জ্বালানি খাতের আরেক বিপিসি!

ইকবাল হোসেন
ইকবাল হোসেন ইকবাল হোসেন , নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০২:৩৭ পিএম, ০৫ মে ২০২৬
বিপিসির লিয়াজোঁ অফিস ভবনেই ডা. এজাজের অফিস/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

সরকারিভাবে পেট্রোলিয়াম জ্বালানি আমদানি ঘিরে গড়ে উঠেছে এক শক্ত সিন্ডিকেট। কমবেশি ৮০ শতাংশ জ্বালানি তেল আমদানি হয় ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। জ্বালানি পরিবহনের প্রিমিয়াম নিয়ে ২০০৯ সালের পর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনে (বিপিসি) শক্ত খুঁটি গেঁড়েছে সিন্ডিকেটটি।

এ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন এজাজুর রহমান নামে এক চিকিৎসক। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করার পাশাপাশি দাপ্তরিক কার্যক্রম, লোকবল ও সরবরাহ চেইনসহ সামগ্রিকভাবে ওই সিন্ডিকেটটি জ্বালানি খাতে নিজেদের দাঁড় করিয়েছে ‘আরেক বিপিসি’ হিসেবে। জাগো নিউজের অনুসন্ধানে উঠে আসা এ সিন্ডিকেট কারসাজির আদ্যোপান্ত নিয়ে নিজস্ব প্রতিবেদক ইকবাল হোসেনের তিন পর্বের ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্ব

দেশের পরিশোধিত জ্বালানির কমবেশি ৮০ শতাংশ সরবরাহ দেয় ডা. এজাজুর রহমান নিয়ন্ত্রিত ছয় প্রতিষ্ঠান। জ্বালানি খাতের ‘আরেক বিপিসি’ মনে করা হয় ডা. এজাজকে। বিপিসির অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা অবসরে যাওয়ার পর যোগ দেন ডা. এজাজের প্রতিষ্ঠানগুলোতে।

জাগো নিউজের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এ তথ্য। ঢাকায় কারওয়ান বাজার বিটিএমসি ভবনের ১০ তলায় রয়েছে বিপিসির লিয়াজোঁ অফিস। একই ভবনের ৮ তলায় ডা. এজাজের ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ ও ৭ মার্ক-এর কার্যালয়। পাশাপাশি বিপিসি, বিপিসির অংশীদার ও মালিকানা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপক হিসেবে অবসরে যাওয়া বেশ কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা বর্তমানে কর্মরত ডা. এজাজের দুই প্রতিষ্ঠানে। যে কারণে বিপিসিতে অবসর ঘনিয়ে আসা অনেক কর্মকর্তার সহানুভূতি পায় তার প্রতিষ্ঠানগুলো।

এর মধ্যে ডা. এজাজের দুই প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের মধ্যে আছেন ইস্টার্ন রিফাইনারির দুই সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ আফজাল, এ এইচ এম সামশুদ্দোহা, যমুনা অয়েলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলীম উদ্দিন, যমুনা অয়েলের সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কুদরত-এ ইলাহি, যমুনা অয়েলের সাবেক অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক নাহিদুর রহমান, ইস্টার্ন রিফাইনারি ও বিপিসির অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক রাশেদ কাওসার, বিপিসির সাবেক পরিচালক (পরিকল্পনা ও অপারেশন্স) শরাফ উদ্দিন আহমেদ, বিপিসির সাবেক পরিচালক (পরিকল্পনা ও অপারেশন্স) সৈয়দ মোজাম্মেল হক, সাবেক মহাব্যবস্থাপক আর এম জাহাঙ্গীর।

ডা. এজাজ আমাদের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের কায়েমি স্বার্থ রক্ষা করে চলেছেন। বিষয়টি আওয়ামী লীগ আমলে অত্যন্ত গভীর শিকড় লাভ করেছে। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, সেটি আমরা দেখার অপেক্ষায় থাকবো।-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক ড. মইনুল ইসলাম

