হঠাৎ ডিমের দাম বৃদ্ধি, সংকট নাকি সিন্ডিকেট?

নাজমুল হুসাইন
নাজমুল হুসাইন নাজমুল হুসাইন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:২৮ এএম, ২০ মে ২০২৬
এক মাসে ডজনে ডিমের বেড়েছে ৫০ টাকা, ভোগান্তিতে ভোক্তা, ফাইল ছবি

• ডিমের দাম বাড়ার চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার
• খামারিতে সংকট নেই, অবিক্রীত ডিম
• আগেও মিলেছে মূল্য কারসাজির তথ্য
• সিন্ডিকেট ও মজুতের অভিযোগ
• এক মাসে ডজনে ডিমের বেড়েছে ৫০ টাকা

বাংলাদেশে প্রাণিজ আমিষের অন্যতম সস্তা উৎস হিসেবে পরিচিত ডিম। তবে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে বাজারে ডিমের যে দাম দেখা যাচ্ছে, তাতে এটি আর সীমিত আয়ের মানুষের জন্য ‘সাশ্রয়ী আমিষের উৎস’ হিসেবে থাকছে না। অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামের চাপের মধ্যে নিম্ন, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো যখন ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক তখন ডিমের দাম যেন ‘আগুনে ঘি ঢেলেছে’।

ঢাকার বাজারে বর্তমানে বড় দোকানগুলোতে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। আবার কিছু এলাকার দোকানে এ দাম ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। অথচ মাত্র এক মাস আগে এক ডজন ডিমের দাম ছিল ১১০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ মাসের ব্যবধানে ডজনপ্রতি ডিমের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ টাকা।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে চাহিদা বাড়ার কারণে ডিমের দাম কিছুটা বাড়ে। তবে এবার অল্প সময়ের মধ্যে দাম বৃদ্ধির হার তুলনামূলক অনেক বেশি এবং অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি এর আগেও দেখা গেছে। ২০২২ সালেও ডিমের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। সে সময় দাম বাড়ার কারণ অনুসন্ধানে মাঠে নামে সরকার। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি) ছাড়াও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক দল বাজার তদারকিতে অংশ নেয়।

ওই সময় দেখা যায়, ডিম উৎপাদনকারী বড় ফার্মগুলো কমিশন এজেন্টের মাধ্যমে দাম কারসাজি ও নিলাম প্রক্রিয়ায় নিজেদের নিয়োগ করা এজেন্ট ব্যবহার করে ডিমের দাম বাড়িয়েছে। ডিএনসিআরপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এদিকে, এবারও এমন পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার। ডিমের দাম বাড়ছে কেন এমন প্রশ্নে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, করপোরেট কোম্পানি ও তাদের নিযুক্ত ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে ডিমের দাম বাড়িয়েছে। এ সিন্ডিকেট তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশ করেছে।

ডিমের ক্রয়মূল্য যাই হোক না কেন, ডিম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সমিতিগুলো মোবাইল ফোনে দাম নির্ধারণে করে বাজার অস্থিতিশীল করে তুলছে। গত মাসে দাম কম থাকায় প্রচুর ডিম মজুত করেছে তারা। এখন দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে মুনাফা করছে তারা।— বিপিএ সভাপতি সুমন হাওলাদার

বিপিএ সভাপতি বলেন, ডিমের ক্রয়মূল্য যাই হোক না কেন, ডিম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সমিতিগুলো মোবাইল ফোনে মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীল করে তুলছে। তারা গত মাসে দাম কম থাকার সময় প্রচুর ডিম মজুত করেছে। এখন দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে মুনাফা করছে।

সুমন হাওলাদারের দাবি, বর্ষা ও সবজির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরপরই এ সময়কে ‘সঠিক সময়’ হিসেবে বেছে নিয়েছে সিন্ডিকেট। এ বর্ধিত দামের কোনো সুবিধা প্রান্তিক খামারিরা পাচ্ছেন না।

