`পাঁচ বছরের কোর্স কবে শেষ হবে জানি না’

জসীম উদ্দীন
জসীম উদ্দীন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৫০ পিএম, ২১ ডিসেম্বর ২০১৭ | আপডেট: ০২:০৫ পিএম, ২১ ডিসেম্বর ২০১৭
ফাইল ছবি

‘লজ্জায় মাথা কাটা যায়, কোথাও কথা বলার মুখ নেই আমার। কি করব? পড়াশুনা তো কম করিনি। তবুও আমি কখনও লিখিত পরীক্ষায় ফেল, কখনও বা মৌখিক পরীক্ষায়। ফেল করলেই অতিরিক্ত টাকা জরিমানা দিতে হচ্ছে। ৫ বছরের কোর্স আমার শেষ হবে কবে জানি না’! এসবের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষকেই দায়ী করছেন জিহান।

২০১০ সালে ডাক্তার হবার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হন রাজধানীর ভাটারা থানাধীন পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজে। কিন্তু মেধাবী এ ছাত্র ফেলের বৃত্ত থেকে নিজেকে বের করতে পারেননি। এজন্য নিজের চেষ্টার কমতি নেই, তবুও ফেল। প্রথম ও তৃতীয় বর্ষ মিলে তিনবার ফেল করা এ ছাত্র বলেন, প্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তি হবার পর আমি বুঝতে পারি ফাঁদে পড়েছি। শুধু আমি নই আমার মতো শতাধিক শিক্ষার্থী জরিমানার ফাঁদে।

অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এ ডেন্টাল কলেজটির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। তাদের মধ্যে অনেকেই পুনরায় জরিমানার ফাঁদে পড়ার আশঙ্কায় ফেল করার ভয়ে মুখ খুলছেন না। তবে মুখ খুলেছেন জিহান। পুরো নাম ইশফাক আহমেদ (জিহান)। বাবা স্বাস্থ্য বিভাগের বড় কর্মকর্তা। পরিবার ও নিজের ডাক্তার হবার স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও ভর্তি হন পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজে।
জিহান বলেন, আমি মেধায় ভর্তি হয়েছি। কিন্তু ফেল করার কারণে আমার সঙ্গে নিজের বোন মা বাবা কেউ কথা বলেন না। পরীক্ষা ভালো দিচ্ছি। তবুও কোনো কোনো বিষয়ে কিংবা মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করছি। জিহান বলেন, প্রথম ফেল করে মনে হয়েছিল নিজের কারণে ফেল করেছি। দ্বিতীয় বার ফেল করায় কষ্ট পাই। খোঁজ নিয়ে দেখি আমার মতো অনেকেই ফেল। নিজে নিজে খোঁজ নিই। বুঝতে পারি আমাকেসহ অনেককে অ্যাসেসমেন্ট (মূল্যায়ন) পরীক্ষায় ফেলের ফাঁদে ফেলে ৪০ থেকে ৭০ হাজার করে টাকা নেয়া হচ্ছে। নইলে কাউকে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেয়া হচ্ছে না। যারা টাকা দেয় শুধু তারাই চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে।

joshim

জিহানের অভিযোগ, প্রথম বার আমি তিন বিষয়ে ফেল করি। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় পাস করি। পরের বার লিখিত পরীক্ষায় পাস করলেও আমাকে ফেল মার্কস দেয়া হয় মৌখিক পরীক্ষায়। প্রথমবার মৌখিক পরীক্ষায় পাস করেও কেন পরের বার আমাকে মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করানো হল উত্তর পাইনি। একইভাবে তৃতীয় বর্ষে আমি ২ বার ফেল করেছি। এর উত্তর আসলে একটাই জরিমানার ফাঁদ। অতিরিক্ত টাকা আদায়।

জিহান বলেন, আমি নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার ছেলে নই। পড়াশুনার পাশাপাশি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে কাজ করি। কখনও ফেল করিনি কোনো কাজে। যে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও ডাক্তার হতে ঢাকায় আসি সেই আমি বার বার ফেল করছি। পরিবারের কাছে টাকা আর চাইতে ইচ্ছে করে না। জিহানের অভিযোগ, ফেলের ফাঁদে পড়ে আমার ৫ বছরের কোর্স ৭ বছর পেরিয়েছে। এখনও তৃতীয় বর্ষে। আমার ছোট ভাই আগামী বছর অনার্স পাস করবে। কিন্তু আমি পাস করতে পারছি না। এর চেয়ে আর কি কষ্ট থাকে। সর্বসাকুল্যে ১২ লাখ টাকায় আমার ডেন্টাল কোর্স শেষ হবার কথা। কিন্তু ফেলের ফাঁদে জরিমানা, এনরলমেন্ট ফি, নতুন করে টিউশন ফি দিতে দিতে আমি ক্লান্ত। ৭ বছরে আমার ২৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। জানি না আরও ২ বছর পার করতে কি দশা হবে?

গত মঙ্গলবার দুপুরে বিনিশা শাহ নামে পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজের ২২তম ব্যাচের ৩য় বর্ষের এক নেপালী ছাত্রী হোস্টেলের নিজ কক্ষে আত্মহত্যা করেন। মঙ্গলবার তার টার্ম-২ পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষা শেষ হওয়ার আধাঘণ্টা আগেই খাতা জমা দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে যান এবং হোস্টেল কক্ষে গিয়ে আত্মহত্যা করেন। জিহান বলেন, বিনিশার উপর আমার মতোই চাপ ছিল, যে কারণে মেয়েটা আত্মহত্যা করছে বলে আমার মনে হচ্ছে। ওর কাছেও টাকা দাবি, জরিমানা আদায় করা হয়েছে। ওর পরিবারের তো অত কিছু বোঝার কথা নয়।

‘আমি পারিনি। অনেকটার চেষ্টা করেছি আত্মহত্যা করব। এ অকৃতকার্য জীবন নিয়ে কোথায় যাব। কিন্তু বোন ভাই, মা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে দম নিয়েছি। চেষ্টা করছি। রাত দিন পড়ছি। জানি না কি হবে।’ অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়ে আসে ডাক্তার হবার স্বপ্নে। সর্বস্ব খুইয়ে যাচ্ছে ডাক্তার হবার স্বপ্নে বিভোর হয়ে। ক’জন ক’জনার খবর রাখে। আমার মতো অনেকের দশা।

jos

আমরা আন্দোলনে নেমেছি। বিনিশা আমাদের সকলের চোখ খুলে দিয়েছে। এবার আমাদের দশ দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন চলবে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজের পরিচালক মণ্ডলীর সদস্য খন্দকার মো. শফিকুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ এসেছে। আমরা কখনও প্রমাণ পাইনি। তবে এবার বিনিশা নামে এক ছাত্রীর মৃত্যুর পর ফের অভিযোগ উঠেছে। আমরা বিষয়গুলো আমলে নিয়ে তদন্ত করব। কোনো শিক্ষার্থী যেন ক্ষতির শিকার না হয় সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।

অপর ডিরেক্টর রকিবুল হোসেন রুমি পদে পদে জরিমানার ফাঁদ পাতার অভিযোগ অস্বীকার করেন বলেন, ‘প্রতি বছর লিখিত কিংবা মৌখিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য করার নামে এখানে অতিরিক্ত টাকা নেয়া হয় না। অকৃতকার্যরা এমন অভিযোগ করেই থাকে।

জেইউ/ওআর/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :