ভয়াল ২৯ এপ্রিল আজ
৩২ বছর পরও হারানো স্বজনদের স্মৃতি হাতড়ান ফরিদ
বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়ংকর দিন ২৯ এপ্রিল। ১৯৯১ সালের এই দিনে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চল একেবারে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল। স্বাধীনতা উত্তরকালে এতবড় ঝড়-জলোচ্ছ্বাস আর ক্ষয়ক্ষতি বাংলাদেশের মানুষ দেখেনি। উপকূলবাসীকে এখনো সেই ঝড়-জলোচ্ছ্বাস দুঃস্বপ্নের মতো তাড়িয়ে বেড়ায়।
ওই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে বাবা-মা ও ভাই-বোনকে হারান কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার (সাবেক সদর উপজেলা) উত্তর গোমাতলীর বাসিন্দা ফরিদুল আলম (৩৯)। তিনি বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুবাদে কক্সবাজার পৌরসভায় বসবাস করেন।
শুক্রবার (২৮ এপ্রিল) রাতে কক্সবাজার রিপোর্টার্স ইউনিটি কার্যালয়ে বসে সেইদিনে স্বজন হারানোর স্মৃতি বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ওই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে দুই থেকে ছয় বছর বয়সী দুই ভাই, দুই বোন, বাবা-মাসহ স্বজন ও ঘর বাড়ি হারিয়েছিলেন তিনি। শুধু তিনিই নন, উপকূলের শতশত মানুষ তার মতো আপনজন হারিয়ে এখনো স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সেই হারানোর বেদনা তাদের কখনো পিছু ছাড়ে না।
এইদিনে ভারাক্রান্ত মনে উপকূলবাসী তাদের হারানো স্বজনদের স্মরণ করেন। কেউ মিলাদ পড়িয়ে, দরিদ্র মানুষদের মাঝে খাবার বিতরণ করে কিংবা বিলাপে সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা চালান বলে উল্লেখ করেন ফরিদ।
তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের ২০ এপ্রিল, মামাত ভাইয়ের সঙ্গে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে নানাবাড়ি বেড়াতে যাই। আবছা মনে পড়ে, মা আমায় গুছিয়ে দিয়েছিলেন। বাবা ব্যবসার কারণে গোমাতলীতে থাকায় তাকে বলে যেতে পারিনি। নানাবাড়ি যাওয়ার পাঁচ-ছয়দিন পর শুরু হয় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। এ বৃষ্টির সূত্র ধরেই বাংলাদেশের উপকূলে ২৯ এপ্রিল রাতে আঘাত হানে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়। পরেরদিন মা ও ছোট ভাই-বোনদের জন্য মন কাঁদায় ফিরে আসি ঈদগড়ের বাসায়। পৌঁছে দেখি ঘরে কেউ নেই। খবর পাই, আমি নানাবাড়ি যাওয়ার পর বাবা এসে মা ও অন্যদের গোমাতলীতে চিংড়ি ঘের করতে নিয়ে গেছেন। তারা অবস্থান নিয়েছিলেন মহেশখালী নদীর গোমাতলী তীরের জলিল সিকদারের ঘেরপাড়ের বাসায়। জলোচ্ছ্বাসের স্রোত ঘরসহ সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এলাকায় বেঁচে যাওয়া স্বজনরা সবাই মিলে খোঁজ করেও তাদের মরদেহ পায়নি।
ফরিদ বলেন, এনালগ যুগ, তার ওপর খেটে খাওয়া পরিবার হওয়ায় কোনো ছবি তোলা ছিল না। তাই ধীরে ধীরে বাবা-মা ও নিখোঁজ ভাই-বোনের অবয়ব ভুলে গেছি। ৩২ বছরে এলাকায় অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু বাবা-মা, ভাই-বোনের স্মৃতি আমাকে পিছু ছাড়ে না কখনো। ২৯ এপ্রিল এলে তাদের কথা বেশি মনে পড়ে।
স্বজনদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ফরিদ বলেন, বাবা শামশুল আলম রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন মেম্বার ছিলেন। তবে, সেখানে তিনি থাকতেন কম। গ্রীষ্মে লবণ ও বর্ষায় চিংড়ি চাষে আয় ভালো হওয়ায় কক্সবাজার সদরের পোকখালীর গোমাতলী বাবার নানাবাড়ি এলাকায় থাকতেন তিনি। গোমাতলী মোহাজের উপনিবেশ ভূমিহীন সমিতির নামে লিজ নেওয়া জমিতে অন্যদের মতো চাষাবাদ করতেন তিনি। মা নুর জাহান বেগম আমাদের নিয়ে ঈদগড়-গোমাতলী আসা-যাওয়ায় থাকতেন। ১৯৯১ সালে আমার বয়স ৮-৯ বছর হবে। আমার ছোট দুই ভাই-দুই বোন ছিল মনে আছে। তাদের নাম-চেহারা কিছুই মনে নেই।
