নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব
অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্র নেপালে শনিবারের ভূমিকম্পে দেখা দিয়েছে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়। মৃত মানুষের সারিতে এখনও যোগ হচ্ছে নতুন মরদেহ। আর বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে আশ্রয় নিয়েছে খোলা আকাশের নিচে। তবে, কিছুটা হলেও আশার কথা বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলো দ্রুতই সহায়তা নিয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সাগরমাতা নেপালের। এর মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত থেকে ইসরায়েল পর্যন্ত।
এতবড় বিপর্যয় মোকাবেলায় হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত বিশ্বের দরিদ্রতম এই দেশটির সক্ষমতা খুবই সামান্য। দেশটির সেনাবাহিনীর একটি মাত্র বড় হেলিকপ্টার আছে। এ উদাহরণটিই তাদের অসহায় অবস্থা বোঝানোর জন্য যথেষ্ট।
ভারত চটজলদি সেখানে পাঠিয়েছে হেলিকপ্টার, বড় একটি বিমানে করে চিকিৎসকসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠিয়েছে ইসরায়েল, মালয়েশিয়াও নেপালে এরই মধ্যে পাঠিয়েছে উদ্ধারকর্মী দল, পাঠানো হচ্ছে চিকিৎসক দলও।
ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা এরই মধ্যে তিন হাজার ছাড়িয়েছে। অথচ এখনো ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কিছু এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ করাই সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা।
২৫ এপ্রিল দুপুরে ৭ দশমিক ৯ মাত্রায় ওই ভূমিকম্পের পর সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত।
ভারত ভূমিকম্পের চার ঘণ্টার মধ্যেই তাদের বিমান বাহিনীর একটি সুপার হারকিউলিস এয়ারক্রাফ্টে করে জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলা বাহিনীর সদস্যদের সেখানে পাঠিয়ে দেয়।
এখন পর্যন্ত ভারত সরকার তাদের দুর্যোগ মোকাবেলা বাহিনীর ২৮৫ জন সদস্যকে নেপালে পাঠিয়েছে। সেইসঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তিনটি ভ্রাম্যমান হাসপাতাল ও বেসরকারি চিকিৎসকদেরও সেখানে পাঠানো হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, নেপালে উদ্ধার কাজে অংশ নেয়ার জন্য ১৩টি সামরিক বিমান এবং এয়ার ইন্ডিয়া ও জেট এয়ারওয়েজের তিনটি বেসামরিক বিমান পাঠানো হয়েছে।
এছাড়া, ছয়টি এমআই-সেভেনটিন হেলিকপ্টার ও দুইটি এডভান্সড লাইট হেলিকপ্টার উদ্ধার কাজে অংশ নিচ্ছে। ভূমিকম্পের কারণে যেসব স্থানে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে ওই সব স্থানে উদ্ধার কাজে হেলিকপ্টারগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। আরো দুইটি এমআই-সেভেনটিন হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ত্রাণ হিসেবে ভারত সরকার ১০ টন কম্বল, ৫০ টন পানি, ২২ টন খাবার ও দুই টন চিকিৎসা সামগ্রী কাঠমান্ডুতে পাঠিয়েছে।
চীন: নেপালের উত্তরের প্রতিবেশী চীন ভূমিকম্পের পরদিন ২৬ এপ্রিল উদ্ধার কাজে অংশ নেয়ার জন্য ৬২ সদস্যদের একটি দল কাঠমান্ডু পাঠিয়েছে।
এছাড়া, চীন সরকার ৩৩ লাখ মার্কিন ডলার অর্থ সাহায্য দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, তারা নেপালে জরুরি আশ্রয়, কাপড়, কম্বল ও জেনারেটর পাঠাবে।
চীনের প্রধানমন্ত্রী শি জিংপিং এব বিবৃতিতে বলেন, “চীন সরকার নেপাল সরকারকে দুর্যোগ মোকাবেলায় সব ধরণের জরুরি সাহায্য দিতে আগ্রহী।”
পাকিস্তান: পাকিস্তান উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে অংশ নেয়ার জন্য তাদের বিমান বাহিনীর চারটি বিমান নেপালে পাঠিয়েছে। ওই বিমানগুলোতে ৩০ শয্যার একটি ভ্রাম্যমান হাসপাতালও আছে।
