আইন প্রণয়নের মতামত

ধর্মীয় অবমাননায় সর্বোচ্চ শাস্তি, অপরাধ জামিন অযোগ্য

মুহাম্মদ ফজলুল হক
মুহাম্মদ ফজলুল হক মুহাম্মদ ফজলুল হক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:১৯ পিএম, ১২ মার্চ ২০২৪
ফাইল ছবি

মহান আল্লাহ তায়ালা এবং মহানবি হজরত মুহাম্মদসহ (সা.) অন্য ধর্মীয় অবতারদের অবমাননায় সর্বোচ্চ শাস্তি এবং জামিন অযোগ্য অপরাধ অভিহিত করে আইন প্রণয়নের মতামত দিয়েছেন হাইকোর্ট।

হজরত মুহাম্মদকে (সা.) নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর মন্তব্য করা কুষ্টিয়ার এক আসামিকে ২৫ লাখ টাকা ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে (মুচলেকা) জামিন মঞ্জুর করে এমন অভিমত দেন হাইকোর্ট।

মঙ্গলবার (১২ মার্চ) হাইকোর্টের বিচারপতি মো. রেজাউল হাসান ও বিচারপতি ফাহমিদা কাদেরের সমন্বয়ে বেঞ্চ এ মতামত দেন। প্রথম রমজানে এমন রায় দিলেন উচ্চ আদালত। এ সময় কোরআনের সুরা আশ-শুরার বিভিন্ন আয়াতের তথ্য এবং বিভিন্ন মনীষীর মন্তব্য তুলে ধরেন আদালত।

শুনানিতে আদালত বলেন, আমরা মত প্রকাশ করতে পারি, তবে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে পারি না। কারও ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই, তবে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করলে তার জন্য শাস্তির প্রয়োজন আছে।

বিষয়টি জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক।

তিনি বলেন, ধর্মীয় অবমাননার বিষয়ে আদেশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু এ বিষয়ে দণ্ডের কোনো বিধান নেই, তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবনসহ অজামিনযোগ্য আইন প্রণনয়নের কথা জানান হাইকোর্ট।

তিনি আরও বলেন, আদালত ফেসবুকে কুরুচিপূর্ণ পোস্টদাতা এক নারীর বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকায় সম্পূরক অভিযোগপত্রের মাধ্যমে তাকে অভিযুক্ত করার জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি নির্দেশ দেন।

আদালতে এদিন জামিনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল নোমান। রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সাহাব উদ্দিন আহমেদ টিপু ও মো. মজিবুর রহমান মুজিব।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২ নভেম্বর এক নারী মহানবি হজরত মুহাম্মদকে (সা.) অবমাননা করে পোস্ট দেন। ওই পোস্টের নিচে মামলার আসামি (পুরুষ) আপত্তিকর মন্তব্য করেন।

পোস্টটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়, ফলে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অনুভূতিতে চরমভাবে আঘাত করাসহ দাঙ্গা সংঘটনের উপক্রম হয়। ওইদিন ওই পোস্ট করার পর সেলিম খানকে থানায় ডেকে সতর্ক করে পোস্টটি সরানোর জন্য বলা হয়। এরমধ্যে স্থানীয় জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে তার বাড়ির দিকে অগ্রসর হয়। তখন আসামি টের পেয়ে কৌশলে পালিয়ে যায়।

আরও পড়ুন

এই পোস্টের স্ক্রিন শট নেওয়া হয়। এরপরে ওই ব্যক্তিকে আসামি করে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থানায় মামলা করা হয়। এরপর গত ৪ নভেম্বর তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বর্তমানে তিনি কারাগারে।

