যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিতর্ক

চ্যাটজিপিটির বিরুদ্ধে কি হত্যা মামলা হতে পারে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬:৫৯ পিএম, ১১ মে ২০২৬
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) চ্যাটবট চ্যাটজিপিটির লোগো/ ছবি: এএফপি
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের টাম্পা বে এলাকায় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের ক্ষতবিক্ষত ও টুকরা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ওই ঘটনার তদন্ত ঘিরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) চ্যাটবট, বিশেষ করে চ্যাটজিপিটির ভূমিকা, দায় ও এটির বিরুদ্ধে হত্যা বা ফৌজদারি মামলা হতে পারে কি না, তা নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থীর সন্দেহভাজন খুনি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়টির আরেক সাবেক শিক্ষার্থী হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি হত্যার শিকার পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের রুমমেট ছিলেন। খুন হওয়া অন্য শিক্ষার্থীর নাম নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি।

তদন্ত কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার আগে সন্দেহভাজন খুনি আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটির কাছে মরদেহ আবর্জনা ফেলার কালো রঙের পলিথিনে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার উপায়সহ নানা তথ্য জানতে চেয়েছিলেন। চ্যাটজিপিটির কাছে আবুঘরবেহর এসব প্রশ্নের সূত্র ধরেই পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করেছে।

এই বিতর্কের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রশ্ন উঠেছে- কোনো অপরাধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার বা চ্যাটজিপিটির মতো প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে কি ফৌজদারি মামলা করা সম্ভব? নাকি দায় কেবল মানুষেরই?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক মামলা হলেও সেগুলোর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

এর আগে নির্গমন জালিয়াতি কেলেঙ্কারিতে জার্মান গাড়ি নির্মাতা ভক্সওয়াগেনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। একইভাবে প্রদাহনাশক ওষুধ ‘বেক্সট্রা’ প্রচারের ঘটনায় ফাইজারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এছাড়া আলাস্কায় এক্সন ভালদেজ তেল দূষণের ঘটনাতেও এক্সনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।

তবে এসব ঘটনার প্রতিটিতেই মানুষের সরাসরি সিদ্ধান্ত জড়িত ছিল। সেখানে নির্বাহী কর্মকর্তা, বিক্রয়কর্মী বা প্রকৌশলীরা সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কিংবা নিয়ম ভেঙেছিলেন।

কিন্তু বিতর্কিত ‘ইকনার’ মামলাটি ভিন্ন। আর এই ভিন্নতাই মামলাটিকে আইনি দিক থেকে জটিল করে তুলেছে।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে গুলি চালিয়ে দুজনকে হত্যা করেন ফিনিক্স আইকনার। এ ঘটনায় আরও ছয়জন আহত হন। নিজের ক্যাম্পাসে গিয়ে গুলি চালানোর আগে আইকনারও চ্যাটজিপিটির সঙ্গে একজনের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক ম্যাথিউ টকসন বলেন, শেষ পর্যন্ত এটি এমন একটি পণ্য, যা ওই অপরাধকে উৎসাহিত করেছে এবং অপরাধ সংঘটনে ভূমিকা রেখেছে। এ কারণেই এই মামলাটি এতটা ব্যতিক্রমী ও জটিল।

বার্তা সংস্থা এএফপির সঙ্গে কথা বলা আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে সম্ভাব্য অভিযোগ হতে পারে ‘অবহেলা’ বা ‘বেপরোয়া আচরণ’।

এর মধ্যে বেপরোয়া আচরণ বলতে বোঝায়- পরিচিত ঝুঁকি বা নিরাপত্তাজনিত দায়িত্ব জেনেও সেগুলো উপেক্ষা করার ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত। তবে এসব অভিযোগ সাধারণত গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের বদলে লঘু অপরাধ বা মিসডিমিনার হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে দোষী সাব্যস্ত হলেও সাজা তুলনামূলক কম হতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন মামলা প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন। ম্যাথিউ টকসনের ভাষায়, যেহেতু এটি একেবারেই নতুন ধরনের বিষয়, তাই আরও শক্তিশালী ও স্পষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন হবে। যেমন- প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নথিতে যদি দেখা যায়, তারা ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে জানত কিন্তু সেগুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।

তিনি আরও বলেন, তাত্ত্বিকভাবে এমন নথি ছাড়াও দায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তা খুবই কঠিন হবে।

ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক ব্র্যান্ডন গ্যারেট বলেন, ফৌজদারি আইনে প্রমাণের মানদণ্ড অনেক বেশি কঠোর। তার ভাষায়, এখানে প্রসিকিউটরদের সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণ করতে হয়।

অন্যদিকে, ওপেনএআই দাবি করেছে, টাম্পা বে কিংবা অন্যান্য হামলার ঘটনায় চ্যাটজিপিটির কোনো দায় নেই। প্রতিষ্ঠানটি এক বিবৃতিতে বলেছে, আমরা ক্ষতিকর উদ্দেশ্য শনাক্ত করা, অপব্যবহার সীমিত করা এবং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি দেখা দিলে যথাযথভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে আমাদের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়মিত শক্তিশালী করছি।

ফৌজদারি নাকি দেওয়ানি মামলা?

যারা জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চান, তাদের জন্য দেওয়ানি মামলা হয়তো বেশি কার্যকর পথ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ম্যাথিউ টকসন বলেন, এ ধরনের মামলা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে আরও সতর্কভাবে পণ্য তৈরি করতে বাধ্য করতে পারে। অন্তত ভুলের মানবিক মূল্য নিয়ে তাদের ভাবতে বাধ্য করবে।

যুক্তরাষ্ট্রে এরই মধ্যে এআই প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে একাধিক দেওয়ানি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে অনেক মামলাই আত্মহত্যার ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এখন পর্যন্ত কোনো মামলায় প্রযুক্তি কোম্পানির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় হয়নি।

গত ডিসেম্বরে সুজান অ্যাডামস নামের এক নারীর পরিবার ক্যালিফোর্নিয়ার আদালতে ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে। তাদের অভিযোগ, কানেকটিকাটের ওই অবসরপ্রাপ্ত নারীকে তার নিজের ছেলে হত্যার ঘটনায় চ্যাটজিপিটির ভূমিকা ছিল।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চ্যাটজিপিটির নতুন সংস্করণগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়া ভিকটিমস ল’ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা আইনজীবী ম্যাথিউ বার্গম্যান বলেন, আমি বলছি না যে বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থা যথেষ্ট। কিন্তু আগের তুলনায় এখন আরও বেশি সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামান্য সাজা হলেও কোনো ফৌজদারি দণ্ড প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ধরনের সুনামহানির কারণ হতে পারে।

ম্যাথিউ টকসন বলেন, এতে বড় ধরনের সুনামগত ক্ষতি হতে পারে। তবে ব্র্যান্ডন গ্যারেট মনে করেন, বিচ্ছিন্ন ফৌজদারি মামলা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত যে কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেটিই আসল সমস্যা। গ্যারেটের ভাষায়, কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামোই হবে অনেক বেশি যৌক্তিক ও কার্যকর ব্যবস্থা।

সূত্র: এবিএস-সিবিএন

এসএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।