মোদীর ইসরায়েলপ্রীতি ও এপস্টেইন ফাইল বিতর্ক

খান আরাফাত আলী
খান আরাফাত আলী খান আরাফাত আলী , সহ -সম্পাদক
প্রকাশিত: ০৫:২৩ পিএম, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নরেন্দ্র মোদী ও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু/ ফাইল ছবি: জিপিও

যুক্তরাষ্ট্রে কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের গোপন নথিতে নাম আসার পর বেশ চাপে রয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। একটি নথিতে দাবি করা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতে ইসরায়েলে গিয়ে নাচগান করেছিলেন মোদী। এ নিয়ে সরব হয়েছে ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস, চলছে তীব্র সমালোচনা। তবে সেগুলোকে যেন পাত্তাই দিচ্ছেন না নরেন্দ্র মোদী।

এতসব বিতর্কের মধ্যেই চলতি মাসে আবারও ইসরায়েল সফরে যেতে পারেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজার নিজেই এ তথ্য জানিয়েছেন। সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এরই মধ্যে সফর আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারত-ইসরায়েলের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সফর ও বৈঠক বেড়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সন্ত্রাস দমন, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, সেমিকন্ডাক্টর ও উচ্চপ্রযুক্তি খাতে সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে উভয় পক্ষ। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গয়াল ইসরায়েল সফর করেছেন।

আরও পড়ুন>>
যুদ্ধের মধ্যেই ইসরায়েলে যেতে বিশাল লাইন ভারতীয়দের
ইসরায়েলে গেলো ১৬ হাজার ভারতীয় শ্রমিক, কাজ করবে ফিলিস্তিনিদের জায়গায়
নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলে হিব্রু ভাষায় মোদীর পোস্ট, কী লিখলেন?

গত এক দশকে ভারত ও ইসরায়েলের সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে উন্নীত হয়েছে। প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা এখন এই অংশীদারত্বের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নজরদারি ব্যবস্থা ও আকাশ প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্মসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ইসরায়েল থেকে সংগ্রহ করছে ভারত। ইসরায়েল বর্তমানে ভারতের অন্যতম বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ।

প্রতিরক্ষার বাইরে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ জোরদার করতেও কাজ করছে দুই দেশ। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। স্টার্টআপ, ফিনটেক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বিশুদ্ধ পানি প্রযুক্তিতে যৌথ উদ্যোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। সাইবার নিরাপত্তা, মহাকাশ এবং উদ্ভাবন খাতেও সহযোগিতা বাড়ছে।

মোদীর ইসরায়েলপ্রীতি

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমলে ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের বর্বরোচিত গণহত্যা নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করা থেকে বিরত রয়েছে মোদী সরকার। পাশাপাশি, ভারতে ফিলিস্তিনের পক্ষে ও ইসরায়েলের বিপক্ষে কিছু বললেই হেনস্তার অভিযোগও উঠেছে।

সম্প্রতি ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন, বয়কট ইসরায়েল’ স্লোগানসংবলিত স্টিকার লাগানোর অভিযোগে যুক্তরাজ্যের দুই পর্যটককে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে মোদী সরকার। পুলিশের দাবি, লুইস গ্যাব্রিয়েল ডি এবং আনুশি এমা ক্রিস্টিন নামে ওই দম্পতি পর্যটন ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন।

আরও পড়ুন>> 
হামাসের হামলা/ ‘নিরীহ’ ইসরায়েলিদের পাশে দাঁড়ালো ভারত
ভারতের মানুষ ইসরায়েলের পক্ষে, নেতানিয়াহুকে জানালেন মোদী
ভারতে মুসলিম দেশের পতাকা ওড়ানোয় বিদ্যুৎকর্মী বরখাস্ত, গ্রেফতার ৮
‘বয়কট ইসরায়েল’ স্টিকার লাগানোয় ২ ব্রিটিশ পর্যটককে ভারত ছাড়ার নির্দেশ

রাজস্থানের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজেশ মীনা বলেছেন, ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থান করে অন্য দেশের প্রতি অসম্মানজনক কর্মকাণ্ডে জড়ানো ভিসা বিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, গত ২১ জানুয়ারি জনপ্রিয় পর্যটন শহর পুষ্করে একাধিক স্থানে ওই দুই পর্যটক স্টিকার লাগাচ্ছেন, এমন অভিযোগ পাওয়া যায়। স্টিকারগুলোতে লেখা ছিল, ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন, বয়কট ইসরায়েল’ (ফিলিস্তিন মুক্ত করো, ইসরায়েল বয়কট করো)।

পুষ্কর শহরটি ইসরায়েলি পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। সামরিক দায়িত্ব শেষ করার পর অনেক ইসরায়েলি সেখানে সময় কাটাতে যান। বর্তমানে শহরটিতে প্রায় দুই হাজার ইসরায়েলি অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।

এর আগে, গত বছর ভারতের উত্তর প্রদেশে ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ানোয় একজন চুক্তিভিত্তিক বিদ্যুৎকর্মীকে বরখাস্ত করা হয়। একই অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় অন্তত আটজনকে।

