দেরিতে নাকি তাড়াতাড়ি বিয়ে করা, কোনটি সবচেয়ে ভালো?
সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলেছে, বদলেছে বিয়ে নিয়ে ভাবনাও। অনেকেই মনে করেন ক্যারিয়ার গুছিয়ে, ৩০শের পর স্থির হয়ে বিয়ে করাই ভালো। আবার কেউ বিশ্বাস করেন কলেজ প্রেম, তরুণ বয়সের সাহস আর একসঙ্গে বড় হয়ে ওঠার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সুখের চাবিকাঠি।
বিয়ের জন্য আদর্শ বয়স কোনটি-আসলে কি কোনো নির্দিষ্ট সময় আছে, নাকি বিষয়টা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত প্রস্তুতি আর জীবনের লক্ষ্য নির্ভর? আসুন জেনে নেওয়া যাক-

২০-এর কোটায় বিয়ের ফলে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা যায়
তরুণ বয়সের প্রেমে এক ধরনের উচ্ছ্বাস থাকে। ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সে বিয়ে করলে অনেক সময় দাম্পত্যে সন্তুষ্টি বেশি দেখা যায়। ব্রিগহ্যাম ইয়াং ইউনিভার্সিটির উইটলি ইনস্টিটিউটের ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এ বয়সে বিয়ে করা দম্পতিদের মধ্যে বৈবাহিক সন্তুষ্টির হার ছিল প্রায় ৮১ শতাংশ, যেখানে দেরিতে বিয়ে করা দম্পতিদের ক্ষেত্রে তা ছিল ৭১ শতাংশ। যৌন সন্তুষ্টির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা ৬৩ শতাংশ বনাম ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ এই বয়সে বিয়ে করা দম্পতিদের মধ্যে দাম্পত্য ও যৌন তৃপ্তির হার তুলনামূলক বেশি।
তবে বাস্তবতার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কম বয়সে অনেক দম্পতিই মানসিক পরিপক্বতার অভাব, আর্থিক চাপ কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তানের দায়িত্বে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারেন। এসব চাপ সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু যারা সব বাধা পেরিয়ে টিকে যান, তারা সাধারণত একসঙ্গে বেড়ে ওঠেন, গভীর বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং একে অপরের শক্তিশালী সহযোদ্ধা হয়ে ওঠেন।
তাই কম বয়সে বিয়ে সবচেয়ে বেশি উপযোগী তাদের জন্য যারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে প্রস্তুত, পারিবারিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং দ্রুত পরিবার গড়ার পরিকল্পনা রাখেন। তবে ঝুঁকিও আছে , যদি ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে বিসর্জন দিতে হয়, তাহলে ব্যক্তিগত বিকাশ থমকে যেতে পারে।

তিরিশের পর বিয়ে করার ফলে স্থিতি ও সামঞ্জস্য আসে
দেরিতে বিয়ের পক্ষে যুক্তিটা বেশ শক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারির দীর্ঘমেয়াদি তথ্যভিত্তিক এক বিশ্লেষণে যেখানে ১ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী ছিলেন দেখা গেছে, প্রথম বিয়ের সাফল্য সবচেয়ে বেশি ২৫-৩৪ বছরের মধ্যে। ২৫ বছরের পর বিয়ে করলে বিচ্ছেদের ঝুঁকি প্রায় ২৪ শতাংশ কম।
এই বয়সে মানুষ সাধারণত বেশি পরিণত হন। মতবিরোধ সামলানোর দক্ষতা বাড়ে, জীবনের মূল্যবোধ স্পষ্ট হয়, আর্থিক নিরাপত্তা গড়ে ওঠে। বিশেষ করে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত নারীরা সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে বেশি আত্মবিশ্বাসী থাকেন। নিজস্ব আয় ও আত্মপরিচয়ের স্পষ্টতা দাম্পত্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে।
তবে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও আছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গী নির্বাচনে খুঁতখুঁতে ভাব, ডেটিংয়ের সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে। অতীত সম্পর্কের অভিজ্ঞতা বা অভ্যাস থেকে তৈরি মানসিক বোঝা কখনো বিরক্তি বা দূরত্ব তৈরি করতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে সন্তান ধারণের সময়সীমা নিয়েও উদ্বেগ থাকে।
দেরিতে বিয়ে তাদের জন্য বেশি উপযোগী, যারা ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক, বিচ্ছেদের পর নতুনভাবে ভালোবাসাকে সুযোগ দিতে চান, অথবা জীবনের একটা সময় একা ঘুরে-ফিরে নিজেকে গড়ে তুলতে চান।
অনেক গবেষকের মতে, মাঝামাঝি সময়টিই সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ। নরভাল গ্লেনের ২০১০ সালের গবেষণা ‘লেটার ফার্স্ট ম্যারেজ অ্যান্ড মেরিটাল সাকসেসদেখা যায়, ২২-২৫ বছরের মধ্যে বিয়ে করা ব্যক্তিদের মধ্যেই সর্বোচ্চ মানের স্থিতিশীল দাম্পত্যের সম্ভাবনা বেশি।

নারীদের ক্ষেত্রে কম বয়সে বিয়ে করলে তারা পরিবার গঠনে বেশি মনোযোগ দিতে পারেন, কারণ জৈবিক দিক থেকে সে সময়টা তুলনামূলক অনুকূল। আর যারা দেরিতে বিয়ে করেন, তারা সাধারণত ক্যারিয়ারে বেশি স্বাধীনতা পান এবং সঙ্গী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও আরও সচেতন ও বাছাইপরায়ণ হতে পারেন। পাশাপাশি ২৫ বছরের পর বিয়ে করলে বিচ্ছেদের ঝুঁকিও তুলনামূলক কমে আসে।
অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, দেরিতে বিয়ে করলে তাদের আয় সাধারণত বেশি থাকে-বিশেষ করে ৩০-এর পর আর্থিক স্থিতি বাড়তে থাকে। তবে যারা কম বয়সে বিয়ে করেন, তাদের জন্য শুরুটা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তারা দ্রুত দাম্পত্য অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার সুযোগ পান।
তাই বলা চলে বিয়ের ‘পারফেক্ট’ সময় সেই ব্যক্তির জন্যই সঠিক, যিনি মানসিকভাবে প্রস্তুত। সুখী দম্পতিরা ঘড়ির কাঁটা দেখে নয়, চরিত্র ও লক্ষ্য মিললে বিয়ে করেন। ২২-এ তাড়াহুড়া করে বিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, আবার ৩৮-এ অতিরিক্ত খুঁতখুঁতে হতে গিয়ে একাকিত্বও আসতে পারে। তাই চাপের কাছে নয়, জীবনের লক্ষ্য ও মূল্যবোধে মিল আছে, এমন সঙ্গীকেই বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, মিডিয়াম
আরও পড়ুন:
প্রাক্তনের সঙ্গে ফের সম্পর্ক, নতুন প্রজন্মের ট্রেন্ড
যে কারণে মানুষ সম্পর্কে জড়ায়
এসএকেওয়াই/