নারীর অর্থনৈতিক শক্তি অবমুক্ত হচ্ছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:০৩ এএম, ০৬ মার্চ ২০২০ | আপডেট: ০২:৩৬ পিএম, ২৯ নভেম্বর ২০২০

ডেভিড ম্যালপাস

আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার সংখ্যা বেড়ে গেছে। সেইসঙ্গে শ্রমশক্তি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নেতৃত্বেও নারীরা ক্রমবর্ধমান হারে প্রবেশ করছে। আমাদের এই উন্নতি উদযাপন করা উচিত। সদ্যোজাত একজন কন্যাশিশুর এবং একজন ছেলেশিশুর জন্য এখন কাজের সুযোগ সমানে সমান।

বিশ্বব্যাংকের গবেষণাসহ অন্যান্য সবকিছুই দেখাচ্ছে যে, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যই নারীরা বিশ্ব প্রবৃদ্ধিতে অংশ নিতে পারছে। তাছাড়া এটি করাই যথাযথ। সৌভাগ্যক্রমে অনেক দেশ এটা উপলব্ধি করে যে, অর্থনৈতিকভাবে পূর্ণ শক্তিশালী হতে হলে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ। বিশ্বব্যাংক গ্রুপ বিভিন্ন দেশকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করে যাচ্ছে। সেইসঙ্গে বৈষম্যমূলক আইন অপসারণেও সহায়তা করছে। নারী-পুরুষ সুযোগের পার্থক্য কমাতেও বিনিয়োগ করছে, আর্থিক ক্ষেত্রে প্রবেশ, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

এটা উৎসাহব্যাঞ্জক যে, ২০২০ সালে নারী, ব্যবসা এবং আইন-সংক্রান্ত আমাদের প্রতিবেদনে দৃশ্যমান হয় যা কীভাবে ১৯০টি ক্ষেত্রে আইন ও বিধিমালা নারীদের অর্থনৈতিক সুযোগকে প্রভাবিত করে। এক্ষেত্রে যে উন্নতিগুলো হয়েছে সেগুলো সবার দৃষ্টিগোচর করে। ২০১৭ সাল থেকে উদাহরণস্বরূপ নেপাল, সাওটোমে-প্রিন্সিপে এবং দক্ষিণ সুদান লিঙ্গভিত্তিক প্রতিবন্ধকতা দূর করায় বড় পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে।

অনুরূপভাবে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার নারীদের সুরক্ষায় আইন পরিবর্তন করেছে সৌদি আরব এবং গর্ভাবস্থায় কিংবা মাতৃত্বকালীন ছুটিতে নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ নিষিদ্ধ করেছে। সমান বেতন প্রবর্তন করা এবং বাণিজ্যিত পরিচালনা পর্ষদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর জন্য আরব আমিরাত আইন সংশোধন করেছে।

কর্মক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণে সমতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিগত দুই বছরে ফিজি বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি বর্ধিত করেছে। সাইপ্রাসও বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটির সূচনা করেছে। একইসঙ্গে আমেরিকাও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতনসহ পারিবারিক ছুটি প্রদানে আইন প্রণয়ন করেছে।

মেয়ে এবং নারীদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্ব আরও তুলে ধরতে লিঙ্গ-সংক্রান্ত নীতি ও প্রোগ্রামগুলো আরও বেশি সক্ষম। এজন্য এসব কর্মসূচিতে মেয়েদের স্কুলে লম্বা সময় ধরে রাখার জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করে বিনিয়োগ করতে হবে। এর ফলে তাদের ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত হবে। তারা তেমন শিক্ষা এবং দক্ষতা অর্জন করতে পারবে যা শ্রমক্ষেত্রে বড়দের ন্যায় তাদের অংশগ্রহণের জন্যও প্রয়োজন।

উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকার মেয়েদের মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত উপবৃত্তি প্রদান করছে। যা একটি দীর্ঘমেয়াদি পাঠ্যসূচির সূচনা করেছে। এই ব্যবস্থা মাধ্যমিক পর্যায়ে লিঙ্গবৈষম্যকে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। এখন শ্রেণিকক্ষে মেয়েদের সংখ্যা ছেলেদের চেয়েও বেশি হয়ে গেছে!

