নির্বাচনি ব্যয়ে স্বল্পমেয়াদে চাঙা ভোগ অর্থনীতি
আর মাত্র তিন দিন পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। রাজধানীর পাঁচতারকা হোটেল থেকে শুরু করে অলিগলির চায়ের দোকান—সব জায়গায় এখন একটাই আলোচনা, নির্বাচন।
স্কুলপড়ুয়া কিশোর থেকে শুরু করে, দিনমজুর, গৃহিণী কিংবা চাকরিজীবী—সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের মুখে নির্বাচনি আলাপ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে দেশের সর্বত্র রাজনৈতিক আলোচনা যেমন তীব্র হচ্ছে, তেমনি নির্বাচনি ব্যয়কে কেন্দ্র করে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে দেখা যাচ্ছে কিছুটা বাড়তি গতি।
চা-দোকান থেকে শুরু করে হাটবাজার, গণপরিবহন ও ছোট ব্যবসায়—সবখানেই নির্বাচনি কর্মকাণ্ডের প্রভাব স্পষ্ট। তবে এ গতির স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয়। অন্যদিকে, অর্থনীতির এ সাময়িক গতির ফলে নতুন কোনো কর্মসৃজন হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল থেকে দুই হাজার প্রার্থী ২৯৯ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে ২৪৮ জন স্বতন্ত্র। এই আসনগুলোতে ১২.৭৩ কোটি ভোটার তাদের ভোট অধিকার প্রয়োগ করবেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬.৪৬ কোটি, নারী ভোটার ৬.২৬ কোটি এবং হিজড়া ভোটার ১,১১৩ জন। শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুজ্জামানের আকস্মিক মৃত্যুতে ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। এই আসনটিতে নির্বাচনের জন্য পুনরায় তফসিল ঘোষণা করা হবে।
ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে প্রচার, যাতায়াত, সভা-সমাবেশ, আপ্যায়ন ও নানা আনুষ্ঠানিক আয়োজনের পেছনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছেন প্রার্থী ও তাদের লোকজন। অর্থনীতিবিদরা একে ‘নির্বাচনি অর্থনীতি’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন, যা স্বল্পমেয়াদে বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়।
আরও পড়ুন
ব্যবসার ভালো পরিবেশের প্রতিশ্রুতি চান ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা
প্রচারণায় বাধা-হামলা জনমনে বাড়াবে আতঙ্ক, ভোটদানে পড়বে ভাটা
নির্বাচনি প্রচারণায় বাসের ব্যবহার কীভাবে শুরু হলো?
বিএনপি ছেড়ে জামায়াতে যোগদানের নেপথ্যে কী?
অর্থনীতিবিদরা বলেন, নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক ব্যয় এক ধরনের সাময়িক প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে। এই অর্থ খুব দ্রুত গ্রাম ও শহরের ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবাখাতে ছড়িয়ে পড়ে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থী এবং সরকারের ব্যয়ের কারণে সাময়িকভাবে অর্থনীতিতে কিছু ‘গরম’ লক্ষ্য করা যায়। তবে এই প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে নয়, মূলত নির্দিষ্ট কিছু খাতে—যেমন চা দোকান, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, বেভারেজ ও খাদ্যপণ্য—দৃশ্যমান। এটি মূলত একটি পুনর্বণ্টন, যেখানে প্রার্থীরা ভোট পাওয়ার আশায় নিম্ন আয়ের মানুষ এবং ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অর্থ সরবরাহ করছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু এর সঙ্গে উৎপাদন বা কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সমতা নেই। মূল্য বৃদ্ধি বেশি, উৎপাদন বৃদ্ধি সীমিত। অর্থাৎ সাময়িকভাবে কিছু ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে, তবে এটি জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলার মতো নয়।’
