ঘড়ির কাঁটা নয়, গ্যাস-বিদ্যুতের সময়সূচিতে চলছে পাকিস্তানিদের জীবন
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে পাকিস্তানে ভয়াবহ গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। দেশটির বড় শহরগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্যাস না থাকায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। রান্না, খাবার গরম করা, ব্যবসা পরিচালনা, এমনকি ঘুম ও পড়াশোনার সময়ও এখন নির্ভর করছে গ্যাস কখন আসবে তার ওপর।
এই পরিস্থিতিতেও সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন দেশটির নারীরা। অনেককে ভোরে উঠে দ্রুত রান্না শেষ করতে হচ্ছে, আবার অনেক পরিবার বাধ্য হচ্ছে রাতের খাবারের সময় এগিয়ে আনতে। জ্বালানি সংকটের এই প্রভাব এখন পাকিস্তানের ঘর থেকে ছোট ব্যবসা- সবখানেই স্পষ্ট।
৬০ বছর বয়সী ফরহাত কুরেশি সারা জীবন রান্না করেছেন সময়ের দিকে না তাকিয়েই। কিন্তু এখন তার প্রতিটি সকাল শুরু হয় একটাই প্রশ্ন দিয়ে- গ্যাস কখন আসবে, আর সেটি চলে যাওয়ার আগেই কতটা রান্না শেষ করা যাবে?
পাকিস্তানের করাচিতে তার বাসার রান্নার গ্যাস দিনে কয়েকটি ছোট ছোট সময়ের জন্য আসে- সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায়। সেই সময়ের মধ্যে রান্না শেষ করতে না পারলে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। খাবার গরম করতে দেরি হয়, পরিকল্পনা বদলাতে হয়, রান্নাঘরের কাজ থমকে থাকে।
আল জাজিরাকে কুরেশি বলেন, আমার পুরো জীবনে এমন পরিস্থিতি আমি কখনো দেখিনি। এখন আমার পুরো সকালটাই গ্যাসকে ঘিরে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালানোর পর থেকেই পাকিস্তানের জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে। আগে যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) উদ্বৃত্ত ছিল, সেটিই এখন ঘাটতিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২০২১ সালে পাকিস্তানের এলএনজি আমদানি ছিল ৮ দশমিক ২ মিলিয়ন টন। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তা কমে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১ মিলিয়ন টনে।
ইরান যুদ্ধ এমন এক জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে, যা বহু বছর ধরেই দুর্বল হয়ে পড়ছিল। পাকিস্তান তার দৈনিক গ্যাস চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে। তবে সেগুলোর উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে। সেই ঘাটতি পূরণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হয় দেশটিকে। পাকিস্তানের প্রায় সব এলএনজি আসে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। আমদানি করা এই গ্যাস দিয়েই দেশটির প্রায় এক-চতুর্থাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এলএনজি সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে যায়। পাকিস্তানের অয়েল অ্যান্ড গ্যাস রেগুলেটরি অথরিটি (ওজিআরএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের শুরুর দিকে পাকিস্তান প্রতি মাসে আট থেকে ১২টি এলএনজি চালান পেত। কিন্তু মার্চ মাসে মাত্র দুটি চালান পৌঁছায়।
তবে গত সপ্তাহান্তে কাতারের একটি এলএনজি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পাকিস্তানের দিকে যাত্রা করে। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই ছিল প্রথম এমন যাত্রা।
নারীদের কাঁধে বাড়তি চাপ
