আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কে?

মুহাম্মদ ফজলুল হক
মুহাম্মদ ফজলুল হক মুহাম্মদ ফজলুল হক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:১৮ এএম, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে থাকায় চিফ প্রসিকিউটরের পক্ষে সই-স্বাক্ষর করার দায়িত্ব দেওয়া হয় অপর প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলীকে। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে সৈয়দ হায়দার আলী নিজের কক্ষের সামনে চিফ প্রসিকিউটর লেখা কাগজ লাগিয়ে দিয়েছেন।

এর অর্থ, এখন দুজন চিফ প্রসিকিউটর ট্রাইব্যুনালে। একজন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গোলাম আরিফ টিপু, অপর জন হলেন প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী। সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আসলে কে?

নিজেকে চিফ প্রসিকিউটর দাবি করে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতি নোটিশ ও মন্ত্রণালয়ের কাছে দায়িত্ব বুঝে পাওয়ার চিঠি পাঠানো হয়েছে সৈয়দ হায়দার আলীর পক্ষ থেকে। যদিও এসব কাজকে বেআইনি বলেছেন অনেকেই।

jagonews24

বর্তমানে চিফ প্রসিকিউটর কে, জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক এম সানাউল হক জাগো নিউজকে বলেন, আমি বহুদিন ধরে ট্রাইব্যুনালে যাই না। আর চিফ প্রসিকিউটর কে সে বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। এটা আমি জানিও না, আমার জানা নেই। কারণ চিফ প্রসিকিউটর কে হবেন না হবেন তা ঠিক করবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়)।

আরও পড়ুন: করোনা আক্রান্ত চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু হাসপাতালে 

এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. মুখলেসুর রহমান বাদল জাগো নিউজকে বলেন, উনাকে (চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু) অনেক শ্রদ্ধা করি। তিনি ভাষাসৈনিক ছিলেন। কিন্তু উনি অসুস্থ থাকায় ট্রাইব্যুনালে আসতে পারেন না। এসময়ে কাগজপত্রে সই করার জন্য দায়িত্বরত চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে সৈয়দ হায়দার আলীকে মন্ত্রণালয় থেকে পত্র দিয়ে বলা হয়েছে। উনি সেটি করছেন। আমি এর বেশি কিছু জানি না, বলতেও চাই না।

এ বিষয়ে প্রসিকিউটর সূলতান মাহমুদ সীমন জাগো নিউজকে বলেন, চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু স্যার দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। সর্বশেষ প্রসিকিউটর বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট জেয়াদ আল মালুমের মৃত্যুর পরে জানাজায় শরীক হওয়ার জন্যে (২০২১ সালের ২৬ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়েছিলেন। এর আগে পরে করোনা শুরুর পর থেকে তিনি ট্রাইব্যুনাল অঙ্গণে আসেন না। তিনি নিজে কোনো নথি পড়তে পারেন না। কেউ বলার পর সেটি অবগত হয়ে সেখানে সই করেন। কাগজপত্রে একবার সই করলে আর একবার অন্যটায় করতে পারেন না। এরপর তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে উনার (চিফ প্রসিকিউটরের অনুপস্থিতিতে) অফিসের কাগজপত্রে সই স্বাক্ষরের জন্যে দায়িত্বরত চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে সৈয়দ হায়দার আলীকে মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া পত্রে বলা হয়েছে। উনি সেটি করছেন। তাতে কে চিফ প্রসিকিউটর, সেটা নিয়ে প্রশ্ন কেন?