মোদী ও এপস্টেইন ফাইল বিতর্ক

গত ৩০ জানুয়ারি মার্কিন বিচার বিভাগ প্রকাশিত গোপন নথিতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতা, প্রভাবশালী রাজনীতিক ও ধনকুবেরদের নাম উঠে এসেছে। সেই তালিকায় রয়েছেন নরেন্দ্র মোদীসহ ভারতের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিও।

নথিতে দেখা যায়, রিলায়েন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ভারতীয় শিল্পপতি অনিল আম্বানির সঙ্গে এপস্টেইনের একাধিক ই-মেইল ও বার্তা বিনিময় হয়েছে। এসব যোগাযোগ হয়েছিল ২০০৮ সালে এপস্টেইন প্রথমবার যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরবর্তী সময়ে।

আরও পড়ুন>>
এপস্টেইন ফাইলস/ ট্রাম্পকে খুশি করতে ইসরায়েলে নাচগান করেন মোদী
ইসরায়েলে মোদীর নাচগানের খবরকে ‘ভিত্তিহীন’ বললো নয়াদিল্লি
মোদী থেকে আম্বানি/ এপস্টেইন ফাইলসে যাদের নামে ভারতে তোলপাড়

নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত হতে যাওয়া ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদের বিষয়ে আলোচনা থেকে শুরু করে মোদীর সঙ্গে শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদের বৈঠক আয়োজনের বিষয়েও দুজনের মধ্যে কথাবার্তা হয়েছে।

অনিল আম্বানি ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানির ভাই। মুকেশ আম্বানিও প্রধানমন্ত্রী মোদীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।

নথিতে বলা হয়, ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদে শপথ নেওয়ার প্রায় দুই মাস পর অনিল আম্বানি এপস্টেইনকে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি জানান, ‘নেতৃত্ব’ ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে এপস্টেইনের সহায়তা চাইছে। ওই তালিকায় ছিলেন জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ ব্যানন।

একই সঙ্গে মে মাসে মোদীর সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক নিয়েও এপস্টেইনের পরামর্শ চান আম্বানি। এর দুই সপ্তাহ পর, ২৯ মার্চের আরেক বার্তায় এপস্টেইন লেখেন, ‘ইসরায়েল কৌশল নিয়ে আলোচনা মোদীর তারিখ নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে।’ এর দুদিন পর আম্বানি জানান, মোদী জুলাইয়ে ইসরায়েল সফর করবেন এবং এ বিষয়ে ‘ট্র্যাক টু’ যোগাযোগে এপস্টেইনের পরিচিতদের সম্পর্কে জানতে চান।

২০১৭ সালের ২৬ জুন ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রথমবারের মতো বৈঠক করেন মোদী। এর পর ৬ জুলাই মোদী ইসরায়েল সফরে যান, যা ছিল কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ইসরায়েল সফর। ওই সফরে তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করায় ফিলিস্তিনের কর্মকর্তারা তীব্র সমালোচনা করেন।

সেই বছরই ভারত ইসরায়েল থেকে প্রায় ৭১৫ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কেনে এবং দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার হয়। এটি ফিলিস্তিন প্রশ্নে ভারতের দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে একটি বড় নীতিগত পরিবর্তন হিসেবেই দেখা হয়।

নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, মোদীর ইসরায়েল সফরের পর এপস্টেইন ‘জাবর ওয়াই’ নামে এক ব্যক্তিকে ইমেইলে লেখেন, মোদী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের স্বার্থে ইসরায়েলে গিয়ে পরামর্শ নিয়েছিলেন এবং এতে রাজনৈতিকভাবে লাভ হয়েছে। মোদী ট্রাম্পকে খুশি করতে ইসরায়েলে গিয়ে নাচগান করেছিলেন বলেও দাবি করা হয় ইমেইলে।

এরপর, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোদীর বড় জয়ের পর এপস্টেইন হোয়াইট হাউজের সাবেক কৌশলবিদ স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে মোদীর বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দেন। ওই সময় নিউইয়র্কে অনিল আম্বানি ও এপস্টেইনের বৈঠকের কথাও নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে আম্বানির কোনো সরকারি অনুমোদন ছিল কি না, সে বিষয়ে কোনও স্পষ্ট তথ্য নেই।

সরকারের প্রতিক্রিয়া ও বিরোধীদের দাবি

এপস্টেইন ফাইলসে মোদীর প্রসঙ্গকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে ভারত সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ২০১৭ সালের ইসরায়েল সফরের বাইরে ইমেইলে থাকা বাকি সব মন্তব্য একজন দণ্ডিত অপরাধীর কল্পনাপ্রসূত কথা মাত্র।

তবে বিরোধী দল কংগ্রেস এসব তথ্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেছে। দলের সাংগঠনিক সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, এপস্টেইন ফাইলস দেখাচ্ছে কারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রভাব বিস্তার করছে এবং এতে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় স্বার্থ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।

এপস্টেইন নথি প্রকাশের পর ভারতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক, ক্ষমতার কেন্দ্র এবং প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে বিতর্ক নতুন করে তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণে অপ্রকাশ্য প্রভাব, স্বচ্ছতার অভাব এবং ক্ষমতাসীন সরকারের ভূমিকাকে ঘিরে প্রশ্ন উঠছে। এসব অভিযোগ ও পাল্টা ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে ইসরায়েলনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে মোদী সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়ছে।

সূত্র: আল-জাজিরা, দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, এনডিটিভি
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।