টাকার খেলা কোন দিকে রায়ে দেখবেন : প্রধান বিচারপতি
দুই মন্ত্রীর আদালত অবমাননা বিষয়ে শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহা বলেছেন, পরবর্তী রায়েই দেখা যাবে টাকার খেলা কোন দিকে হয়েছে।
রোববার দুই মন্ত্রীর আদালত অবমাননার অভিযোগের ওপর শুনানিতে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে প্রধান বিচারপতি এমন মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, কে কত টাকা কার কাছ থেকে খেয়েছেন তা পরবর্তী জাজমেন্টেই দেখতে পাবেন। তবে কার রায় সেটা প্রকাশ করেননি আপিল বিভাগ।
এসময় প্রধান বিচারপতি বলেন, সেখানে (সেমিনারে) আরো অনেক বক্তারা ছিলেন আমরা তাদেরকে শোকজ করিনি। কিন্তু দুই মন্ত্রীকে শোকজ করেছি। তার কারণ দেশ জাতি জানুক আদালত চাইলে কত কঠোর হতে পারে। তারা সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিমকোর্টে বিচারাধীন মীর কাশেম আলীর রায় নিয়ে মন্তব্য করেছেন।
এর আগে সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে আদালতে উপস্থিত হন খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ও মুক্তযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। পরে ৯টা ২৭ মিনিট থেকে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে ৮ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে মামলার শুনানি শুরু হয়।
শুরুতেই সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুল বাসেত মজুমদার খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের কামরুল ইসলামের পক্ষে নিঃশর্ত ক্ষমার আবেদন করেন। তিনি বলেন, (এ্যাক্সিট্রিমলি সরি) আমি ভীষণ ভাবে দুঃখিত।
এক পর্যায়ে সিনিয়র বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা অ্যাটর্নি জেনারেল কে বলেন, মিস্টার অ্যাটর্নি জেনারেল জনকণ্ঠে প্রকাশিত রিপোর্টটি পড়েন। তখন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম দুই মন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যসহ পুরো রিপোর্ট পাঠ করে আদালতে উপস্থিত বিচারপতিসহ প্রায় পাচঁ শতাধিক আইনজীবীকে তা শোনান।
এরপর সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের দিকে আদালতের কার্যক্রম ১০ মিনিটের জন্য মুলতবি করে বিচারপতিরা খাস কামড়ায় যান। তখন আদালত বলেন, আমরা ১০ মনিট পরে আসছি। তবে তার আরো১০ মিনিট পরে ১০ টা ২০ মিনিটের দিকে বিচারপতির এজলাসে উঠেন। এবার দুই মন্ত্রীর প্রার্থনা খারিজ করে এবং তাদের (২মন্ত্রীকে) ৫০ হাজার করে এক লাখ টাকা জরিমানা ঘোষণা করেন। জরিমানার অর্থ ইসলামীয়া চক্ষু হাসপাতাল ও কিডনি ফাউন্ডেশনে দিতে বলেন আদালত। অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে তাদের সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
রায়ের আগে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা উচ্চ আদালতের সব বিচারকরা গভীর মনোযোগ দিয়ে তাদের বক্তব্য শুনেছি। এই অভিযোগটি আমরা বিচার বিশ্লেষণ করেছি। জনকণ্ঠ পত্রিকায় যাদের নাম এসেছে আমরা তাদের সবাইকে ডাকি নাই।
অনেকে বক্তব্য দিয়েছেন, নানা দিক বিবেচনায় নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেইনি। কারণ প্রকৃতপক্ষে আদালত অবমাননা নিয়ে আমরা বাড়াবাড়ি করতে চাইনি।
তিনি আরো বলেন, এই দুইমন্ত্রীর সাংবিধানিক দায়দায়িত্ব আছে। আজকে এই দুজনের ব্যাপারে রায় দেয়া হল। এর মাধ্যমে দেশবাসী একটা বার্তা পাবে।
প্রধান বিচারপতি বলেন, জনকণ্ঠের স্বদেশ রায় আদালত অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত। আর বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী অনেক জাজমেন্টের রায় লেখেননি। তারা তো বিতর্কিত ব্যক্তি। দুই মন্ত্রী কিভাবে এক মঞ্চে তাদের সঙ্গে বসলেন। এটা তো নৈতিকতার প্রশ্ন। তারা অ্যাটর্নি জেনারেল সম্পর্কেও বিরূপ মন্তব্য করেছেন। স্বাধীনতার পর তিনজন অ্যাটর্নি জেনারেল সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। একজন আমিনুল হক চৌধুরী ও অপরজন মাহমুদুল ইসলাম। আর একজন বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তাকেও আপনারা কালিমাযুক্ত করলেন?
এরপর বাসেত মজুমদার বলেন, দুঃখিত জনকণ্ঠের রিপোর্ট আমি পড়িনি। এরপর বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা বলেন, আমরা প্রতিবেদনটি পড়ালাম এ কারণে যে তারা যা বলেছেন তা সবার জানা দরকার। তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, টাকার খেলা কোন দিকে হয়েছে তা পরবর্তী রায়ে আসেব।
প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্য প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘আমি যতোটুকু বুঝতে পেরেছি আদালত প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার ওপর চরমভাবে ক্ষুব্ধ। তবে রায়ের কপি পেলেই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।’
প্রধান বিচারপতির দেয়া সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়, তারা (মন্ত্রীরা) ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু আদালত তাদের ক্ষমার আবেদন গ্রহণ করতে অপারগ। তারা সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছেন। কিন্তু যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন তাতে প্রধান বিচারপতির দফতর ও বিচার বিভাগকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। বিচার বিভাগকে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেছেন। তাই তাদের আবেদন খারিজ করা হল। শুরুতেই তারা নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করায় তাদের সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছি। তাই দুজনকে (মন্ত্রীদের) দোষী সাব্যস্ত করে এই দণ্ড দেয়া হল।
এফএইচ/এসকেডি/পিআর