এর আগে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে সৈয়দ হায়দার আলী গত ১৩ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস (১৫ আগস্ট) উপলক্ষে নোটিশ দেন। তাতে তিনি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে সব প্রসিকিউটর, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সকাল ৮টায় নিউ মডেল ডিগ্রি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সামনে থাকার জন্য অনুরোধ করেন। তার এই নোটিশ নিয়ে আইনজীবীসহ অন্যান্যদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন আলোচনা চলছে। এতে প্রসিকিউশনে সমন্বয়হীনতা রয়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ।

আরও পড়ুন: পাঁচ দিনের সফরে ঢাকায় আসছেন আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি 

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস অ্যাক্ট)-১৯৭৩ আইনের ৭ (১) ধারা অনুযায়ী একজন চিফ প্রসিকিউটর থাকবেন। তার অধীনে প্রসিকিউটররা কাজ করবেন। আইনের ৭ (২) ধারায় বলা আছে, সরকার প্রসিকিউটর নিয়োগ দেবে। এরমধ্যে একজন থাকবেন চিফ প্রসিকিউটর। কিন্তু দুজন চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগ দেওয়ার কথা আইনে কোথাও বলা নেই।

জানতে চাইলে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘অসুস্থ’ থাকলে ভারপ্রাপ্ত কেউ থাকতে পারেন। নতুন করে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কি না আমার জানা নেই। কোনো অসঙ্গতি থাকলে সেটাও ঠিক করা হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার ব্যারিস্টার মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু অসুস্থ থাকায় সৈয়দ হায়দার আলীকে প্রসিকিউশনের কিছু বকেয়া বিলে সই করার জন্য সাময়িক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি যদি নিজেকে চিফ প্রসিকিউটর দাবি করে চিঠি দেন সেটি অনৈতিক ও বেআইনি। কারণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেরর আইনে কোথাও দুইজন চিফ প্রসিকিউটর থাকবেন বলে উল্লেখ নেই।

একাধিক প্রসিকিউটর বলছেন, একজন চিফ প্রসিকিউটর থাকতে আরেকজনকে চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগ দেওয়ার কোনো বিধান নেই। ভারপ্রাপ্ত বা দায়িত্বপ্রাপ্ত হতে পারেন কিন্তু আইনে দুজন চিফ প্রসিকিউটর কোথাও নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রসিকিউটর বলেন, এটি ক্ষমতার অপব্যবহার। আইন অনুযায়ী নয়, নিজে নিজেই দায়িত্বগ্রহণ করে পদ ধরে রাখা হয়েছে। এটি খুবই আশ্চর্যজনক। গোলাম আরিফ টিপুর কক্ষ থেকে সোফাও নিয়ে আসা হয়েছে।

jagonews24

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ও অন্যতম প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী জাগো নিউজকে বলেন, এর আগেও আমাকে চার থেকে ৫ বার অস্থায়ীভাবে চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এবার আইন মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে চিফ প্রসিকিউটরের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, উনি (গোলাম আরিফ টিপু) অসুস্থ। একজন অসুস্থ থাকলে তো আর সব কাজ বন্ধ থাকতে পারে না। প্রশাসনিক ও আর্থিকভাবে তাকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত উল্লেখ করা হয়নি, আবার দায়িত্বরতও বলা হয়নি। তাহলে কী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলো?

জানা গেছে, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিচার শাখা-৫ থেকে সিনিয়র সহকারী সচিব (প্রশাসন) তৈয়বুল হাসানের সই করা চিঠিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু গত ৩০ জুন হতে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে ধানমন্ডি পপুলার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় তিনি কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের সিনিয়র প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলীকে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের (২০২২-২০২৩) অর্থবছরের ক্লোজিং বিল ভাউচারসমুহে চিফ প্রসিকিউটরের পক্ষে স্বাক্ষর প্রদানসহ আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান করা হলো।

প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের ২৮ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পান ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সিনিয়র আইনজীবী গোলাম আরিফ টিপু। বয়সের কারণে এবং বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতার কারণে ট্রাইব্যুনালেও উপস্থিতি অনিয়মিত। এরপরে গত সপ্তাহে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আবারও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর পারিবারিক সূত্রে জানানো হয়েছে, কোভিড পরবর্তী নানান শারীরিক সমস্যার কারণে গত ২৮ আগস্ট গোলাম আরিফ টিপুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এখন শারীরিক অবস্থা উন্নতির দিকে। তিন চার দিনের মধ্যে বাসায় যাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।

এফএইচ/এমএইচআর/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।