এছাড়া দুই হাজার প্যাকেট খাবার, বোতলজাত পানি, চিকিৎসা সামগ্রী, দুইশটি তাঁবু, ও ৬০০টি কম্বল পাঠানো হচ্ছে।
পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিস পাবলিক রিলেশনের মহাপরিচালক মেজর-জেনারেল আসিম বাজওয়া বলেন, “রাডার, কংক্রিট কাটার, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরসহ উদ্ধার কাজে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দুর্যোগ মোকাবেলা দলের সদস্যদের নেপালে পাঠানো হয়েছে।”
ইসরায়েল: ভাড়া করা দুইটি উড়োজাহাজে করে ২৬০ সদস্যের একটি উদ্ধারকর্মী দল নেপালে পাঠিয়েছে ইসরায়েল। এছাড়া, ১২২ জন চিকিৎসক, সেবিকা ও প্যারামেডিকদের একজন দল ৯৫ টন মানবিক ত্রাণ ও ওষুধ নিয়ে সেখানে গেছে।
ভুটান: ২৭ এপ্রিল ভোরে ভুটানের ৫৩ সদস্যের উদ্ধারকর্মী দল নেপালের পথে রওয়ানা হয়েছে। এছাড়া শল্যচিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সেবিকা ও টেকনিশিয়ানদের একটি দল শিগগির সেখানে পাঠানো হবে।
জাপান: জাপান সরকার ২৬ এপ্রিল তাদের ৭০ সদস্যের উদ্ধারকর্মীর একটি দল নেপালে পাঠিয়েছে। এছাড়া, দুই লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার সমমূল্যের ত্রাণ সামগ্রী পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
সিঙ্গাপুর: এরই মধ্যে সিঙ্গাপুর দুইটি বিমানে করে ৭৫ সদস্যের এক উদ্ধারকর্মী দল নেপালে পাঠিয়েছে। অন্য একটি দলের ২৭ এপ্রিল রওয়ানা হওয়ার কথা রয়েছে। সিঙ্গাপুর রেড ক্রস নেপালে ত্রাণ কার্যক্রম চালানোর জন্য অর্থ সংগ্রহ করছে। সরকার ওই তহবিলে এক লাখ মার্কিন ডলার দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
মালোয়েশিয়া: ২৬ এপ্রিল মালোয়েশিয়ার ৩০ সদস্যের বিশেষ উদ্ধারকর্মীর একটি দল নেপালে গেছে। এছাড়া ২০ জন চিকিৎসকের একটি দলও নেপাল যাওয়ার অপেক্ষায় আছে। যে বিমানে করে উদ্ধারকর্মীদের দলটি নেপালে গেছে সেটি নেপাল থেকে মালোয়েশিয়ার নাগরিকদের উদ্ধার করার জন্য ত্রিভূবন বিমান বন্দরে অবস্থান করছে।
শ্রীলঙ্কা: কলম্বো ৪৪ জন সেনা সদস্য ও চার জন চিকিৎসকের একটি দল নেপালে পাঠিয়েছে। এছাড়া ১৫৬ সদস্যের উদ্ধার কর্মী ও খাদ্য সামগ্রী পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
যুক্তরাজ্য: যুক্তরাজ্য থেকে আট সদস্যের উদ্ধারকর্মী দল নেপাল গেছে। এছাড়া, জরুরি ত্রাণের জন্য যুক্তরাজ্য সরকার ৩০ লাখ পাউন্ড অর্থসাহায্য দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। রেড ক্রসের মাধ্যমে আরও ২০ লাখ পাউন্ড অর্থসাহায্য দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা: কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র যথাক্রমে ৫০ লাখ ও ১০ লাখ মার্কিন ডলার অর্থসাহায্য দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া, উদ্ধারকর্মী ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের সেখানে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি।
অস্ট্রেলিয়া: অস্ট্রেলিয়া সরকার ৩৯ লাখ মার্কিন ডলার এবং নরওয়ে সরকার ৩৮ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণের অর্থ সাহায্য দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন: জার্মানির বেসরকারি সংস্থা ইন্টারনেশনাল সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ (আইএসএআর) সদস্যরা নেপালে উদ্ধার কাজে অংশ নিচ্ছেন। বেলজিয়াম, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, গ্রিস, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড ও সুইডেন তাদের উদ্ধারকর্মীদের নেপালে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। রেড ক্রসের মাধ্যমে ইতালি তিন লাখ ২৬ হাজার মার্কিন ডলার অর্থ সাহায্য দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
এসআরজে