আর এম জাহাঙ্গীর বিপিসিতে অপারেশন্স, বিপণন-বণ্টন এবং দুই মেয়াদে সচিবের দায়িত্বও পালন করেছেন। ডা. এজাজের প্রতিষ্ঠানে কাজ করাদের মধ্যে আরএম জাহাঙ্গীর এবং সৈয়দ মোজাম্মেল হক সবচেয়ে পুরোনো। তারা বিভিন্ন সময়ে ডা. এজাজের হয়ে বিপিসিতে নানা কাজের তদবির করেন।

আরও পড়ুন

বিশ্ববাজারে চাপ কমাতে তেল উৎপাদন বাড়াচ্ছে সৌদি-রাশিয়াসহ ৭ দেশ
বাড়লো সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম, মধ্যরাত থেকে কার্যকর
তেলের মজুত ‘স্বাভাবিক’, পাম্পে ‘নেই’
দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে ‘শঙ্কা’, বিকল্প উৎসের সন্ধান

বিপিসির সাবেক বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সবাই এক বাক্যে বলেন, ‘বিপিসিতে ডা. এজাজের আজকের শক্ত অবস্থান তৈরির পেছনে আর এম জাহাঙ্গীর ও সৈয়দ মোজাম্মেল হকের অবদানই বেশি। পাশাপাশি বিগত সময়ে সরকারের প্রভাবশালী বলয়ের সঙ্গে সখ্যের সুযোগে গড়ে ওঠে এ সিন্ডিকেট।’

১৮ এপ্রিল সকালে কথা হলে বিপিসির সাবেক পরিচালক সৈয়দ মোজাম্মেল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘ট্রান্সবাংলার সঙ্গে এখন আমি ওইরকমভাবে নেই।’ ট্রান্সবাংলা কমোডিটিসের আগ্রাবাদ অফিসে বসার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি আগ্রাবাদে অফিস করি, তবে কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত নই। আমি অবসরে আছি, আমি অফিসে শুধু যাই আর আসি। আমার কাছে কোনো তথ্য পাবেন না।’

বিপিসিতে যে সিন্ডিকেট রয়েছে, সেটি একটি প্যারালাল বিপিসি। দেশের মধ্যেই পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট আকারে তৈরি হয়েছে। ওই সিন্ডিকেটের কাছে বিপিসি ও মন্ত্রণালয় অনেকটা আজ্ঞাবহ। যাদের কাছে জ্বালানি তেল সরবরাহ মজুতের বিষয়ে প্রায় নির্ভর করতে হয়।-ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার মনজারে খোরশেদ আলম

বিপিসি ও ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক রাশেদ কাওসার। তিনি বর্তমানে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিসের পরিচালক। কথা হলে জাগো নিউজকে বলেন, ‘ট্রান্সবাংলা সেভেন মার্কের সিস্টার কনসার্ন। আমি অপারেশনের বিষয়টি এখন দেখি না। আমি ওই প্রতিষ্ঠানের অন্য সাইট দেখি। আমি যেগুলো দেখতাম সেগুলো এখন এলাহি সাহেব দেখেন।’ তবে এ বিষয়ে মোস্তফা কুদরত-এ ইলাহি’র বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বিপিসির পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ দেয় এমন আরেকটি প্রতিষ্ঠানের কান্ট্রি হেড নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিপিসির সাপ্লাই চেন পুরো একজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেটি হলো ডা. এজাজ। আমার ধারণা বিপিসির বড় বড় কর্মকর্তা তার (ডা. এজাজ) সঙ্গে সম্পৃক্ত। এজাজ সাহেব হলেন বিপিসির ডিফেক্টো চেয়ারম্যান।’

আরএম জাহাঙ্গীর সাহেব আমার এখানে আছেন প্রায় ১৮ বছর। আমার সব সময় অগ্রাধিকার থাকে মার্কেটের সেরা মানুষগুলো নেওয়ার। ওনারা সারাজীবন বিপিসিতে কাজ করেছেন। ওনাদের চেয়ে ভালো অপারেশন কেউ জানেন না। আমি ওই জায়গা থেকে সিনিয়র লেভেলের লোকদের নিই। জুনিয়র লেভেলে নিই নতুনদের। পুরোনোরা নতুনদের প্রশিক্ষিত করেন।-ডা. এজাজুর রহমান