ড. হোসেন বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই সময়ে সাময়িকভাবে কিছু আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে, যা সামাজিকভাবে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর রিয়াজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যয়ের কারণে কনজাম্পশন কিছুটা বাড়বে, বিশেষ করে বেভারেজ, চা, বিস্কিট, কেক এবং ট্রান্সপোর্ট খাতে। তবে ইনফ্লেশনের প্রভাবে দেশের সামগ্রিক কনজাম্পশন ইকোনমি পুরোপুরি সক্রিয় হবে না। মূলত নির্বাচনের সময় এই খাতগুলোতে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব সীমিত।’
তিনি বলেন, ‘আমার মতে, নির্বাচনকেন্দ্রিক সময়কালে মূলত ট্রান্সপোর্ট, ডেকোরেশন ও বেভারেজ বা ফুড খাতের ব্যবহার বাড়ে। তার বাইরে কনজাম্পশন ইকোনমি বেশি সক্রিয় হয় না।’
আরও পড়ুন
প্রতিশ্রুতি নয়, স্বচ্ছ নীতি ও বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ চান ব্যবসায়ীরা
৫০ গজের মধ্যে ৫ প্রার্থীর নির্বাচনি অফিস, সহনশীলতার ‘অনন্য দৃষ্টান্ত’
নাগরিক বঞ্চনার অবসান চান ভোটাররা, আশা দেখাচ্ছেন প্রার্থীরা
সর্বাধিক প্রার্থীর আসনে আগ্রহ বেশি তিন ‘সাইফুলে’
একজন প্রার্থী কত টাকা ব্যয় করতে পারবেন
বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোটার প্রতি ব্যয় ১০ টাকা হলেও ২৫ লাখ টাকার বেশি কেউ ব্যয় করতে পারত না। এবার সে নিয়ম রাখা হয়নি। এবারের নির্বাচনে একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা কিংবা ভোটার প্রতি ১০ টাকা ব্যয় ধরে যেটি বেশি হবে, সে টাকা তারা ব্যয় করতে পারবেন।

ছোট আসন বা কম ভোটার রয়েছে এমন কোনো আসনের জন্যও ন্যূনতম ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ের অনুমতি রয়েছে ইসির। ভোটারের সংখ্যা বেশি হলে ভোটার প্রতি খরচ ১০ টাকা করে বাড়বে। উদাহরণস্বরূপ, সাত লাখ ৫০ হাজার ভোটারের আসনে সর্বোচ্চ ব্যয় হতে পারে ৭৫ লাখ টাকা।
যদি একজন প্রার্থী সর্বনিম্ন ২৫ লাখ টাকা খরচ করেন, তাহলে দুই হাজার প্রার্থীর মোট খরচ দাঁড়াবে ৫০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, একজন প্রার্থী যদি গড়ে ৫০ লাখ টাকা খরচ করেন, তাহলে মোট খরচ হতে পারে এক হাজার কোটি টাকা। তবে বাস্তব চিত্র অনুমানের চেয়ে ভিন্ন। কারণ অনেক প্রার্থী, তাদের দল ও লোকজন সর্বোচ্চ সীমার চেয়ে অনেকগুণ বেশি ব্যয় করে থাকেন। আবার বড় কিছু দল ছাড়া অনেক প্রার্থী সামর্থ্য না থাকায় সর্বোচ্চ সীমার টাকাও খরচ করতে পারেন না।
প্রচার ব্যয়ে চাঙা বিভিন্ন খাত
নির্বাচনি প্রচারণা ঘিরে সবচেয়ে বেশি সুফল পাচ্ছে মুদ্রণ, প্রচার ও পরিবহন খাত। হ্যান্ডবিল, লিফলেট, ব্যানার ও ফেস্টুন ছাপানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে ছোট ও মাঝারি প্রিন্টিং প্রেসগুলো। মাইক, সাউন্ড বক্স ভাড়া দেওয়া ব্যবসায়ীরাও চরম ব্যস্ত।

‘প্রচারণা শুরুর পর থেকে গত কয়েক সপ্তাহে আমাদের কাজ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা অতীতের নির্বাচনে ছিল না’, বলে জানান রাজধানীর ফকিরাপুলের ডিজিটাল ব্যানার ও প্রিন্টিং ব্যবসায়ী মাহবুব হোসেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রচারণাই এখন মূল আয়ের উৎস।
পরিবহন খাতেও দেখা যাচ্ছে বাড়তি চাহিদা। সভা-সমাবেশ ও ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এতে জ্বালানি বিক্রিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
আরও পড়ুন
আওয়ামী লীগের দুর্গ গোপালগঞ্জ, ভোট নিয়ে কী ভাবছেন ভোটাররা?
