অধরা নিরাপদ মাতৃত্ব
ঝোপঝাড়ে, নৌকায়—পথেই হয়ে যায় প্রসব
মুর্শিদা আক্তারের বয়স মাত্র ২০ বছর। গত ৩ মে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেন তিনি। কিন্তু তার মাতৃত্বের গল্প কোনো সাধারণ গ্রামের নয়—‘যুদ্ধক্ষেত্র’ পেরিয়ে একটি জীবনকে পৃথিবীতে আনার লড়াই ছিল সেটি।
সেদিন ভোর ৫টায় স্বামী ও শাশুড়ির সঙ্গে মোটরসাইকেলে চড়ে বাড়ি থেকে বের হন মুর্শিদা। চরের এবড়োখেবড়ো মেঠোপথ, কাদা, খাল ও ঝোপঝাড় পেরিয়ে সকাল সাড়ে ৮টায় পৌঁছান একটি ছোট্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখানেই স্বাভাবিক প্রসবে জন্ম নেয় তার সন্তান। কয়েক ঘণ্টা পর বিকেলেই নবজাতককে কোলে নিয়ে একই মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরে যান মুর্শিদা।
চিকিৎসকদের চোখে এটি ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু যমুনার বুকে জেগে ওঠা চর ঘোরজানের মানুষের কাছে এটাই ‘নিরাপদ মাতৃত্বের’ সবচেয়ে ভালো উদাহরণ।
ইঞ্জিনচালিত নৌকায় যমুনা নদী পাড়ি দিয়ে যেতে হয় সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলায়, ছবি: জাগো নিউজ
রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ১২৭ কিলোমিটার দূরে সিরাজগঞ্জ জেলা সদর। সেখান থেকে বেলকুচি হয়ে এনায়েতপুর আরও প্রায় ৩০ কিলোমিটার। এরপর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় আধাঘণ্টা যমুনা নদী পাড়ি। এরপর মোটরসাইকেলে যেতে হয় আরও ২০ মিনিট। সেই পথও কোনো রাস্তা নয়—জমির আইল, খালের পাড়, কাদা, ঝোপঝাড় আর কখনো পানির ভেতর দিয়েই চলতে হয়। পানি এলে সব ডুবে যায়। তাই এখানে রাস্তা তৈরি হয় না।
প্রসব বেদনা উঠলে এমন নৌকায় যমুনা পাড়ি দিয়ে যেতে হয় হাসপাতালে। সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ঘোরজান চর থেকে তোলা, ছবি: জাগো নিউজ
গত ৩ মে দুপুরে এই প্রতিবেদক পৌঁছান চৌহালী উপজেলার ঘোরজান চরের বরংগাইল গ্রামে। সেখানে ‘সুস্বাস্থ্য’ নামের একটি ছোট স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সদ্যোজাত শিশুকে ঘিরে সবার মুখে হাসি।
আরও পড়ুন
ভাঙা রাস্তায় ঝাঁকুনিতে ভ্যানেই সন্তান প্রসব
না দেখেই চিকিৎসক বললেন ‘অবস্থা জটিল’, পরে সিঁড়িতেই জন্ম নিল শিশু
সড়কে জন্ম নেওয়া শিশুকে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার নির্দেশ
হবিগঞ্জে মহাসড়কের পাশে জন্ম নেওয়া শিশু ছোটমনি নিবাসে
মুর্শিদা বলেন, ‘এটা আমার দ্বিতীয় বাচ্চা। প্রথমবার শাহজাদপুর গিয়ে চেকআপ করাতে হতো। অনেক কষ্ট ছিল—নৌকা, বাইক, সিএনজি বদলাতে হতো। এবার অন্তত এত দূর যেতে হয়নি।’
তার কণ্ঠে স্বস্তি থাকলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের হিসেবে, এটি স্বস্তির গল্প নয়।
ফুলহারা গ্রামের আঁখি আক্তার, ছবি: জাগো নিউজ
ফুলহারা গ্রামের নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা আঁখি আক্তার এসেছেন চিকিৎসক দেখাতে। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অনেকের বাচ্চা হয়ে যায়—নৌকায়, রাস্তায়।’
তার নিজের অভিজ্ঞতাও কম ভয়ংকর নয়। তিনি বলেন, ‘চার বছর আগে পাশের বাড়ির এক ভাবির ব্যথা ওঠে। গ্রামের ডাক্তার দ্রুত শাহজাদপুর নিতে বলেন। কিন্তু নৌকাতেই বাচ্চা হয়ে যায়। বাচ্চার নাম রাখা হয়েছে মাহিম।’
এই চরাঞ্চল মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। শাহজাদপুরের সোনাতনী, চৌহালীর ঘোরজান ও স্থল ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে অর্ধলক্ষাধিক মানুষের বাস। অথচ নেই কোনো সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে প্রসব—সব চিকিৎসার জন্য মানুষকে যেতে হয় মূল ভূখণ্ডে। কারও গন্তব্য শাহজাদপুর, কারও এনায়েতপুর, কেউ যায় টাঙ্গাইলের নাগরপুর বা পাবনার বেড়ায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পথটাই সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।