পাকিস্তানের সাধারণ পরিবারগুলো এই জ্বালানি সংকটের প্রভাব অনুভব করছে ভিন্নভাবে। বিশেষ করে নারীদের জীবনে এর প্রভাব আরও গভীর। এখন তাদের আরও ভোরে উঠতে হচ্ছে, দ্রুত রান্না করতে হচ্ছে, খাবারের সময় বদলাতে হচ্ছে, বিশ্রাম পিছিয়ে দিতে হচ্ছে এবং পুরো দিনের পরিকল্পনাই করতে হচ্ছে গ্যাস কখন আসবে, তার ওপর নির্ভর করে।
ফরহাত কুরেশির জীবনযাত্রাও পুরোপুরি বদলে গেছে। তিনি স্বামী ও দুই সন্তানসহ চারজনের জন্য একাই রান্না করেন। ফলে গ্যাসের সময়সূচিই এখন তার পুরো দিনের কেন্দ্রবিন্দু। তার কাছে রান্না এখন আর স্বাভাবিক কাজ নয়, বরং বাধ্যতামূলক কয়েকটি ভাগে বিভক্ত শ্রম।
করাচির বেশিরভাগ বাসায় সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত, দুপুরের দিকে প্রায় দুই ঘণ্টা ও সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত গ্যাস পাওয়া যায়। শুনতে সময়টা সহনীয় মনে হলেও বাস্তবে গ্যাসের চাপ এত কম থাকে যে রান্না করতে অনেক বেশি সময় লাগে।
কুরেশি বলেন, সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় হলো, নির্ধারিত সময়েও অনেক সময় গ্যাস আসে না। এভাবে বেঁচে থাকাটা খুব ক্লান্তিকর। সন্ধ্যায় আমি পরিবারকে সময় দিতে চাই, ঘরের অন্য কাজ করতে চাই। কিন্তু গ্যাস আসে সন্ধ্যা ৬টায়। তাই তখন সব কাজ দ্রুত শেষ করতে হয়।
২০২৪ সালে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) এক নীতিপত্রে বলা হয়, পাকিস্তানে বিনা পারিশ্রমিকের গৃহস্থালি কাজের বড় অংশই নারীরা করেন। রান্না ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো দৈনন্দিন কাজকে অর্থনৈতিক কাজ হিসেবে ধরা হয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা প্রতিদিন গড়ে তিন ঘণ্টা এমন অবৈতনিক কাজে ব্যয় করেন, যার সবচেয়ে বড় অংশ রান্নাঘরে কাটে।
‘আমরা ঠিকমতো খাবারও খেতে পারছি না’
২৪ বছর বয়সী শিক্ষিকা লাইবা জাহিদ বলেন, এখন তার পুরো দিনটাই গ্যাসের সময় অনুযায়ী ভাগ হয়ে গেছে। আমাদের রাতের খাবারের সময় নির্ধারিত। আমাদের তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেতে হয়। কারণ রাত ৯টার পর গ্যাসের চাপ অনেক কমে যায়। রাত সাড়ে ৮টার মধ্যেই নিশ্চিত করতে হয় যে রান্না শেষ হয়েছে।
দুপুর ২টার দিকে কাজ থেকে বাসায় ফেরেন লাইবা। এরপর গ্যাস চলে যাওয়ার আগে দ্রুত খাবার গরম করতে হয় তাকে।
তিনি বলেন, না হলে গ্যাস চলে যাবে। তখন মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করতে হবে। কিন্তু এতে খাবার খুব শুকিয়ে যায়। মনে হয় যেন ঠিকমতো খাবারই খেতে পারছি না।
চায়ের মতো ছোট্ট দৈনন্দিন স্বস্তিও এখন গ্যাসের সময়সূচির ওপর নির্ভর করছে। আগে বিকেলে নিয়মিত চা খেতেন লাইবা। এখন তিনি বলেন, চা যেন আমার জীবন থেকেই হারিয়ে গেছে। তার মতে, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে ঘুম ও বিশ্রামের।
লাইবা বলেন, আমার পুরো রুটিনটাই এখন গ্যাসের সময় নিয়ন্ত্রণ করছে। কখন নাশতা, দুপুরের খাবার বা রাতের খাবার খাব- সবকিছু সেটাই ঠিক করছে। এমনকি কখন বাইরে যাবেন, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করবেন বা বাজার করবেন, সেটিও গ্যাসের সময় অনুযায়ী ঠিক করতে হয়।
