শুভেন্দু অধিকারীর কাছের মানুষদের বারবার এমন ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’ কেন?

খান আরাফাত আলী
খান আরাফাত আলী খান আরাফাত আলী , সহ -সম্পাদক
প্রকাশিত: ০১:১৮ পিএম, ০৭ মে ২০২৬
গুলিতে নিহত শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথ/ ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গের আলোচিত বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম আসন থেকে জয়ী হয়েছেন তিনি। হতে পারেন রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রীও। এমন আনন্দের মুহূর্তেই হঠাৎ বিষাদের ছায়া। বুধবার (৬ মে) রাতে খুন হয়েছেন তার ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথ। মাঝরাস্তায় ‘ফিল্মি স্টাইলে’ গুলি করে হত্যা করা হয়েছে তাকে।

তবে শুভেন্দুর কাছের মানুষদের মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা কয়েকজনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। তবে সেসব ঘটনায় আজ অবধি কেউ গ্রেফতার হননি বা কারও সাজা হওয়ারও নজির নেই।

ব্যক্তিগত সহকারীর কাজ কী?

ইংরেজিতে ‘পারসোনাল অ্যাসিট্যান্ট’ বা ‘পিএ’, বাংলায় বলা হয় ব্যক্তিগত সহকারী। তবে পশ্চিমবঙ্গে পদটি ‘আপ্ত সহায়ক’ নামেই বেশি পরিচিত।

তিনি হলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী বা বিশিষ্ট ব্যক্তির দৈনন্দিন কাজকর্ম, কর্মসূচি এবং ব্যক্তিগত বা দাপ্তরিক যোগাযোগের বিষয়গুলো দেখাশোনা করেন।

সাধারণত বস বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মিটিং, অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা ভ্রমণসূচি নির্ধারণ করা; ফোনকল রিসিভ করা, ই-মেইল বা চিঠিপত্রের উত্তর দেওয়া এবং বার্তা আদান-প্রদান করা; প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক নথিপত্র প্রস্তুত করা, তথ্য সংরক্ষণ করা এবং অন্যান্য কর্মকর্তা বা দর্শনার্থীদের সঙ্গে বসের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা ব্যক্তিগত সহকারীর প্রধান কাজ।

অর্থাৎ বসের দৈনন্দিন জীবনের নানা খুটিনাটি তথ্য সম্পর্কে অবগত থাকেন ব্যক্তিগত সহকারী।

সাবেক ব্যক্তিগত সহকারীর রহস্যময় মৃত্যু

২০১৩ সালে শুভেন্দু অধিকারীর সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী প্রদীপ ঝার মরদেহ পাওয়া যায় কলকাতার স্ট্র্যান্ড রোডে। ঘটনাটি তখন বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। প্রদীপ ঝা ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে হলদিয়া ও নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে শুভেন্দু অধিকারীর নির্বাচনের দায়িত্বে ছিলেন। তবে মৃত্যুর কিছু সময় আগে দলীয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে তিনি শুভেন্দুর অফিস ছেড়েছিলেন বলে জানা যায়।

প্রাথমিকভাবে পুলিশ জানিয়েছিল, প্রদীপ ঝার পাকস্থলীতে প্রায় ৭০০ মিলি অ্যালকোহল পাওয়া গিয়েছিল। খাবারের কণা শ্বাসনালিতে আটকে যাওয়া এবং ঠোঁটে সামান্য আঘাতের চিহ্নও পাওয়া গিয়েছিল। পুলিশ সন্দেহ করেছিল, অতিরিক্ত মদ্যপানের পর বমি করার চেষ্টা করার সময় খাবারের কণা শ্বাসনালিতে আটকে গিয়ে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে প্রদীপ ঝার মা অভিযোগ করেছিলেন, তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে।

দেহরক্ষী শুভব্রত চক্রবর্তীর অপমৃত্যু

শুভেন্দু অধিকারীর সাবেক দেহরক্ষী শুভব্রত চক্রবর্তীর মৃত্যুর ঘটনাটি ২০১৮ সালের। তার স্ত্রী সুপর্ণা চক্রবর্তী পুলিশের কাছে নতুন করে এফআইআর দায়ের করলে ২০২১ সালে ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় আসে।