তিনি বলেন, স্বজনদের কাছ থেকে শুনি- আমি দুষ্টু প্রকৃতির ছিলাম। স্কুল ফাঁকি দিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতাম। ঘূর্ণিঝড়ের আগে সুযোগ পেয়ে নানাবাড়ি বেড়াতে চলে যাই। সেখানে গিয়ে ফিরে এসে যে মা-বাবা, ছোট ভাই-বোনদের আর দেখতে পাবো না ঘুনাক্ষরে জানলেও তাদের ছেড়ে যেতাম না। আমার বড় ভাই জিয়াউর রহমান বাবা-মায়ের সঙ্গে না থেকে পাড়ার এক দোকানে অবস্থান করায় ভেসে যাওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। বাবা-মাকেও নাকি বেড়িবাঁধের ঘর থেকে চলে আসতে বলেছিলেন স্বজনরা। মৃত্যুর পয়গাম আসায় তারা হয়তো পাড়ায় ফেরেনি।

‘এতিম হিসেবে বায়তুশ শরফে থাকার সুযোগ পেয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছি। এখন বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানের হয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখেই কাটছে দিন। ব্যস্ততায় সময় কাটে, কিন্তু ৩২ বছর আগের সেই স্মৃতি আমায় ছাড়ে না। বাবা-মা, ভাই-বোন কারও অবয়ব মনে নেই, কিন্তু তাদের শূন্যতা বুকে চিনচিন ব্যথার জন্ম দেয়। তবে, আজকের জন্য প্রতীক্ষা নয়, প্রতিদিন প্রতিবেলা নামাজে আমার বাবা-মা, ভাই-বোন ও সেদিন হারানো স্বজন, উপকূলবাসীর জন্য ইছালে সওয়াব পাঠানো হয়।’
ফরিদ আরও বলেন, ৩২ বছরে এলাকার যাতায়াত-যোগাযোগ অবস্থার উন্নয়ন হয়েছে অনেক। এলাকায় উঠেছে বহুতল সাইক্লোন শেল্টার সেন্টার। এখন ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত পড়লে গভীর রাতেও নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া যায়। ১৯৯১ সালে যেটি ছিল দুরূহ। তবে, আভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ভালো হলেও গোমাতলীর চারপাশের বেড়িবাঁধ ১৯৯১ সালের মতোই নাজুক, জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করে চলে আসছে। এখনো অমানিশা-পূর্ণিমার জোয়ার কিংবা কোনো দুর্যোগে সাগরে পানি বাড়লে এলাকা এলাকায় বেড়িবাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে ঢোকার খবর প্রচার হয়।
১৯৯১ সালের এই দিনে স্মরণকালের সেই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের দ্বীপাঞ্চলসহ উপকূলীয় এলাকা তছনছ করে এক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করেছিল। রাতের অন্ধকারে কয়েক ঘণ্টায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল উপকূলীয় এলাকা। দেশের মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে সেইদিন প্রত্যক্ষ করেছিল প্রকৃতির করুণ এই রুদ্ধরোষ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এতবড় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি উপকুলের মানুষ আগে কখনো হয়নি। তাই ২৯ এপ্রিল এলে স্বজনহারা মানুষের কান্নায় এখনো ভারী হয় উপকূলের আকাশ-বাতাস। সেই জলোচ্ছ্বাসের কবলে স্বজন হারানোর বেদনা আজও অশ্রু ভারাক্রান্ত করে তোলে।
তথ্যানুসন্ধান মতে, ১৫৬১ সালের জলোচ্ছ্বাসে উপকূলের বিপুল মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া ১৭৬২ সালে, ১৭৯৫ সালের ৩ জুন, ১৮৯৭ সালের ২৪ অক্টোবর, ১৯০৫ সালের ২৯ এপ্রিল, ১৯৬৩ সালের ২৭ মে, ১৯৭২ সালের অক্টোবরে, ১৯৬৫ এবং ১৯৯৭ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জ্বলোচ্ছ্বাসে কুতুবদিয়া দ্বীপসহ উপকূলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সর্বশেষ ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াবহ জ্বলোচ্ছ্বাসে কুতুবদিয়ায় খুদিয়ারটেক নামে একটি এলাকা বিলীন হয়ে গেছে।
১৯৯১ এর ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপকূলে স্থাপিত হয় পাঁচ শতাধিক ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র। যার মধ্যে অনেকগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে মহেশখালী, পেকুয়া, সদর উপজেলা এলাকা এবং টেকনাফের বেশ কয়েকটি বেড়িবাঁধ বিলীন হয়েছিল। ওই ভাঙা বাঁধ এখনো পরিপূর্ণ মেরামত হয়নি। ফলে উপকূলের লাখো মানুষ এখনো ঝুঁকি নিয়ে বাস করছেন। তাই সংকেত দেখা দিলেই নিরাপদে ছুটতে হয় তাদের। উপকূলবাসীর দাবি, পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কার করে যেন টেকসই করা হয়।
সায়ীদ আলমগীর/এমআরআর/জিকেএস