তিনি বলেন, বাইরে খাওয়া যায় ঠিকই। কিন্তু পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে প্রতি সপ্তাহে সেটা সম্ভব নয়।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পাকিস্তান এনার্জি সার্ভে অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটির অর্ধেকেরও কম পরিবারের কাছে পরিচ্ছন্ন রান্নার জ্বালানি পৌঁছেছে, যদিও বিদ্যুতের সুবিধা পাওয়া পরিবারের সংখ্যা অনেক বেশি।
জরিপে বলা হয়, জাতীয়ভাবে ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার কম দূষণকারী পরিচ্ছন্ন জ্বালানির চুলা ব্যবহার করে। ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে এবং ৫ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার এলপিজি ব্যবহার করে। শহরাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রান্নার জ্বালানি পাইপলাইনের গ্যাস, আর উচ্চমূল্যের কারণে এলপিজি মূলত বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ঘরই যখন কর্মস্থল
এই জ্বালানি সংকট শুধু ঘরের রান্নায় নয়, ছোট ব্যবসাতেও বড় প্রভাব ফেলছে। ফাতিমা হাফিজ নামের এক নারী বাসা থেকেই দুপুরের খাবারের ব্যবসা চালান। পাইপলাইনের গ্যাস না থাকলে তাকে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হয়।
তিনি বলেন, কখনো কখনো অর্ডার বাতিল করতে হয়। কারণ সিলিন্ডারে রান্না করা খুব ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। লোডশেডিং আর গ্যাস সংকট আমাকে খুব ভোগাচ্ছে।
গ্যাসের সময় অনুযায়ী তাকে খুব ভোরে কাজ শুরু করতে হয়। অনেক সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। হাফিজ বলেন, বিদ্যুৎও না থাকে, গ্যাসও না থাকে, তখন জেনারেটরও চালানো যায় না। কারণ সেটাও গ্যাসে চলে। আমরা ইউপিএস বসিয়েছি, কিন্তু সেটি চার্জ দিতে বিদ্যুৎ দরকার।
তার মতে, অর্ডার বাতিল করাও ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, কারও অর্ডার নিলে তাকে অসন্তুষ্ট করা ঠিক নয়। সময়মতো ডেলিভারি না দিলে ভালো দেখায় না।
৪৭ বছর বয়সী শাবানা হাসান বাসা থেকে ছোট একটি বিউটি পার্লার চালান। তার কাছে সংকটটি শুধু গ্যাস নয়, বিদ্যুতেরও। তিনি বলেন, লোডশেডিং এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকলে আমি এমন হেয়ারস্টাইল করার চেষ্টা করি, যেগুলোতে বৈদ্যুতিক যন্ত্র লাগে না।
কিন্তু এতে তার ব্যবসায় প্রভাব পড়ছে। বাসায় সৌরবিদ্যুৎ থাকলেও সেটি পুরো সমাধান নয়। বলেন, স্ট্রেইটনার বা কার্লিং রডের মতো বৈদ্যুতিক যন্ত্র সৌরবিদ্যুতে চালানো যায় না।
‘আমরা অন্য কিছু ভাবতেই পারছি না’
করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিমালাহ জাফর বকাইয়ের কাছে এই সংকটের মানে হলো- তিনি দিনে কত ঘণ্টা পড়াশোনা বা ঘুমাতে পারছেন।
মনোবিজ্ঞানের ২২ বছর বয়সী এই শিক্ষার্থী বলেন, আমার পুরো রুটিন এখন দুটি জিনিসকে ঘিরে- গ্যাস আর লোডশেডিং। তিনি বলেন, সারাদিন আমি পরিবারকে জিজ্ঞেস করি- গ্যাস আছে? কখন আসবে? কখন যাবে? আমরা অন্য কিছু ভাবতেই পারছি না।
ফরহাত কুরেশি স্মরণ করেন সেই সময়ের কথা, যখন গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ছিল, রান্নার জন্য আলাদা পরিকল্পনা করতে হতো না। দুপুরের আগেই দিনের রান্না শেষ হয়ে যেত। এখন তার ভাষায়, একটানা কাজ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আমাদের দৈনন্দিন জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যক্তিগত জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর স্বাভাবিকভাবেই পরিশ্রম অনেক বেড়ে গেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
এসএএইচ