‘রাষ্ট্রের কাছে শিল্পের কোনো গুরুত্বই নাই, কোনদিন ছিলোও না’

মইনুল ইসলাম
মইনুল ইসলাম মইনুল ইসলাম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:০০ এএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আশীষ খন্দকার

‘অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য খলচরিত্রের সেরা অভিনেতা হিসেবে ২০২৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন আশীষ খন্দকার। তিনি একাধারে অভিনেতা, নির্দেশক, নাট্যকার ও অনুবাদক। তার শিল্পযাত্রা দীর্ঘ এবং বিচিত্র। নাট্য ও চলচ্চিত্র অঙ্গন ও এখানকার চর্চা নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন জাতীয় পুরস্কারজয়ী এই শিল্পী।

» জাহাঙ্গীরনগর ছেড়ে এনএসডি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সেলিম আল দীনের নৈকট্যে আসি। তার সঙ্গে লড়াই কম হতো না। প্রতিটা লড়াইয়ে সে জিততে চাইতো। প্রাচ্য ও প্রাতিচ্য থিয়েটার নিয়ে তার পৃথকীকরণ চরিত্রটিকে আমি এড়িয়ে গেছি। নিজেকে পাকাপোক্ত দেখাবার জন্য ধৈর্য্য দেখাবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। সেলিম আল দীনের চারপাশে অনেক মানুষ। তাদের ভেতরে মেধাবীর সংখ্যাও কম ছিল। সেলিম আল দীন আমাকে বেশ পছন্দ করতেন, আমার সরাসরি কথা বলার যোগ্যতার জন্য। মা চাইতেন যে, উচ্চতর পড়ালেখার জন্য আমার বাইরে যাওয়া উচিত। আর আমিও একটু একজসটেড হয়ে পড়েছিলাম সার্বিক পরিস্থিতির ভেতরে। আকস্মিক এনএসডির (ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা) স্কলারশিপ পেয়ে গেলাম অনার্সের চূড়ান্ত বর্ষে। চলে গেলাম কোনো কিছু না ভেবে।

» অনেক টাকা-পয়সা নষ্ট করেছি বাবা-মায়ের
পরিবার খুব সহযোগী ছিলো। অনেক টাকা-পয়সা নষ্ট করছি বাবা-মায়ের। কোনোদিন কিছুই বলেনি। সবসময় আমাকে একেবারে ব্ল্যাংক চেক দিয়ে রেখেছিল, পরিবারের সবাই। আমি আমার মতো করে জীবনযাপন করেছি। এখনো করে যাচ্ছি, আমার মেয়ে, তার মা খুব সহযোহিতা করে যাচ্ছে। 

বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসীদের জন্য হয়ে ওঠে না, শুধু কাগজ আর বিদেশ গমন

» মঞ্চ, টেলিভিশন, না চলচ্চিত্র
সব মাধ্যমের নির্যাসই এক। তাই বিষয়টা হচ্ছে, আপনি কীভাবে নিচ্ছেন। আপনার গ্রহণযোগ্যতার ওপর এর পৃথকীকরণ নির্ভর করে। চলচ্চিত্র যখন করবেন তখন চলচ্চিত্রের মতো করে, থিয়েটার যখন করবেন থিয়েটারের মতো করে — আমার গুরুরা এই শিখিয়েছিলেন আমাকে। আমি ভারতবর্ষের অনেক বিখ্যাত মানুষ্যের সান্নিধ্য পেয়েছি। এক এক করে নাম বলে নিজের সামাজিক অবস্থান দৃঢ় করতে চাই না। যদিও অধিকাংশ তাই করে।

» মঞ্চনাটক শেষ চার দশকে শিশুসুলভ আচরণ করে এসেছে
মঞ্চনাটক এখনো পূর্ণাঙ্গ পেশাদার থিয়েটার হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। পেশাদারিত্বের কথা ছেড়ে দিন। চার দশকে শুধু শিশুসুলভ আচরণ করে এসেছে এবং তা থেকে আমি নিজেও আলাদা না। ৯০ দশকের শুরুতে থিয়েটার আর চলচ্চিত্রের একঘর তৈরির জন্য আমি নেমে পড়ি পরীক্ষায়। তারই ফলশ্রুতিতে পরিবেশ থিয়েটার আর আমার যত চলচ্চিত্রের অভিজ্ঞতা, এ দুই মিলে আমি। আমি বরাবরই ভাবতে শিখেছি, একটা শিল্পের ওপেন এণ্ডেড ফর্মে চেহারা পরিষ্কার করার। সেখান থেকেই আমার চলচ্চিত্র ও থিয়েটারের ভাবনাগুলো।

বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসীদের জন্য হয়ে ওঠে না, শুধু কাগজ আর বিদেশ গমন

» বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসীদের জন্য হয়ে ওঠে না
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও পারফর্মিং আর্টস পড়ানো হচ্ছে। শিল্পের ক্ষেত্রে এগুলি হল কাগুজে-বাঘ। থিয়েটার স্টাডিজ নামে এই সাবজেক্টটির গুরুত্ব আমার কাছে আছে, যদিও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এর সহযোগী শক্তি হতে পারিনি। তবে আমি মনে করি প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে সত্যিকার অর্থে থিয়েটার স্টাডিজকে একটি শক্তিশালী ভূমি দেওয়া দরকার, যেখানে বপন হবে শিল্পের গাছপালা। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসীদের জন্য এটা হয়ে ওঠে না। শুধু কাগজ হয়, আর বিদেশ গমন।

» ছাগল চিহ্নিতকরণ
পাশের দেশে একাধিক সুসংগঠিত চলচ্চিত্র বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশে এখনো তেমন শক্ত ভিতের ফিল্মস্কুল দাঁড়াতে পারেনি। কেন? ছাগল চিহ্নিত করুন, যাদের দিয়ে আসল কাজ হবে। যাদের মাংস সুস্বাদু হবে। থিয়েটার আর্ট ডিপার্টমেন্টের চাকরিজীবী হয়ে লাভ নেই, ডিগ্রি নিন, কাগজ নিন, তবে তার ব্যবহারিক প্রক্রিয়াকে মাথায় রেখে। পৃথিবীতে বহু স্কলার আছেন, যারা সারাদিন নাটক-ফিল্ম-থিয়েটারের কথা বলেন, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম করে বেড়ায়, ফেলোশিপের টাকা খান, যারা জেনারেশনের ভেতর কোনো স্বপ্ন তৈরি করেন না। এই দেখে আসছি গত চার দশক।

বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসীদের জন্য হয়ে ওঠে না, শুধু কাগজ আর বিদেশ গমন

» সৃজনী যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেব
চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য এখন একটা মেথডোলজিতে পড়ে গেছে। এটার একটা একাডেমিক চর্চা বিশ্বজুড়ে হয়। তবে সৃজনী যোগ্যতাকে আমি গুরুত্ব দেব বেশি, চিত্রকল্প নির্মাণে। পদ্ধতিগতভাবে ফিল্ম যেহেতু একটি সুনির্দিষ্ট শিল্পকলা, এখানে ভেবেচিন্তে কাজ করতে হয়। এই শিল্পে তীক্ষ্ণতার দরকার আছে, আর সেটাও আমাদের অর্জন করা উচিত।

» থিয়েটার না ফিল্ম
শরীর ও মননকে সাজানোর যে প্রক্রিয়া, তার ভিন্ন মাধ্যমে অবগাহন করার যে শক্তি, মঞ্চ বা চলচ্চিত্রে সেটাই মোদ্দা কথা। থিয়েটার এবং ফিল্ম-এর ক্যামিস্ট্রিটাকে আলাদা আলদা করে দেখার প্রবণতা আমার নেই, সব মাধ্যমেই সাবলীল হতে চাই।

বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসীদের জন্য হয়ে ওঠে না, শুধু কাগজ আর বিদেশ গমন

» শিল্পও এক ধরনের ট্রেড
রাষ্ট্রের কাছে এর কোনো গুরুত্বই নাই, কোনদিন ছিলোও না। তবে গুরুত্ব তৈরি হওয়া উচিত। শিল্পও এক ধরনের ট্রেড যা বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ের আওতায় পরবে।

» শিল্পীর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা
দীর্ঘ অভিনয়জীবন শেষে অনেক শিল্পীকেই চিকিৎসার জন্য সরকারের দ্বারস্থ হতে দেখা যায়। এটা শিল্পীর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা হেরে যাওয়া। তাছাড়া কোনো কিছু্ বলতে চাই না। যদিও অনেকে আমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারে। একটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত। শিল্পীদের জন্য স্থায়ী কল্যাণ তহবিল বা পেনশন ব্যবস্থার কথা যদি বলেন, এই দানবাক্স চিরকালই ছিলো, সবই সময়ের শিকার। তবে আমার একটা হ্যান্ডসাম চাকরি দরকার। একটা ভালো চাকরির সন্ধান পেলে ভালোই কাটবে, যদি সেটা মফস্বলেও হয়। ঢাকা হলে তো সোনায় সোহাগা অথবা একখণ্ড জমির মালিকানা।

এমআই/আরএমডি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।