গ্যাস-পানির সংকট থাকা বাড্ডাবাসী চান ‘ত্রাণকর্তা’
১১ প্রার্থীর ৯ জনই ‘মাঠে নেই’, দুই প্রার্থীর দিকে তাকিয়ে এলাকাবাসী
সুপরিকল্পিত পুরান ঢাকা গড়তে ‘সাহসী সিদ্ধান্ত’ চান ভোটাররা
মিরপুরের পিকআপ গাড়ির মালিক ও চালক আল আমিন বলেন, ‘সাধারণ সময়ে প্রতিদিন ধারাবাহিক কাজ করার সুযোগ খুব বেশি থাকে না। কিন্তু নির্বাচনি প্রচারণার কাজে ১৫ দিন ধরে প্রতিদিন কাজ করছি এবং এটি নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত চলবে।’
‘নির্বাচনি প্রচারণার জন্য নিয়মিত আয় করার সুযোগ পাচ্ছি এবং স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ভালো অর্থও পাচ্ছি। নির্বাচন চলাকালীন এই ধরনের কাজের সুযোগ সাধারণ সময়ের চেয়ে বেশি আয় নিশ্চিত করে’, বলে জানান তিনি।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চায়ের দোকান, রেস্টুরেন্টে বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। এটি স্বল্পমেয়াদে ব্যবসায় একটি বড় উত্থান নিয়ে আসে।

‘নির্বাচনের সময় মানুষ চায়ের দোকানে কিংবা রেস্টুরেন্টে বেশি সময় কাটাচ্ছে, একে অপরের সঙ্গে রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করছে। ফলে আমাদের চা, কফি, বিস্কুট এবং নাশতার বিক্রি অনেক বেড়েছে’, বলেন বাড্ডার সাতারকুল এলাকার চায়ের দোকানদার মজিবর রহমান।
তিনি বলেন, ‘গত দুই সপ্তাহে বিক্রি হঠাৎ বেড়েছে এবং এখন ব্যবসা অনেক ভালো। মহল্লার চায়ের দোকানগুলোতে একসঙ্গে বসে চা-নাশতা উপভোগ করে, যা এক ধরনের উৎসব মনে হয়। আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এটা একটা দারুণ সুযোগ। এলাকায় সভা হলে আমাদের বিক্রি দ্বিগুণ হয়ে যায়।’
‘দেশজুড়ে নির্বাচনি আমেজ বিরাজ করায় বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। তবু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বিস্কুট ও এ ধরনের অনুরূপ পণ্যের বিক্রি কিছুটা বেড়েছে’ বলে জানান দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল।
আরও পড়ুন
গোপালগঞ্জে ‘কারাগার বনাম মাঠ’ ত্রিমুখী লড়াই
টাঙ্গাইল-৭ আসনে ভোটের আমেজ কম, কেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে শঙ্কা
বিএনপির রাজ্যে হাসনাতের পথ আটকাতে মাঠে ট্রাক
নির্বাচনে ঋণ খেলাপিদের অংশগ্রহণ, দায় কার?
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচন শেষে এবং শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তর হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম সঠিক ধারায় ফিরে আসবে।
তবে অর্থনীতিবিদরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের সময়ে হঠাৎ ব্যয় বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে।
হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধির কারণে কিছু এলাকায় দ্রব্যমূল্য বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে প্রচারণা-নির্ভর খাতগুলো, যখন উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী খাতে এর প্রভাব সীমিত, বলে জানান ড. জাহিদ হোসেন।
অবৈধ প্রচার ব্যয় ও ভোট কেনাবেচার অভিযোগ অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্যও ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ব্যয় বর্তমানে দেশের ভোক্তা অর্থনীতিতে সাময়িক গতি সঞ্চার করছে। তবে এই গতি ক্ষণস্থায়ী। টেকসই অর্থনৈতিক সুফলের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং ব্যবসায় আস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা—যা নির্বাচনের ফলাফল ও তার গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
আইএইচও/এমএমএআর