসিয়েশনের বিচারক প্যানেলের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে তাদের ঝুলিতে জমা হয় এই অর্জন।
এসএইচএস/জিকেএস