বিপিসিতে জ্বালানি সরবরাহে সিন্ডিকেটের বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক ড. মইনুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডা. এজাজ আমাদের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের কায়েমি স্বার্থ রক্ষা করে চলেছেন। বিষয়টি আওয়ামী লীগ আমলে অত্যন্ত গভীর শিকড় লাভ করেছে। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, সেটি আমরা দেখার অপেক্ষায় থাকবো।’

আরও পড়ুন

এক মাসে শুধু ডিজেলে বিপিসির ‘গচ্চা’ ১০১ কোটি টাকা
মে মাসে জ্বালানি তেলে থাকছে স্বস্তি
অকটেনে ‘ভাসছে’ বিপিসি, তবু পাম্পে হাহাকার

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (ইআইবি) চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার মনজারে খোরশেদ আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিপিসিতে যে সিন্ডিকেট রয়েছে, সেটি একটি প্যারালাল বিপিসি। দেশের মধ্যেই পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট আকারে তৈরি হয়েছে। ওই সিন্ডিকেটের কাছে বিপিসি ও মন্ত্রণালয় অনেকটা আজ্ঞাবহ। যাদের কাছে জ্বালানি তেল সরবরাহ মজুতের বিষয়ে প্রায় নির্ভর করতে হয়। সিন্ডিকেটটি অনেকটা বিপিসির প্যারালাল সংগঠনে পরিণত হয়েছে।’

বিপিসিতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যে অনিয়ম তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘদিনের। চাইলেই হঠাৎ করে তা দূর করা সম্ভব নয়। সেজন্য আমরা বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ করেছি। জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে সামনের দিনগুলোতে বিপিসিতে কোনো সিন্ডিকেট থাকবে না। আগামী দুই মাসের মধ্যেই বিষয়গুলো দৃশ্যমান হবে।-জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. সাইফুল ইসলামে

এ বিষয়ে কথা হলে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ ও ৭ মার্ক পিটিই লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এজাজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আরএম জাহাঙ্গীর সাহেব আমার এখানে আছেন প্রায় ১৮ বছর। আমার সব সময় অগ্রাধিকার থাকে মার্কেটের সেরা মানুষগুলোকে নেওয়ার। ওনারা সারাজীবন বিপিসিতে কাজ করেছেন। ওনাদের চেয়ে ভালো অপারেশন কেউ জানেন না। আমি ওই জায়গা থেকে সিনিয়র লেভেলের লোকদের নিই। জুনিয়র লেভেলে নিই নতুনদের। পুরোনোরা নতুনদের প্রশিক্ষিত করেন।’

তিনি বলেন, ‘একজন লোক অবসরের পরেও ৫-৭ বছর কর্মক্ষম থাকেন। ওই সময়ে কাউকে যদি একটু সহযোগিতা করা যায়, সেজন্য আমি গর্ববোধ করি। আমাদের নতুন ছেলেরা ডায়নামিক। তারা সিনিয়রদের কাছ থেকে শিখছে। নতুনরা অনেক ডেভেলপ করেছে। প্রফেশনাল লোকজনের সঙ্গে থাকলে নতুনরা উন্নতি করে।’

১৭ এপ্রিল ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিদর্শনকালে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. সাইফুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। বিপিসিতে জ্বালানি তেল সরবরাহে সিন্ডিকেট বিশেষ করে ডা. এজাজুর রহমানের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিপিসিতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যে অনিয়ম তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘদিনের। চাইলেই হঠাৎ করে তা দূর করা সম্ভব নয়। সেজন্য আমরা বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ করেছি। জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে সামনের দিনগুলোতে বিপিসিতে কোনো সিন্ডিকেট থাকবে না। আগামী দুই মাসের মধ্যেই বিষয়গুলো দৃশ্যমান হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটি স্ক্রু যদি ২০টি প্যাঁচ দিয়ে কাঠামোর গভীরে যায়, বের করতেও সেই ২০টি প্যাঁচ ঘুরিয়ে বের করতে হয়।’

তৃতীয় পর্বে থাকবে: জ্বালানি তেল সরবরাহে মানা হয় না নিয়ম-নীতি

এমডিআইএইচ/এএসএ/এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।