আরও পড়ুন
বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ-কর অব্যাহতি চান পোল্ট্রি খাতের প্রান্তিক খামারিরা
চাঁদপুরে মিড-ডে মিলে পচা ডিম
মাংসের দাম এখনো চড়া, ছুটি শেষ হলেও জমেনি বাজার

ডিম কি আসলে অবৈধ মজুত হয়েছে? এমন প্রশ্নে সুমন হাওলাদার দাবি করেন, এখন প্রচুর ডিম মজুত হচ্ছে। তখন প্রশ্ন আসে এ গরমে ডিম কি আসলে মজুত করা সম্ভব?

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এখন একটি ডিম স্বাভাবিকভাবে ১০-১৫ দিন ভালো থাকে। হিমাগারে আরও বেশি সময়। তবে যারা মজুত করেন, তারা শুরুতে আগের মজুত করা পুরোনো ডিম বিক্রি করেন। এরপর নতুন ডিম মজুত রাখেন। এভাবে পালাবদলের মাধ্যমে ডিমের মজুত সম্ভব।

২০২৪ সালেও ডিমের দাম বেড়েছিল মে মাসে। ওই সময় বাজারে প্রতি ডজন ডিমের দাম আবার ১৫০ টাকায় ওঠে। সে সময়ও ডিম হিমাগারে মজুত করে বাজার অস্থিতিশীল করার অভিযোগও ছিল বড় বড় কোম্পানি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে।

সে সময় ডিএনসিআরপি মাঠে নামে। তিন দিনে কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদীর দুটি হিমাগারে প্রায় অর্ধকোটি ডিমের মজুত মেলে। হিমাগারে রাখা এসব দুই মাস পালাবদলের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হচ্ছিল। কারণ, বছরের ন্যায় ওই সময়ও আগের মাসে বাজারে ডিমের চাহিদা পড়ে গিয়েছিল, দামও ছিল কম।

তখন কোম্পানিগুলো খামারিদের কাছ থেকে কম দামে কেনা ডিম মধ্যস্বত্বভোগীরা হিমাগারে রেখে বাড়তি দামে বিক্রি করেছেন।গরমের কারণে ডিম উৎপাদন হ্রাস ও চাহিদা বৃদ্ধিকে পুঁজি করে বাজারে অস্থিরতা তৈরির করছেন একশ্রেণির মুনাফালোভী।

কয়েকজন ব্যবসায়ী বলছেন, এবারও সংকটকে পুঁজি করে হিমাগারে রাখা লাখ লাখ ডিম বাড়তি দামে বাজারে ছাড়া হচ্ছে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।

ব্যবসায়ীরা বলছে সংকট, খামারি বলছে ডিম নিচ্ছে না

মঙ্গলবার (১৯ মে) জাগো নিউজের কথা হয় তেজগাঁও আড়তের কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তারা গতানুগতিকভাবে বলেন, ডিমের সংকট, তাই দাম বাড়ছে।

ঠিক একই দিনে মোবাইল ফোনে কথা হয় টাঙ্গাইলের কয়েকজন খামারির সঙ্গে। যেখানে দেশের সর্বোচ্চ পরিমাণে ডিম উৎপাদন হয়।

আরও পড়ুন
মুরগির বাজারে অস্থিরতা, খামারিদের ছয় দফা দাবি
মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৫০ টাকা, ডিমের ডজন দেড়শ ছাড়ালো
সবজির চড়া দাম শুনে ডিম কিনতে গেলাম, সেখানেও আগুন

হালিহাতীর নূরুল আমিন নামের খামারি বলেন, মেসেজের মাধ্যমে তেজগাঁও আড়ত থেকে ১০ টাকা ৮০ পয়সা দাম দিয়েছিল। কিন্তু ডিম ১০ টাকা ৩০ পয়সাও কেউ কেনেনি। ব্যবসায়ীরা ডিম নিচ্ছে না। আমার খামারে ডিম অবিক্রীত রয়েছে।

