তাহলে যুদ্ধই কি ট্রাম্পের জীবন?

মো: শাহিন মিয়া
মো: শাহিন মিয়া মো: শাহিন মিয়া
প্রকাশিত: ০৪:১৪ পিএম, ১২ মে ২০২৬

বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র একটি যুদ্ধবাজ দেশ হিসেবে পরিচিত। কারণ সব যুদ্ধেই দেশটি হয় সরাসরি জড়িত না হয় পরোক্ষভাবে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে ইরান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চলা সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও ভয়াবহ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও রয়েছে দেশটির সরাসরি উসকানি। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া কোথায় নেই তাদের যুদ্ধবাজনীতি। এমনকি গাজায় সম্প্রতি ৭০ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যার ক্ষেত্রেও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশ্য সহযোগিতা। ইসরায়েলের মতো দখলদার দেশকে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থ ও সামরিক সহায়তা দেওয়া দেশটি নিয়ে সমালোচনার যেন কোনো শেষ নেই।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে আশার আলো দেখছিল বিশ্ব। দ্বিতীয়বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে নির্বাচনি প্রচারণায় যুদ্ধবিরোধী অবস্থান প্রকাশ করেন তিনি। এক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে জড়ানো নিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সমালোচনাও করেন তিনি। ঘোষণা দেন রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলা যুদ্ধ ক্ষমতায় আসার এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি বন্ধ করে দেবেন। কিন্তু তার সেই ঘোষণা সফলতার মুখ আজও দেখা যায়নি। তাছাড়া কবে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। এক্ষেত্রে ট্রাম্প যে মধ্যস্থতার কথা বলে আসছেন তাও এখন প্রায় অকার্যকর।

শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ নয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন দ্বিরাষ্ট্রেরভিত্তিতে গাজা সমস্যার সমাধান ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য বিভিন্ন দেশের সমন্বয়ে তিনি বোর্ড অব পিস নামে একটি কমিটিও গঠন করেন। তবে তার এই কোনো পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত আশার আলো দেখছে না। বরং পরিস্থিতি ক্রমেই আরও জটিল হয়ে উঠছে।

বিশ্বের চলমান অস্থিতিশীলতার মধ্যেই তিনি ইসরায়ের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর উসকানিতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেন। যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে নিয়ে এলেন। এখন এই সংকট শুধু অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে। দুই পক্ষের অবরোধের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এখন কার্যত অচল। বিশ্বের যেই প্রণালি দিয়ে ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয় সেই লাইনে এখন যুদ্ধ পরিস্থিতি।

এখন চাইলেও তিনি এই যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসতে পারছেন না। আবার যুদ্ধও চালিয়ে যেতে পারছেন না, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে সমালোচনা।

ট্রাম্প এখন নিজেরই তৈরি দুটি বড় ফাঁদে আটকে আছেন—একটি ভূরাজনৈতিক, অন্যটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব এবং শান্তি প্রস্তাব না মানার অবস্থান তাকে এমনভাবে আটকে রেখেছে যে, গ্রহণযোগ্য সামরিক মূল্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।

এদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ বাড়ছে। ৩০ শতাংশের ঘরে নেমে আসা জনপ্রিয়তা, গ্যাসের দাম গড়ে ৪ দশমিক ৫০ ডলারের বেশি এবং যুদ্ধবিরোধী জনমত বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক সুযোগও কমে যাচ্ছে।

মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য উপেক্ষা করে ২০২৫ সালের ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এরপর ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন ইরানের পারমাণাবিক সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বেশ কয়েকবার এই দাবি করেন। যদিও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার এই দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক তথ্য দিয়ে আসছে। এই হামলা এমন এক সময় করা হয় যখন ইরানের সঙ্গে দেশটির আলোচনা চলছিল। ওমানে যখন পঞ্চম দফায় আলোচনা চলছিল তখন ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বিত এই হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

এরপর আবারও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হলেও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়াতে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কিছু শীর্ষ জেনারেল নিহত হন।

হামলার পর ট্রাম্প জানান, ইরানের সরকার পরিবর্তন ও পারমাণবিক এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের জন্য এ হামলা চালানো হয়। এরপর তার প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয় যত দিনে এই লক্ষ্য অর্জিত না হবে ততদিন এই হামলা চলবে। তবে কোনো লক্ষ্য অর্জন না করেই প্রায় ছয় সপ্তাহ পর ১৫ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন ট্রাম্প। ভঙ্গুর এই যুদ্ধবিরতি এখনো চলছে।

তবে যুদ্ধবিরতির আগে ও পরে ট্রাম্প বেশ কয়েকবার বলেন, ইরান যদি চুক্তি করতে রাজি না হয় তাহলে দেশটি ধ্বংস করে দেওয়া হবে। বিশ্বের মানচিত্র থেকে অদৃশ্য করে দেওয়া হবে। এমনকি তিনি এও বলেছেন যে ইরানের পুরো সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলা শান্তি আলোচনার কোনো সুফলও দেখা যাচ্ছে না। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এখনো পারমাণবিক ও হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছে না। দুই দেশের পক্ষ থেকে এখনো পাল্টাপাল্টি হুমিক দেওয়া হচ্ছে। প্রায়ই হরমুজ প্রণালিতে ঘটছে সংঘর্ষ, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অস্থিতিশীল করছে।

চলতি বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। কিন্তু মনে করা হচ্ছে এই নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারেন ট্রাম্প। এমনকি একপর্যায়ে তিনি অভিশংসনের মুখেও পড়তে পারেন। ফলে ইরান যুদ্ধে জয় নিয়ে ফেরার বিকল্প ট্রাম্পের কাছে খুবই কম। এক্ষেত্রে তার পক্ষে দুটি দিক খোল। একটি হলো ফের যুদ্ধ শুরু করা আরেকটি হলো ভালো চুক্তি করা। তবে ফের যুদ্ধ হলে কীভাবে কখন তা শেষ হবে তার স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। তাছাড়া ফের যুদ্ধ শুরু করতে প্রয়োজন হতে পারে কংগ্রেসের অনুমোদন, যা ট্রাম্প পাবেন না বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে চুক্তির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দিতে নারাজ ইরান।

সবশেষ বার্তায় ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান যে প্রস্তাব দিয়েছে তা অগ্রহণযোগ্য। তিনি দাবি করেন, চলমান যুদ্ধবিরতি এখন লাইফ সাপোর্টে। অর্থাৎ তিনি আবারও ইরানে হামলার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

শান্তি ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ট্রাম্প যে শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে জাড়িয়েছেন তা নয়। তিনি প্রতিবেশীদেশগুলোর সঙ্গেও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছেন। এরই মধ্যে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তুলে নিয়ে গেছে মার্কিন বাহিনী। কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করেই রাতের আঁধারে তাকে তুলে নেওয়া হয় শুধু যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান নেওয়ার কারণে। এর আগে ভেনেজুয়েলার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়।

ভেনেজুয়েলার পর ট্রাম্প হুমকি দেন কিউবার সরকারকে। এরই মধ্যে নানান ধরনের অবরোধ আরোপ করে কিউবায় সংকট তৈরি হয়েছে। তবে কিউবার পক্ষে রাশিয়ার শক্ত অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে।

ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প যে শুধু শত্রুদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন তা নয়, দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্রদেরও তিনি লক্ষ্যবস্তু করেছেন। প্রতিবেশী দেশ কানাডাকে তিনি করতে চেয়েছেন মার্কিন অঙ্গরাজ্য। আবার ইউরোপের অংশ গ্রিনল্যান্ড করতে চেয়েছেন দখল। এক্ষেত্রে তিনি শক্তি প্রয়োগের বিষয়কেও উড়িয়ে দেননি। বলেছেন আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে শক্তি প্রয়োগ করা হবে। পরে অবশ্য ইউরোপীয় নেতাদের ক্ষোভের মুখে পড়ে পিছু হটেন ট্রাম্প।

তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করা প্রেসিডেন্টও ট্রাম্প। এর আগে চীন ও রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হলেও এবার তিনি মিত্র দেশগুলোকেও ছাড় দেননি। যদিও তার এই শুল্কনীতি এরই মধ্যে মার্কিন আদালত বাতিল করেছে। তবে ট্রাম্পের শুরু করা বাণিজ্য যুদ্ধের শঙ্কা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

ইতালির ফ্যাসিবাদী নেতা মুসোলিনির একটি বিখ্যাত উক্তি আছে ‘যুদ্ধই জীবন, যুদ্ধই সর্বজনীন’। তাহলে এখন প্রশ্ন উঠছে ট্রাম্পের জীবনও কি যুদ্ধময় হয়ে উঠছে।

এমএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।