এ বিষয়ে আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল নোমান জাগো নিউজকে বলেন, ভেড়ামারা থানায় দায়ের করা মামলায় প্রথমে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট থেকে জামিন না পেয়ে সেশন জজ কোর্টে জামিন আবেদন করা হয়। সেখানে জামিন না পেয়ে হাইকোর্টে জামিন আবেদন করা হয়। সেই জামিন আবেদন শুনানি নিয়ে গত ৮ জানুয়ারি তাকে কেন জামিন দেওয়া হবে না সেই মর্মে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে মঙ্গলবার আসামির জামিন মঞ্জুর করেন আদালত। মামলাটি বর্তমানে খুলনার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) কনিকা বিশ্বাসের আদালতে বিচারাধীন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আমিন উদ্দিন মানিক জানিয়েছেন, এরমধ্যে আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এদিকে তার লেখা পোস্ট নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবরেটরির তথ্যমতে ওই ফেসবুক আইডি লগইন করা পাওয়া গেছে এবং পোস্টটি পাওয়া যায়নি। তবে মোবাইল ফোনে বিতর্কিত কমেন্ট বা কটূক্তির স্ক্রিন শট পাওয়া গেছে, যা মোবাইলে ধারণ করা। সেখানে ইসলামবিরোধী আরও বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করার তথ্য পাওয়া গেছে।

মানিক আরও জানান, আসামি যে অপরাধ করেছেন তাতে তার পাঁচ বছরের সাজা হতে পারে।

অন্যদিকে আসামির আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, এ মামলাটি সাইবার সিকউরিটি অ্যাক্ট ২০২৩ সালের আইনে দ্বিতীয় মামলা। সংক্ষেপে যদি বলি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থির অবনতি ঘটানোর এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টির অপরাধ।

তিনি বলেন, আপিল বিভাগের একটি সিদ্ধান্ত আছে-সিক্সটিএইট ডিএলআর ২০১৬ এর ২৯০ নম্বর পেজ। আপিল বিভাগ বলে দিয়েছেন কোনো অপরাধের আইনে যদি বলা থাকে যে অ-আমলযোগ্য বা জামিনযোগ্য সেই সমস্ত অপরাধে অভিযুক্তকে জামিন দিতে হবে। এই গ্রাউন্ডে আমরা জামিন চেয়ে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু হাইকোর্ট জামিন না দিয়ে প্রথমে রুল জারি করেছিলেন। ওই রুলের হেয়ারিং আমরা আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত এবং সাইবার সিকিউরিটি আইনের ৫২ ধারার (ক) তে বলা আছে সিকিউরিটি আইনের ২৫ (১), ২৮ (১) ২৯ (১) আর ৩১ ধারার অপরাধগুলো জামিনযোগ্য এবং অ-আমলযোগ্য।

তিনি আরও বলেন, যেহেতু আইনেও বলা আছে এবং আপিল বিভাগও বলে দিয়েছেন সেটাকে ধরেই আদালত জামিন দিলেন ২৫ লাখ টাকার বেইল বন্ড। শর্ত হচ্ছে সে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো এ ধরনের কাজ আর করবে না। নিয়মিত আদালতে উপস্থিত হয়ে হাজিরা দেবে।

এদিকে মামলার এজাহারের বরাত দিয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক বলেন, গত বছরের ২ নভেম্বর কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার এক ব্যক্তি ফেসবুকের একটি গ্রুপে এক নারীর ফেসবুকে দেওয়া একটি স্ট্যাটাসের নিচে কমেন্টের ঘরে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। ফেসবুকের কমেন্টের ঘরে এমন আপত্তিকর মন্তব্য পরে ভাইরাল হয়। অনেকে এমন মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তার শাস্তি দাবি করেন।

এরপর গত ৪ নভেম্বর একই উপজেলার চাঁদগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের কাউন্সিলর মো. হানিফ শাহ বাদী হয়ে ভেড়ামারা থানায় সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন। মামলায় মন্তব্যকারী পুরুষকে একমাত্র আসামি করা হয়।

পরদিন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে প্রেরণ করে। তখন থেকে ওই আসামি (২০) জেলহাজতে। তিনি স্থানীয় একটি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

এরপর গত ