লিচুর ভান্ডারে এবার ফলন বিপর্যয়

উপজেলা প্রতিনিধি উপজেলা প্রতিনিধি ঈশ্বরদী (পাবনা)
প্রকাশিত: ১২:৫১ পিএম, ২৮ মে ২০২২

লিচুর ভান্ডার খ্যাত ঈশ্বরদীর লিচুচাষিরা ভেজাল কীটনাশক ও বৈরী আবহাওয়ায় এবার লোকসানের মুখে পড়েছেন। ফলন বিপর্যয়ে লিচু আকারে ছোট ও স্বাদও অন্যবারের তুলনায় কম হয়েছে। লিচুতে গুটি অবস্থাতেই পোকা আক্রমণ করেছে। পাকা লিচুতে পোকার উপদ্রব এবার চোখে পড়ার মতো। এর জন্য বিরূপ আবহাওয়া ও ভেজাল কীটনাশককেই দায়ী করছেন চাষিরা।

উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, ঈশ্বরদীতে ৩ হাজার ১শ হেক্টর জমিতে লিচু আবাদ হয়েছে। লিচু গাছের সংখ্যা সাড়ে তিন লাখের ওপর। শতকরা ৯০ ভাগ গাছেই এবার লিচুর ফলন হয়েছে। ফলন বেশি হলেও আকারে ছোট ও বিবর্ণ হওয়ায় চাষিরা কাঙ্ক্ষিত দাম থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

ঈশ্বরদীর লিচু গ্রাম হিসেবে পরিচিত সলিমপুর ইউনিয়নের জয়নগর, বড়ইচারা ও মিরকামারির দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি উপ-সহকারী কর্মকর্তা সাইফ উদ্দিন ইয়াহিয়া বলেন, লিচুর আকার ছোট ও পোকার উপদ্রব বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ বিরূপ আবহাওয়া। লিচুর গুটি যখন মটরশুটির মতো ছিল তখন প্রচণ্ড খরার কারণে গুটিতে কীটনাশক স্প্রে করতে পারেননি চাষিরা। সেসময় স্প্রে করলে খরার কারণে গুটি ঝরে যেত। পরবর্তীতে বৃষ্টির পর গুটিতে স্প্রে করলেও সেটা কোনো কাজে আসেনি। নির্দিষ্ট সময়ে পরিমাণ মতো কীটনাশক স্প্রে না করার কারণেই পোকা আক্রমণ করে। পাশাপাশি কিছু লিচু চাষি অনুমোদনহীন ভেজাল কীটনাশক পোকা নিধনের জন্য লিচুর গুটিতে স্প্রে করেন। যা কোনো কাজে আসেনি।

Lichu-(3).jpg

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম খান জানান, লিচুর আকার বড় না হওয়ার প্রধান কারণ বিরূপ আবহাওয়া। সময়মতো বৃষ্টিপাত হলে লিচুর ফলনের এমন বিপর্যয় হতো না। তাছাড়া কৃষকরা পরিমাণের তুলনায় কখনও বেশি আবার কখনো কম সার, কীটনাশক ব্যবহার করেছেন।

অনেকেই অনুমোদনহীন সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে লিচুর সর্বনাশ করেছেন। ভেজাল ক্ষতিকর সার, দস্তা ও কীটনাশক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযান চালিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও কৃষি বিভাগ। ২০ টন ভেজাল কীটনাশক, দস্তা ও সার জব্দ করা হয়েছে এবং বিক্রেতাদের জরিমানা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরো জানান, আটক সার ও কীটনাশক পরীক্ষার জন্য রাজশাহী মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত এসবের রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যায়, এগুলো নকল ও ভেজাল।

উপজেলা খুচরা সার ও কীটনাশক বিক্রেতা সমিতির সভাপতি শামসুল আলম বলেন, আমি নিজেও একজন লিচুচাষি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, বৃষ্টি না হওয়ায় লিচুর গুটিতে কীটনাশক স্প্রে করা সম্ভব হয়নি। প্রচণ্ড খরতাপে স্প্রে করলে তখন গুটি ঝরে যেত। সার ও কীটনাশক ভেজালের যে কথা বলা হচ্ছে, এটি আমিও শুনেছি। যারা প্রকৃত ব্যবসায়ী তারা কখনো ভেজাল সার ও কীটনাশক বিক্রি করবে না। যাদের সার-কীটনাশক জব্দ ও জরিমানা করা হয়েছে তারা মৌসুমী ও সুবিধাবাদী ব্যবসায়ী। এদের থেকে কৃষকদের সতর্ক থাকতে হবে। আমরা সার ব্যবসায়ীদের বারবার সতর্ক করেছি নকল ও ভেজাল পণ্য বিক্রি করা যাবে না। এরপরও কেউ যদি এ কাজে জড়িত থাকে প্রশাসন অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

উপজেলার মিরকামারী গ্রামের লিচুচাষি শাহমত মন্ডল বলেন, প্রতিটি গাছেই লিচু এসেছে, কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য ভেজাল সার ও কীটনাশকের কারণে লিচুর সর্বনাশ হয়ে গেছে। লিচুর মান অত্যন্ত খারাপ। সেজন্য দামও কম।

মিরকামারী হবুপাড়ার লিচুচাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, যে পোকা সাধারণ কোম্পানির কীটনাশক দিলেই মরে যেত, এবার নামিদামি কোম্পানির কীটনাশকেও সেটি কাজ করেনি। এবার শতকরা ৫০ ভাগ লিচু পোকায় আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।

Lichu-(3).jpg

মানিকনগর গ্রামে লিচুর বাগান কিনেছিলেন গোপালগঞ্জের মকসেদপুর উপজেলার ব্যবসায়ী মিনাল শেখ। তিনি বলেন, ৮ লাখ টাকা দিয়ে বাগান কিনেছি। লিচুর আকার এতো ছোট হয়েছে যা বিক্রি করে এক লাখ টাকা তোলায় কষ্টকর হবে। লিচুর এমন আকারের জন্য তিনি সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ীদের দুষছেন।

জাতীয় বঙ্গবন্ধু কৃষি পদকপ্রাপ্ত লিচুচাষি আব্দুল জলিল ওরফে লিচু কিতাব বলেন, মৌসুমের শুরুতেই ভালো ফলন দেখে কৃষি কর্মকর্তা ও বাগান মালিকরা আশা করেছিল এবার লিচুর ফলন অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। ঈশ্বরদীর উৎপাদিত লিচু ৫০০ কোটি টাকায় বিক্রি হবে। কিন্তু লিচুর আকার ছোট হওয়ায় সেটি হয়তো এবার সম্ভব হবে না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিতা সরকার জানান, বৈরী আবহাওয়া ও কীটনাশকের অকার্যকারিতার কারণে এবার ঈশ্বরদীতে লিচুর ফলন তুলনামূলক খারাপ হয়েছে। এতে চাষি ও বাগান মালিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আগামীতে যেন ফলন বিপর্যয় না হয় সেজন্য চাষিদের সঙ্গে আলোচনা করে করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

এফএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]