এভাবেই কর্দমাক্ত মেঠোপথ মাড়িয়ে চলতে হয় চরের মানুষদের। সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ঘোরজান চর থেকে তোলা, ছবি: জাগো নিউজ
এখানে প্রসবের ব্যবস্থা বলতে মূলত দাদি-নানিদের অভিজ্ঞতা, হাতুড়ে ডাক্তারের ইনজেকশন আর ভাগ্যের ওপর ভরসা। সমস্যা দেখা দিলেই শুরু হয় জীবন-মৃত্যুর দৌড়—মোটরবাইকে, নৌকায়, কাদামাটির সরু পথে। কখনো ঝোপঝাড়ের আড়ালে, কখনো নদীর মাঝখানে জন্ম নেয় শিশু।
যমুনা নদীতে নৌকা চালান আল-আমিন (২৬)। প্রায় এক দশকে অসংখ্য রোগী পারাপার করেছেন তিনি। তার কণ্ঠেও জমে আছে অসহায় অভিজ্ঞতা। ‘৪-৫টা ডেলিভারি আমার নৌকায়ই হয়েছে। মাঝনদীতে বাচ্চা হলে আর কেউ হাসপাতালে যায় না, বাড়ি ফিরে যায়।’
ঘাট থেকে মোটরসাইকেলে মানুষ পারাপার করেন সমেষ আলী (১৯)। তিনি বলেন, ‘দুই বছর আগে এক গর্ভবতীকে নিয়ে যাচ্ছিলাম। পথে সমস্যা হয়। পাশে ঝোপের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই বাচ্চা হয়ে যায়।’
দক্ষিণ বরংগাইল গ্রামের বাসিন্দা জানে আলম, ছবি: জাগো নিউজ
দক্ষিণ বরংগাইল গ্রামের বৃদ্ধ দম্পতি জানে আলম ও চেন বানু প্রায় ৩৫ বছর ধরে এই চরে আছেন। তাদের সব সন্তান ঘরেই জন্ম নিয়েছে। কোনো ডাক্তার-নার্স লাগেনি। কিন্তু চোখের সামনেই বহু মা ও নবজাতকের মৃত্যু দেখেছেন তারা। ‘খিচুনি উঠছে, পথেই মারা গেছে। কেউ আবার হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই বাচ্চা হারাইছে,’ বলেন তারা।
চিকিৎসক জান্নাতুল পিয়া, ছবি: জাগো নিউজ
‘সুস্বাস্থ্য’ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার ডা. জান্নাতুল পিয়া বলেন, ‘যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এখানে গর্ভবতী মায়েরা চরম ঝুঁকিতে থাকেন। প্রধান ভরসা মোটরসাইকেল আর নৌকা। অনেক সময় পথেই ডেলিভারি হয়ে যায়।’
তিনি জানান, এখানে আল্ট্রাসনোগ্রামেরও স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেক মা জানেনই না গর্ভের শিশুর অবস্থা কী, সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ কবে। অধিকাংশ মা আসেন ১৬-১৮ বছরের মধ্যে, তারা একাধিক সন্তান ধারণ করেছেন। সংসারের জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন। পান না পুষ্টিকর খাবার। যার কারণে অপুষ্টি, আয়রন ও ক্যালসিয়ামের অভাবও মারাত্মক সমস্যা।
আরও পড়ুন
অকালে শিশুর জন্ম, অকালেই মৃত্যু
রাস্তায় জন্ম নেওয়া সেই নবজাতক পেলো ঠিকানা
চিকিৎসক মেলেনি পরপর ৩ হাসপাতাল-ক্লিনিকে, রাস্তায় জন্ম নিলো শিশু
রাস্তায় সন্তান প্রসব করলেন মা, জানেন না কে তার সন্তানের বাবা
মিডওয়াইফ তাহরিমা খাতুন বলেন, ‘অনেক মা আগে গ্রাম্য ধাত্রী দিয়ে বাসায় প্রসবের চেষ্টা করেন। ভুলভাবে অক্সিটোসিন ব্যবহার করায় জটিলতা তৈরি হয়। জরায়ুমুখ না খুললেও ব্যথা বাড়তে থাকে। এতে মা ও শিশু দুজনই ঝুঁকিতে পড়ে।’
তারা গত ১০ মাসে প্রায় ৭০টি ডেলিভারি করিয়েছেন। জটিল রোগীদের দ্রুত রেফার করেন।

আরেক মিডওয়াইফ সোহাগী জাহান বলেন, ‘অনেক মা আমাদের বলেন—নৌকায়, রাস্তায়, এমনকি ঝোপঝাড়ের আড়ালেও সন্তান জন্ম দিয়েছেন তারা। এসব শুনলে ভয় লাগে।’
তিনি জানান, অদক্ষ ধাত্রী দিয়ে দীর্ঘসময় প্রসব করানোর কারণে এই এলাকায় ফিস্টুলার রোগীও তুলনামূলক বেশি।
ব্র্যাকের ‘চর্মস’ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক মাহফুজার রহমান বলেন, ‘বিস্তীর্ণ চরে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নেই। গত নভেম্বর থেকে আমরা কাজ শুরু করেছি। তবে, এতটুকু যথেষ্ট নয়। চরের দুঃসহ জীবনে মা ও শিশু সুরক্ষায় বড় উদ্যোগ প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, আমাদের সুস্বাস্থ্য ক্লিনিকে সপ্তাহে একদিন একজন চিকিৎসক সেবা দেন। প্রতিদিন দুজন মিডওয়াইফ ও একজন প্যারামেডিক ২৪ ঘণ্টা সেবা দেন।
