পূরণ হয়নি চলন্ত সিঁড়ির দাবি
ঈশ্বরদী রেলওয়ে ফুটওভার ব্রিজ উদ্বোধন হচ্ছে বৃহস্পতিবার
ঈশ্বরদী জংশন স্টেশনে ৩ কোটি ১৭ লাখ ব্যয়ে নবনির্মিত ফুটওভার ব্রিজের উদ্বোধন বৃহস্পতিবার (২৩ ফেব্রুয়ারি)। পাকশী রেলওয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) শাহ সূফি নূর মোহাম্মদ ফুটওভার ব্রিজ উদ্বোধনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তিনি বলেন, ফুটওভার ব্রিজ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন রেলমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন।
ব্রিটিশ আমলে নির্মিত পাবনার ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশনের ফুটওভার ব্রিজের বয়স ১০০ বছর। ১৯২৩ সালে রেলওয়ে যাত্রীদের স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে যাতায়াত এবং শহরের পূর্ব ও পশ্চিম এলাকার মানুষদের চলাচলের জন্য ফুটওভার ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়। শতবর্ষী এই ফুটওভার ব্রিজের পাটাতন ও সিঁড়ির ধাপ বেশ কয়েকবার ভেঙে গেছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তা পুনরায় মেরামত করেছে। শতবর্ষী ফুটওভার ব্রিজটি মানুষের চলাচলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় পুরাতন ব্রিজের পাশেই আরেকটি নতুন ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে এ ব্রিজ নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ছয় মাসের মধ্যেই নির্মাণ কাজ শেষ করার কথা থাকলেও প্রায় দুই বছর সময় লেগেছে ব্রিজটি নির্মাণে।

সরেজমিন দেখা গেছে, রেলমন্ত্রীর আগমন ও ফুটওভার ব্রিজ উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে স্টেশন এলাকাজুড়ে। স্টেশনের দেওয়ালে রং ও ধোয়া-মোছার কাজের পাশাপাশি নতুন ফুটওভার ব্রিজ সাজসজ্জার কাজ চলছে। নতুন ব্রিজের পাশেই পুরাতন ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে মানুষ চলাচল করছে। প্রতিদিন এই ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে স্কুল-কলেজের শতশত শিক্ষার্থীসহ কয়েক হাজার মানুষ চলাচল করেন। তবে নতুন ফুটওভার ব্রিজটিতে আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া নেই।
ঈশ্বরদীবাসীর দাবি ছিল, নতুন ফুটওভার ব্রিজে চলন্ত সিঁড়ি সংযুক্ত করা। যাতে অসুস্থ ও বৃদ্ধরা ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে চলাচল করতে পারেন। নতুন ওভারব্রিজের নির্মাণ কাজ শুরুর পর ২০২১ সালের ১৬ জুন ঈশ্বরদীবাসীর ব্যানারে স্টেশনে চত্বরে সমাবেশ ও মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে বক্তারা চলন্ত সিঁড়িসহ নানন্দিক ওভারব্রিজ নির্মাণের দাবি জানান। কিন্তু নির্মাণাধীন ব্রিজে চলন্ত সিঁড়ি স্থাপনের কোনো ব্যবস্থা নেই।

পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে সেতু প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে জংশন স্টেশনের পুরাতন ফুটওভার ব্রিজের পাশেই নতুন আরেকটি ফুটওভার ব্রিজের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ৪৪০ ফুট দৈর্ঘ্য, ১০ ফুট চওড়া ও ২১ ফুট উঁচু ফুটওভার ব্রিজটির নির্মাণ কাজ করছে চট্টগ্রামের মায়ার লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ব্রিজটি নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি আসাদুর রহমান বিরু বলেন, রেল কর্তৃপক্ষ বরাবরই ঈশ্বরদীর জংশন স্টেশনের উন্নয়নের বিষয়ে উদাসীন। দেশের সর্ববৃহৎ রেল জংশনটি আজও পর্যন্ত রিমডেলিং হয়নি। জংশন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কোনো ফ্যান নেই। যাত্রীরা অভিযোগ দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। প্লাটফর্মে খাবার পানি ফিল্টারিং মেশিন বসানোর কয়েকদিন পরেই তা নষ্ট হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, তৎকালীন রেলসচিব সেলিম রেজার কাছে ফুটওভার ব্রিজে চলন্ত সিঁড়ির দাবি জানানো হয়েছিল। তিনি কথা দিয়েছিলেন চলন্ত সিঁড়িসহ একটি আধুনিক ফুটওভার ব্রিজ হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় ব্রিটিশ আমলের নির্মিত পুরাতন ব্রিজের মতোই আরেকটি ব্রিজ এখানে নির্মাণ করা হলো।

আসাদুর রহমান বিরু আরও বলেন, নতুন ব্রিজ পুরাতন ব্রিজের চেয়ে প্রায় চার ফুট উঁচু। রোগী ও বয়স্কদের কথা না ভেবে আরও চার ফুট উঁচু করে নতুন ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দূরদর্শিতার অভাবে আধুনিক ও চলন্ত সিঁড়ি সংযুক্ত ফুটওভার ব্রিজ থেকে ঈশ্বরদীবাসী বঞ্চিত হলো।
ঈশ্বরদীর বাঁশেরবাদা ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক আতাউল হক নান্নু জাগো নিউজকে বলেন, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম এই ওভারব্রিজ। রোগী, বৃদ্ধ ও শিশুদের চলাচলের জন্য ঈশ্বরদীবাসীর একটি আধুনিক ওভারব্রিজের দাবিকে অগ্রাহ্য করে বর্তমান পুরাতন ওভার ব্রিজের আদলে এখানে আরেকটি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। নতুন ওভারব্রিজটি আগেরটার চেয়ে আরও পাঁচ ফুট উঁচু করা হচ্ছে। এ ব্রিজে ওঠানামা করা বয়স্ক ও রোগীদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, ঈশ্বরদীবাসী মানববন্ধন ও সমাবেশের মাধ্যমে চলন্ত সিঁড়িসহ নানন্দিক ফুটওভার ব্রিজের যে দাবি জানিয়েছিল, সে দাবি উপেক্ষিত হলো। তবে এখনো চলন্ত সিঁড়ি সংযুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়টি বিবেচনায় আনবে আশা করছি।

প্রবীণ সাংবাদিক ও মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব শহিদুল হক ববি সরদার জাগো নিউজকে বলেন, নতুন ফুটওভার ব্রিজটি পুরাতন ব্রিজের চেয়েও নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ব্রিজ নির্মাণ বন্ধ এবং চলন্ত সিঁড়ি সংযোগ করে আধুনিক ব্রিজ নির্মাণের জন্য মানববন্ধন, সমাবেশ ও পাকশী বিভাগীয় কার্যালয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। তখন রেল কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেছিল আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন ব্রিজ নির্মাণ করা হবে। কিন্তু রেলের কর্মকর্তারা কথা রাখেননি। তারা নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ব্রিটিশ আমলের আদলে ওভার ব্রিজটির নির্মাণ কাজ শেষ করেছে।
পাকশী বিভাগীয় সেতু প্রকৗশলী আব্দুর রহিম জাগো নিউজকে বলেন, ওভারব্রিজ উদ্বোধনের পর যাত্রী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
ওভারব্রিজে চলন্ত সিঁড়ি সংযুক্তকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই এবং কোনো নির্দেশনাও নেই।
এমআরআর/জিকেএস