নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে উপসাগরীয় উত্তেজনা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৫৬ পিএম, ২১ জুলাই ২০১৯

ব্রিটিশ পতাকাবাহী আটক জাহাজকে মুক্ত করে দেয়ার মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তেজনা কমিয়ে আনতে ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। ওমানের জলসীমা থেকে ব্রিটিশ ওই যুদ্ধ জাহাজ ইরান আটক করেছে বলে অভিযোগ করেছে লন্ডন। যুক্তরাজ্য বলছে, এটি সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য।

আটক তেলবাহী এই ব্রিটিশ জাহাজ ছেড়ে দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তেহরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করলেও তাতে কর্ণপাত করছে না ইরান। আটক ওই ব্রিটিশ জাহাজটিতে প্রায় ১৮ জন ভারতীয় ক্রু রয়েছে। ইরানের আঞ্চলিক চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্র যখন আরো সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তার আগেই ব্রিটিশ তেলবাহী জাহাজ আটক করলো তেহরান।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলছে, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন লঙ্ঘনের দায়ে হরমুজ প্রণালী থেকে ব্রিটিশ তেলবাহী জাহাজ স্টেনা ইমপারোকে আটক করা হয়েছে। বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ তেল হরমুজ প্রণালী হয়ে বিভিন্ন দেশে পরিবহন করা হয়; বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সমুদ্রপথ উপসাগরীয় অঞ্চলের এই হরমুজ প্রণালী।

আরও পড়ুন : ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের কায়রোগামী সব ফ্লাইট বাতিল

ইরানি কর্তৃপক্ষ বলছে, ব্রিটিশ ওই জাহাজকে সমুদ্রসীমা লঙ্ঘনের সময় সতর্ক করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপরও সীমা লঙ্ঘন করে একটি মাছ ধরার জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে ব্রিটিশ ওই জাহাজ।

সিরিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের দায়ে জিব্রাল্টার প্রণালীর কাছে দুই সপ্তাহ আগে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত সমুদ্রসীমায় ইরানের ট্যাঙ্কার গ্রেস-১ আটক করে যুক্তরাজ্য। ওই ট্যাঙ্কারকে আরো এক মাস আটকে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন ব্রিটেনের একটি আদালত। আদালতের এই নির্দেশের কয়েক ঘণ্টার মাথায় ব্রিটিশ তেলবাহী জাহাজ আটক করা হয়েছে বলে জানায় ইরান।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাবেদ জারিফের সঙ্গে আটক জাহাজের মুক্তির ব্যাপারে আলোচনা করেছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট। একই সঙ্গে ব্রিটেনের জরুরি প্রতিক্রিয়া কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন হান্ট। এই বৈঠকের পর তিনি বলেন, জাহাজ আটকের এই ঘটনাকে তারা ঢিলের বিনিময়ে পাটকেল পরিস্থিতি হিসেবে দেখছেন।

আরও পড়ুন : ইয়েমেন যুদ্ধ : বিপত্তিতে প্রিন্স সালমান

জেরেমি হান্ট বলেন, গ্রেস-১ কে বৈধভাবেই আটক করা হয়েছে। কিন্তু সেন্টা ইমপারোকে ওমানি জলসীমা থেকে আটক করেছে ইরান; যা পরিষ্কার আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের লঙ্ঘন। পরে এটিকে ইরানে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এটা সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য।

ব্রিটিশ এই ট্যাঙ্কার ছেড়ে দিতে ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জার্মানি এবং ফ্রান্স। ব্রিটিশ এই জাহাজ আটকের ঘটনাকে ইরানের ‘বিপজ্জনক আগ্রাসন’ বলে মন্তব্য করেছে বার্লিন; যা ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালীতে মারাত্মক উত্তেজনা তৈরি করেছে।

এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আমি ইরান সম্পর্কে যে সমস্যার কথা বলে আসছি, শুক্রবারের ঘটনা তারই প্রতিফলন। ইরান : সমস্যা, সমস্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু ইরান বেপরোয়া অবস্থানে আছে। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাবেদ জারিফ বলেছেন, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ীই ইরান ব্যবস্থা নিয়েছে। একমাত্র ইরানই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে।

গত মে মাস থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মাঝে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। গত মাসে মার্কিন একটি ড্রোন ইরান ভূপাতিত করার জেরে তেহরানে বিমান হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রতি নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সামরিক বাহিনী হামলা শুরুর মাত্র ১০ মিনিট আগে সেই নির্দেশ বাতিল করেন তিনি।

আরও পড়ুন : ৪২ মিনিটে ৫০০০ মিটার দৌড়ের রেকর্ড ৯৬ বছরের বৃদ্ধের

উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদি আরব ও আমিরাতের তেলবাহী ট্যাঙ্কারে বেশ কয়েকটি হামলায় ইরান জড়িত বলে অভিযোগ করে যুক্তরাষ্ট্র। ইরান বলছে, হরমুজ প্রণালীর কাছে থেকে আটক ব্রিটিশ তেলবাহী জাহাজ নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে তারা। ব্রিটিশ ওই জাহাজ আটকের একটি ভিডিও ফুটেজও প্রকাশ করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী।

উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে ঠিক সেই সময় সৌদি আরব ঘোষণা দিয়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকশ’ সৈন্য নতুন করে সৌদিতে আসছে। পেন্টাগন বলছে, ওই অঞ্চলে আমাদের সামরিক বাহিনী ও স্বার্থের ওপর আসন্ন হুমকি মোকাবেলায় সৌদিতে নতুন করে সৈন্য মোতায়েন করা হচ্ছে। আমাদের স্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই প্রধান লক্ষ্য।

উপসাগরীয় অঞ্চলের এই উত্তেজনায় নতুন করে মোড় নেয় এক বছর আগে। ওই সময় ইরানের সঙ্গে ছয় বিশ্বশক্তির স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে যাওয়ার পর এই উত্তেজনার শুরু। ২০১৫ সালের ওই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে যাওয়ার পর তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন।

চলতি মাসের শুরুর দিকে পারমাণবিক চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের ঘোষণা দিয়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা নিজেদের ইচ্ছে মতো বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তেহরান বার বার বলে আসছে, আক্রান্ত হলে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জলপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে তারা।

সূত্র : এএফপি।

এসআইএস/এমএস