চরের ভেতরে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম মোটরসাইকেল। সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ঘোরজান চর থেকে তোলা, ছবি: জাগো নিউজ
ঘোরজান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রমজান আলী বলেন, ‘সরকারের কোনো স্বাস্থ্যসেবা এখানে নেই। শুধু ব্র্যাকের এই ছোট্ট ক্লিনিকটাই কিছু করছে।’
সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. নুরুল আমীনও স্বীকার করেন, চরাঞ্চল এখনো স্বাস্থ্যসেবাবঞ্চিত। সেখানে একটি সাব-সেন্টার স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত জাগো নিউজের কাছে স্বীকার করেন, যমুনা নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা চরে স্বাস্থ্যসেবার তেমন উদ্যোগ নেই। গর্ভবতী মায়েদের কষ্টটা বেশি। হাসপাতালে আনার পথে ঝোপঝাড় বা নৌকায় সন্তান প্রসবের ঘটনাও আছে। তাদের জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেবেন। এ নিয়ে তিনি কাজ করছেন।
চরাঞ্চলের এই সংকট শুধু যমুনার চরেই সীমাবদ্ধ নয়। পুরো রাজশাহী বিভাগের চিত্র একই।
চরের মানুষদের জরুরি প্রয়োজনে নৌকায় করে যেতে হয় অন্য উপজেলা বা জেলা সদরে, ছবি: জাগো নিউজ
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণায় দেখা গেছে, চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না রাজশাহী বিভাগের ৭৩ দশমিক ২৯ শতাংশ মানুষ। এ বিভাগে মানুষের চাহিদার মাত্র ২৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পূরণ হয়।
২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে ১৪ হাজার ৪০০ পরিবারের ওপর করা এ গবেষণায় উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়, সচেতনতার অভাব, সহায়তাকারীর সংকট ও চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে ফার্মেসি বা অযোগ্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
আরও পড়ুন
মাতৃত্ব-পরিবারের দায়িত্ব পালনে চাকরি ছাড়ছেন নারীরা, কাজে ফেরাতে উদ্যোগ
হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে রাস্তায় সন্তান প্রসব করলেন মা
বাড়ি ফেরার পথে ট্রেনে সন্তান জন্ম দিলেন প্রসূতি
নদীগর্ভে ঘর বিলীন, নৌকায় সন্তান প্রসব
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে যে চিকিৎসা ব্যয় এখন পরিবারের জন্য বড় আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে—গড়ে প্রতি পরিবার মাসে ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা চিকিৎসায় ব্যয় করছে, আর ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনি রোগের চিকিৎসায় খরচ লাখ টাকায় পৌঁছাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফ ও ইউএনএফপিএর বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ১০ জন মারা যান সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে। প্রতিদিন ১৭৩টি মৃত শিশুর জন্ম হয়, আর পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৯০ শিশু মারা যায়।
চৌহালীর ঘোরজান চরে ‘সুস্বাস্থ্য’ সেবা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছে রোগীরা, ছবি: জাগো নিউজ
বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যু ১২৩। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পরই অবস্থান বাংলাদেশের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো চিকিৎসাসেবা না পাওয়া, দক্ষ জনবলের অভাব, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং দুর্গম অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতাই এই সংকট আরও গভীর করছে। যমুনার চরাঞ্চলে সেই বাস্তবতা আরও নির্মম। এখানে সন্তান জন্ম মানেই শুধু নতুন প্রাণের আগমন নয়—একটি পরিবারের ভাগ্য, ভয় আর বেঁচে ফেরার লড়াইও।
এসইউজে/এমএমএআর/এমএফএ