২০১৮ সালের ১৩ অক্টোবর সকালে পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথিতে শুভেন্দু অধিকারীর বাড়ির (শান্তিকুঞ্জ) উল্টোদিকে পুলিশ ব্যারাকে শুভব্রত চক্রবর্তীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। তার মাথায় গুলির ক্ষত ছিল। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে পরদিন তার মৃত্যু হয়। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, শুভব্রত নিজের সার্ভিস রিভলভার দিয়ে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। তিনি রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের কর্মী ছিলেন এবং শুভেন্দু অধিকারী সংসদ সদস্য হওয়ার সময় থেকেই তার নিরাপত্তা দলের সদস্য ছিলেন।

শুভব্রত চক্রবর্তীর স্ত্রী সুপর্ণা চক্রবর্তী ২০২১ সালে কাঁথি থানায় নতুন করে অভিযোগ করেন। তিনি দাবি করেন, তার স্বামীর মৃত্যু আসলে কোনো ‘গভীর ষড়যন্ত্র’ বা হত্যাকাণ্ড হতে পারে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, গুলি লাগার পর তাকে কলকাতায় স্থানান্তরিত করতে কেন দীর্ঘ সময় দেরি করা হয়েছিল। সুপর্ণা দাবি করেছিলেন, শুভেন্দু অধিকারী প্রভাবশালী হওয়ার কারণে তিনি আগে অভিযোগ করার সাহস পাননি।

প্রসঙ্গত, শুভেন্দু অধিকারী ১৯৯৫ সালে ভারতীয় কংগ্রেসের টিকিটে কাঁথি পৌরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ২০০০ সালের দিকে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। এই দলের হয়েই তিনি ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলান। ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর তিনি তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন।

২০২১ সালে রাজ্য গোয়েন্দা সংস্থা এই মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে। তদন্তের খাতিরে শুভেন্দু অধিকারীকেও তলব করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি হাজিরা এড়িয়ে যান এবং একে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে অভিহিত করেন]। পরে কলকাতা হাইকোর্ট এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্থগিতাদেশ জারি করেন এবং শুভেন্দুর বিরুদ্ধে এই মামলায় কোনো কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ার নির্দেশ দেন।

পুলক লাহিড়ীকে নিয়ে রহস্য

শুভেন্দুর সহযোগীদের মধ্যে রহস্যময় মৃত্যুর তালিকায় যুক্ত করা হয় পুলক লাহিড়ীর নামও। সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হয়, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে শুভেন্দু অধিকারীর হয়ে গণনার কাজে যুক্ত (কাউন্টিং এজেন্ট) ছিলেন পুলক লাহিড়ী। নির্বাচনে শুভেন্দুর জয়ের পর পুলকের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। দাবি করা হয়, এটি একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু ছিল যা ভোট-পরবর্তী সহিংসতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে মূলধারার কোনো সংবাদমাধ্যমে এ সংক্রান্ত কোনো খবর পাওয়া যায় না। ফলে এই হত্যাকাণ্ড আসলেই ঘটেছিল কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।

ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথ খুন

গত বুধবার (৬ মে) রাতে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের দোহারিয়া এলাকায় খুন হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারীর বযাক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথ। জানা যায়, মোটরসাইকেলে করে এসে কয়েকজন দুর্বৃত্ত গুলি করে পালিয়ে যায়। চন্দ্রনাথের পাশাপাশি গুরুতর জখম হয়েছেন গাড়িচালক এবং আরও একজন সহযোগী। অভিযোগ উঠেছে, দুর্বৃত্তরা চন্দ্রনাথের মাথায় গুলি করে। ওই অবস্থায় প্রায় এক কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে চালক তাকে নিয়ে যান মধ্যমগ্রামের বিভা সিটি মাল্টি স্পেশালিটি হাসপাতালে। সেখানে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।

শুভেন্দুর দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রাজনীতির যোগসূত্র থাকতে পারে।

গ্রেফতারি বা সাজার নজির নেই

শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ মানুষদের মধ্যে এসব অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় আজ অবধি কেউ গ্রেফতার হননি। কারও সাজা হওয়ারও নজির নেই।

তবে শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, কয়েকদিনের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করতে চলেছে বিজেপি। এরপর যেন কেউ বিচারহীন না থাকে, তার ব্যবস্থা করা হবে।

সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, টাইমস অব ইন্ডিয়া, আনন্দবাজার পত্রিকা
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।