বেতন পাওয়া যাবে এমন কাজ খুঁজতে নারীদের নারীদের গতিশীল করা এবং তাদের উৎসাহ দেয়া মোটেই অগুরুত্বপূর্ণ নয়। এক্ষেত্রে সফলতার জন্য প্রয়োজন গণপরিবহন হতে হয়রানি দূর করা। সেইসঙ্গে এটা নিশ্চিত করা যে যাত্রা নিরাপদ, গ্রহণযোগ ও সুগম হয়েছে।

লেবাননে বিশ্বব্যাংকের লক্ষ্য হচ্ছে নারীদের গণপরিবহন ব্যবহার বৃদ্ধি করা। এজন্য সংস্থাটি নারীরা যেমনটি চান সেভাবে গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের সহায়তা করছে। অর্থনীতিতে নারীর প্রবেশ বৃদ্ধি করা খুবই কঠিন। ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি) বিংশ্বব্যাংকের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রদান শাখা। যারা হিসাব করে দেখেছে যে, বিশ্বব্যাপী নারীদের নেতৃত্বে সম্ভবপর ব্যবসার জন্য অর্থ ঘাটতি আছে ১.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এ ক্ষেত্রে তহবিল ঘাটতি পূরণের জন্য বিশ্বব্যাংকের নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক প্রণোদনা কার্যক্রম (উই-ফি) নকশাই করা আছে। যার উদ্দেশ্য নারী উদ্যোক্তাদের অন্যসব প্রতিবন্ধকতা দূর করা। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, জাপান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সহায়তায় বিশ্বের ৫০টি দেশের এক লাখ ১৫ হাজার নারী মালিকানাধীন ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকৃতির প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করছে। সেইসঙ্গে ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে তহবিল গঠন করছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ক্রিস্টিনা জর্জিয়েভা, ইভাঙ্কা ট্রাম্প এবং আমি দুবাইয়ে ‘উই-ফি’র একটি সামিটে অংশ নিয়েছি। সেখানে আমরা মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের অনেক মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমরা তাদের বলেছি কীভাবে অর্থনীতিতে নারীদের প্রবেশাধিকার দিয়ে আমরা তাদের সুযোগ খুলে দিতে পারি।

উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল চ্যানেলগুলোতে আরও নগদ অর্থ লেনদেন করা নারীদের তাদের নিজেদের ক্ষেত্রগুলোতে আরও নিয়ন্ত্রণ এনে দেবে। এমন উদ্যোগ অন্যান্য সুযোগের দ্বারও উন্মুক্ত করবে। ২০১৬ সালে কেনিয়ায় চালানো এক জরিপে দেখা যায়, নারীদের মোবাইল অর্থ সেবা ঘরোয়া সঞ্চয় এক পঞ্চমাংশের বেশি বাড়িয়েছে। সেইসঙ্গে এর মাধ্যমে চরম দারিদ্র্য ২২ শতাংশ দূর হয়েছে। এসব পরিবারের কর্তৃত্ব নারীদের হাতে।

বেসরকারি খাতগুলো ডিজিটাল আর্থিক পরিষেবাগুলোকে মূলধারার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মিসরে আর্থিক পরিষেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফাওরি যারা আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন (আইএফসি) এর গ্রাহক, তারা ২.৫ মিলিয়নের বেশি লেনদেন প্রতিদিন করে থাকে দেশের প্রথম নারীদের দ্বারা পরিচালিত ই-পেমেন্ট এজেন্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। তাদের লক্ষ্য ই-পেমেন্ট এ নারীদের প্রবেশাধিকার আরও সম্প্রসারণ করা।

কিন্তু বৈষম্যমূলক আইন, মূলধন এবং সম্পদে প্রবেশাধিকারের অভাব। এছাড়া মেয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মেয়েরা নিয়মের শেকলে বন্দি। যেখানে বলা হয় মেয়েদের মূল্য ছেলেদের থেকে অনেক কম। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এই গভীরভাবে জেঁকে বসা পক্ষপাতের সবচেয়ে ক্ষতিকারক প্রকাশ। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, আজও বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনজন নারীর একজন শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার।

তবে ভালো খবর এটা যে, অনেক দেশ লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে এবং প্রতিক্রিয়া জানাতে বেশ এগিয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় সলোমন দ্বীপপুঞ্জে যৌন সহিংসতা নিয়ে গবেষণার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই ক্ষেত্রে দেখা যায় যে অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যে এরূপ সহিংসতা আর পাচ্ছে না। ধর্মী নেতা এবং সরকারি সেবা প্রদানকারীদেরও এর বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে।

সহিংসতা থেকে বেঁচে যাওয়াদের কীভাবে সহায়তা করা যায় সে জন্য একটা বিষয় চর্চা করতে হবে, আর তা হলো তাদের অভিজ্ঞতাগুলো জানাতে হবে। নারীদের একটা নেটওয়ার্কের ভেতর এনে সামাজিকভাবে সহায়তা করতে হবে, তাদের সহিংসতা এবং ঝুঁকি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে যা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।

এই আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমি আবারও জোর দেব যে, বিশ্বব্যাংক গ্রুপ নারীদের ক্ষমতায়নে এবং তাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অবমুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করা সমস্ত স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে সবসময় প্রস্তুত।

লেখক : বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট
প্রজেক্ট সিন্টিকেট থেকে অনূদিত
অনুবাদ : সাখাওয়াত হোসেন সুজন

এসএইচএস/বিএ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]