আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল স্মরণে কনকচাঁপার আবেগঘন পোস্ট
আজ (১ জানুয়ারি) দেশের বরেণ্য গীতিকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের জন্মদিন। দিনটি উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা। সেখানে তিনি স্মরণ করেছেন এই সব্যসাচী সংগীতজ্ঞের বর্ণাঢ্য জীবন, কর্ম ও ব্যক্তিত্ব। কনকচাঁপা এই কিংবদন্তিতুল্য সংগীতজ্ঞের অনেক গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। যার অধিকাংশই তুমুল শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছেভ।
স্ট্যাটাসে কনকচাঁপা লেখেন, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ছিলেন প্রকৃত অর্থেই ‘বাংলার বুলবুল’। একাধারে তিনি ছিলেন শক্তিমান লেখক, সুরস্রষ্টা ও সংগীত পরিচালক। গানের জগতে সব ধরনের ধারায় তার ছিল অবাধ বিচরণ। আজীবন গান নিয়ে গবেষণা করেছেন তিনি। আঞ্চলিক সুর থেকে শুরু করে আরব্য, পারস্য, ভারতীয় এমনকি স্পেনীয় সুর নিয়েও নিরীক্ষা চালিয়ে নিজের ভালোবাসা মিশিয়ে অনন্য সুরের আবহ তৈরি করতেন।
তিনি লেখেন, বুলবুলের গানে প্রেম, বিরহ, অনুরাগ, কটাক্ষ, দেশপ্রেম, শিশুসুলভ সরলতা, সামাজিক নাটকীয়তা ও বিদ্রোহ-সবই পাওয়া যেত। ফলে চলচ্চিত্রের গানের জগতে তার কদর ছিল আলাদা। নিজেই গান লিখে তাতে সুর দেওয়ায় তার গানে কথা ও সুর যেন একই সঙ্গে জন্ম নিত। তিনি ছিলেন একজন স্বভাবকবি, যিনি মুখে মুখেই গান বানাতে পারতেন।
স্ট্যাটাসে আরও বলা হয়, নিজের সৃষ্টির প্রতি তার এক ধরনের উদাসীনতাও ছিল। গান রেকর্ড হয়ে গেলে অনেক সময় সেই লেখা ছিঁড়ে ফেলতেন। তার বিশ্বাস ছিল-ভালো গান সময়ের স্রোতেই টিকে থাকবে।
ব্যক্তিজীবনে বোহেমিয়ান এই মানুষটি নিজের জন্য খুব একটা কিছু করেননি। গান নিয়েই কাটিয়েছেন পুরো জীবন। জীবনের বিভিন্ন সময়ে বেহালা ও গিটার বাজিয়েছেন, আবার মধ্য বয়সে এসে সেগুলো নতুন করে শেখার চেষ্টা করেছেন। জ্ঞানের গভীরে যেতে নিজেকেই নিজের শিক্ষক বানিয়েছিলেন তিনি।
একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার গানে আজীবন উঠে এসেছে দেশপ্রেম, দ্রোহ ও প্রতিবাদ। চলচ্চিত্রের গানেও তিনি নিজের উদ্যোগে দেশাত্মবোধক গান যুক্ত করতেন। ভালো কণ্ঠের শিল্পীর খোঁজে তিনি ছিলেন সদা সচেষ্ট।
কনকচাঁপা স্মৃতিচারণ করে লেখেন, ১৯৯২ সালে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল নিজেই তাকে খুঁজে বের করেন। তাদের প্রথম গান ছিল ‘সাদা কাগজ এই মনটাকে তোমার হাতে তুলে দিলাম’। এরপর থেকে নিয়মিত তার সুরে গান গেয়েছেন কনকচাঁপা। বুলবুলের গানেই তিনি পেয়েছেন জীবনের প্রায় সব পুরস্কার।
স্ট্যাটাসের শেষাংশে কনকচাঁপা লেখেন, একটি গান- ‘সব কটা জানালা খুলে দাওনা’-এই একটিমাত্র সৃষ্টিই তাকে অমর করে রাখার জন্য যথেষ্ট। এমন একজন সংগীতস্রষ্টা পাওয়ায় পুরো জাতিই ধন্য।

জন্মদিনে এই কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন তিনি।
সংগীতজগতে অবদানের জন্য আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং রাষ্ট্রপতির পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন। মুক্তিযুদ্ধে যখন অংশ নেন, তখন তার বয়স মাত্র ১৫ বছর। সত্তরের দশকের শেষ দিকে ‘মেঘ বিজলি বাদল’ সিনেমায় সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। তিনি গানের অ্যালবাম করেছেন এবং অসংখ্য চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন। তার সুরে ও সংগীতে বাংলাদেশের প্রথিতযশা শিল্পীদের পাশাপাশি এ প্রজন্মের অনেকে গান গেয়েছেন।
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল তিন শতাধিক চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন। চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করে দুই বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। প্রথমটি ছিল ২০০১ সালে ‘প্রেমের তাজমহল’ আর দ্বিতীয়টি ছিল ‘হাজার বছর ধরে’ সিনেমার জন্য।
