উৎসবের কাজে সাহায্য চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণীর পোস্ট, পরদিনই মানুষের ঢল
চীনা নববর্ষের আগে ঐতিহ্যবাহী কমিউনিটি ভোজের প্রস্তুতির কাজে বাবাকে সাহায্য করতে গিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট দিয়েছিলেন এক তরুণী। কিন্তু তিনি নিজেও কল্পনা করতে পারেননি, সেই পোস্টের পরদিনই তার গ্রামে নেমে আসবে মানুষের ঢল।
চীনের সিচুয়ান ও চংকিং সীমান্তবর্তী কুইংফু গ্রামের বাসিন্দা ‘দাইদাই’ নামে ওই তরুণী জানান, বয়সের ভারে তার বাবা দুটি শূকর জবাই করার মতো শারীরিকভাবে সক্ষম নন। বাবার মন খারাপ না হয়, এ চিন্তা থেকেই তিনি গত সপ্তাহের শেষ দিকে চীনা সোশ্যাল মিডিয়া দৌইনে একটি পোস্ট করেন।
পোস্টে দাইদাই লেখেন, ‘কেউ কি আমাকে সাহায্য করতে পারবেন? আমার বাবা অনেক বৃদ্ধ। আমি চিন্তিত, তিনি একা এই শূকরগুলো সামলাতে পারবেন না।’ তিনি আরও জানান, যারা সাহায্য করতে আসবেন, তাদের জন্য গ্রামে শূকরের মাংসের ভোজের আয়োজন থাকবে।
আরও পড়ুন>>
মধ্যরাতে ট্রাম্পের ১৬০ পোস্ট, সকালে ‘ঝিমালেন’ ক্যাবিনেট মিটিংয়ে
৮ বছর আগে ‘নিখোঁজ’ স্বামীকে ইনস্টাগ্রামে খুঁজে পেলেন স্ত্রী, সঙ্গে অন্য নারী
আইফোন ১৭ কিনতে অনুদান চান ‘বিউটি কুইন’ মাহি, ভিডিও ভাইরাল
গ্রামীণ সিচুয়ান ও চংকিং অঞ্চলে বড় আকারের কমিউনিটি ভোজ স্থানীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ভোজে সাধারণত ডাবল-কুকড পর্ক, ভাপানো পাঁজর, স্যুপ ও ঘরে তৈরি মদ পরিবেশন করা হয়। দাইদাই বলেন, ‘আমি চাই, আমাদের গ্রামে যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি।’
তার এই আবেদন দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। পোস্টটি ১০ লাখের বেশি লাইক পায়। বাস্তবে এর প্রতিক্রিয়াও ছিল অভূতপূর্ব।
প্রয়োজনের তুলনায় বহু গুণ বেশি মানুষ গাড়ি নিয়ে ছুটে যায় কুইংফু গ্রামে। হাজারও গাড়ির চাপে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ওই অঞ্চলের গ্রামীণ সড়কে তৈরি হয় যানজট। ড্রোনচিত্রে দেখা যায়, দুই পাশে ধানক্ষেত রেখে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির পর গাড়ি। কেউ কেউ যানজট এড়াতে বহু দূর হেঁটেও গ্রামে পৌঁছান।
পরিস্থিতি সামাল দিতে দাইদাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সতর্কবার্তা দিয়ে শহর থেকে আসা চালকদের গ্রামীণ সড়কে সাবধানে চলার অনুরোধ জানান।
১০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে আসা এক দর্শনার্থী বলেন, ‘পরিবেশটা দারুণ ছিল। শৈশবের কথা মনে পড়ে গেলো, যখন আমাদের পরিবারও শূকর পালন করতো। বহু বছর পর এমন অনুভূতি হলো।’ তিনি জানান, দেশের নানা প্রান্তের নম্বরপ্লেট তার চোখে পড়েছে।
শূকর জবাই ও পরবর্তী বিশাল ভোজের আয়োজনটি সরাসরি অনলাইনে সম্প্রচার করা হয়। এক সময় এক লাখের বেশি মানুষ তা লাইভ দেখেন, আর লাইক পড়ে প্রায় দুই কোটি।
স্থানীয় সরকার এটিকে হঠাৎ তৈরি হওয়া এক ধরনের ‘ফ্ল্যাশ ট্যুরিজম’ হিসেবে দেখছে। দুটি শূকর এত মানুষের জন্য যথেষ্ট না হওয়ায় পর্যটন কর্তৃপক্ষ আরও শূকর সরবরাহ করে। পাশাপাশি, স্থানীয় ছোট রেস্তোরাঁগুলো আগত দর্শনার্থীদের খোলা আকাশের নিচে খাবার পরিবেশন করে।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে একটি ছোট উদ্যোগ কীভাবে দ্রুত বিশাল ঘটনায় রূপ নিতে পারে, তার উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে এই ঘটনাকে । দাইদাই চীনা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম হয়তো এক ডজন মানুষ আসবে। কিন্তু বাস্তবে এত মানুষ এসেছে যে গুনে শেষ করা যায় না।’
গত শুক্রবার পোস্ট দেওয়ার পর শনিবারই পরিস্থিতি এত বড় হয়ে ওঠে যে দাইদাই নিজেই পুলিশকে বিষয়টি জানান। এরপর অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে শৃঙ্খলা রক্ষা করা হয়। দুইদিন ধরে চলা এই ভোজে ১১ জানুয়ারি এক হাজার মানুষ অংশ নেন, পরদিন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজারে। রাতে আগুন জ্বালিয়ে গান-বাজনার মধ্য দিয়ে চলে উৎসব।
শেষ পর্যন্ত দাইদাই ঘোষণা দেন, তার আয়োজন শেষ। নতুন করে কেউ যেন তার বাড়িতে না আসেন, সে অনুরোধও জানান। দুইদিনে মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমিয়ে ক্লান্ত হলেও তিনি বলেন, এটি তার ও গ্রামের জন্য এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
তিনি বলেন, ‘যারা অপরিচিত হয়েও ডাকে সাড়া দিয়েছেন, তাদের উদ্দীপনা ও আন্তরিকতা না থাকলে এমন ভোজ সম্ভব হতো না। সবার অনুভূতি ছিল যেন আমরা এক বড় পরিবারের সদস্য।’
দাইদাই জানান, তার বাবা এই অভূতপূর্ব ঘটনায় খুবই আনন্দিত। ‘এত মানুষ আসবে দেখে তাকে অন্যদের কাছ থেকে টেবিল-চেয়ার ধার নিতে হয়েছে। আমরা আগে কখনো এমন কিছু দেখিনি,’ বলেন তিনি।
ধারণা করা হচ্ছে, দাইদাইয়ের গ্রাম ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজনকে নিয়মিত উৎসবে রূপ দিতে পারে।
সূত্র: বিবিসি
কেএএ/