জাগো নিউজের সঙ্গে চারজন খামারির সঙ্গে কথা হয়। এরমধ্যে আবু হোসেন নামের আরও একজন বলেন, তার ডিম নেননি আড়তদাররা। আর যে দুজন বিক্রি করেছেন তারা দাম পেয়েছেন ১০ টাকা ৩০ পয়সা প্রতিটি।

অর্থাৎ একই দিনে যেখানে ঢাকার ব্যবসায়ীরা ডিমের সংকটের কথা বলছেন সেখানে প্রান্তিক খামারে ডিম অবিক্রীত থাকার তথ্য মিলেছে। এবং প্রান্তিক খামারিদের দাবি, খরচ কিছুটা বাড়লেও ডিমের কোনো সংকট নেই। প্রান্তিক এলাকায় মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।

কষ্টে আছে মানুষ, নেই তদারকি

ডিমের দাম বাড়ায় কষ্টে আছেন নিম্ন, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার। সেগুনবাগিচা এলাকায় মর্জিনা খাতুন নামের এক গৃহকর্মী বলেন, বাচ্চাদের মাংস-মাছ খাওয়াতে পারি না। ঝোল ভাত খেতে চাইলে আগে ডিম সিদ্ধ করে আলু-ডিমের ঝোল করে দিতাম। সেটা না হলেও একটা ডিম ভাড়া দিলে ভাত খেত। দাম বেড়ে যাওয়া এখন সেই ডিমও কিনতে পারছি না।

ডিমের দাম বৃদ্ধি ও সরকারের নজরদারির অভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ডিমের দামের কারণে গরিব মানুষের খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সরকার সে বিষয়টি নিয়ে কিছুই করছে না। ভোক্তা অধিকার কিংবা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো বাজার তদারকি বা কার্যক্রম চোখে পড়েনি।

ডিমের দাম বাড়ায় গরিব মানুষের খুব কষ্ট হচ্ছে। সরকার কিছুই করছে না। ভোক্তা অধিকার কিংবা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো বাজার তদারকি বা কার্যক্রম চোখে পড়েনি।— ক্যাব সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান

তবে এসব বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা অধিদপ্তরের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

ডিমের চাহিদা ও উৎপাদন

দেশে ক্রমাগত ডিমের উৎপাদন বাড়ছে। সবশেষ গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) দুই হাজার ৪৪০ কোটি পিসেরও বেশি ডিম উৎপাদন হয়েছে দেশে। দশ বছর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল এক হাজার ১৯১ কোটি পিস। বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ কোটি পিস ডিম উৎপাদন হচ্ছে।

বাংলাদেশ এগ প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. তাহির আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, দেশের জাতীয় চাহিদা মেটাতে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ কোটি ডিম প্রয়োজন হয়। এই ডিমগুলোর একটি বড় অংশ সারাদেশের খামার থেকে আসে।

যদিও উৎপাদনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডিমের চাহিদা বাড়ছে। এখন বহু ধরনের খাদ্যপণ্যে ডিমের ব্যবহার বেড়েছে। যে কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে ডিমের বাজার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকায়।

দেশে কাজী ফার্মস, ডায়মন্ড এগ, প্যারাগন পোল্ট্রি, নর্থ এগ, সিপি বাংলাদেশ, আফিল অ্যাগ্রো, পিপলস পোল্ট্রি, নবিল অ্যাগ্রো, ভিআইপি শাহাদত, রানা পোল্ট্রি, ওয়েস্টার পোল্ট্রিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা বাণিজ্যিকভাবে ডিম উৎপাদনের শীর্ষে। এর মধ্যে কিছু কোম্পানি রয়েছে যাদের দৈনিক ডিম উৎপাদন ১৫ লাখ পিসের কাছাকাছি। অনেকগুলো কোম্পানি প্রতিদিন প্রায় ৪-৫ লাখ পিস ডিম উৎপাদন করছে। বাকি জোগান আসে সারাদেশের প্রান্তিক খামার থেকে।

এনএইচ/এমএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।