প্রয়াত গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবুর লেখা ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম সব ঘুরে এক ব্রহ্মচারী থমকে দাঁড়াল’, ‘এই দেশটা আমার স্বপ্নে বোনা নকশিকাঁথার মাঠ’, ‘যুদ্ধ এখনো থামেনি তাই তো তোমার ছেলে আসেনি’, ‘ও আমার আট কোটি ফুল দেখো গো মালি’ । গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ‘মাগো আর তোমাকে ঘুমপাড়ানি মাসি হতে দেব না’, ‘আমার বাজান গেল কই বাজার থিকা আনতে গিয়া চিড়া মুড়ি দই’, ‘একদিন ঘুম ভেঙে দেখি তুমি নাই’, ‘ওকে আর করল না তো কেউ বিয়ে’। মোহাম্মদ রফিকুজ্জামানের লেখা ‘সেই রেললাইনের ধারে মেঠো পথটার পাড়ে দাঁড়িয়ে’, মনিরুজ্জামান মনিরের লেখা ‘একতারা লাগে না আমার দোতারাও লাগে না’, এস এম হেদায়েতের লেখা ‘ও মাঝি নাও ছাইড়া দে ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে’ এবং আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের নিজের লেখা ও সুর করা ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য অপূর্ব রূপসী রূপেতে অনন্য’, ‘এই দেশ আমার সুন্দরী রাজকন্যা’, ‘একাত্তরের মা জননী কোথায় তোমার মুক্তিসেনার দল’, ‘ওগো বীর মুক্তিযোদ্ধা লও লও মুক্তির ফুল’, ‘আয় আয় আয়রে মা আয়রে আমার কোলে’ সহ অনেক জনপ্রিয় দেশের গান রয়েছে।
এছাড়াও আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সৃষ্টি আরও জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে- ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘আমার বুকের মধ্যেখানে’, ‘আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন’, ‘আমি তোমারি প্রেমও ভিখারি’, ‘ও আমার মন কান্দে, ও আমার প্রাণ কান্দে’, ‘আইলো দারুণ ফাগুনরে’, `আমার একদিকে পৃথিবী একদিকে ভালোবাসা’, আমি তোমার দুটি চোখে দুটি তারা হয়ে থাকব’, ‘আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে’, ‘পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমারই ছোঁয়াতে যেন পেয়েছি’, ‘তোমায় দেখলে মনে হয়, হাজার বছর আগেও বুঝি ছিল পরিচয়’, ‘কত মানুষ ভবের বাজারে’, ‘তুই ছাড়া কে আছে আমার জগৎ সংসারে’, ‘বাজারে যাচাই করে দেখিনি তো দাম’, ‘আম্মাজান আম্মাজান’, ‘স্বামী আর স্ত্রী বানায় যে জন মিস্ত্রি’, ‘আমার জানের জান আমার আব্বাজান’, ‘ঈশ্বর আল্লাহ বিধাতা জানে’, ‘এই বুকে বইছে যমুনা’, ‘সাগরের মতোই গভীর’, ‘আকাশের মতোই অসীম’, ‘প্রেম কখনো মধুর, কখনো সে বেদনাবিধুর’, ‘আমার সুখেরও কলসী ভাইঙা গেছে লাগবে না আর জোড়া’, ‘পৃথিবীর জন্ম যেদিন থেকে, তোমার আমার প্রেম সেদিন থেকে’।
আরও পড়ুন:
দিলরুবা খানের কাছে যে দুটি গান শুনতে চেয়েছিলেন খালেদা জিয়া
দ্বিতীয় সংসারও ভেঙে যাওয়া নিয়ে মুখ খুললেন সালমা
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ‘পড়ে না চোখের পলক’, ‘যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে’, ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’, ‘কী আমার পরিচয়’, ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’, ‘তুমি আমার জীবন, আমি তোমার জীবন’, ‘তোমার আমার প্রেম এক জনমের নয়’, ‘তুমি হাজার ফুলের মাঝে একটি গোলাপ, জীবনে বসন্ত এসেছে’, ‘ফুলে ফুলে ভরে গেছে মন, ঘুমিয়ে থাকো গো সজনী আমার হৃদয় একটা আয়না’, ‘ফুল নেব না অশ্রু নেব’, ‘বিধি তুমি বলে দাও আমি কার’, ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা, হৃদয়ে সুখের দোলা’, ‘তুমি আমার এমনই একজন’, ‘যারে এক জনমে ভালোবেসে ভরবে না এ মন’ গানগুলোও শ্রোতাদের মন জয় করেছে।
এমএমএফ/জেআইএম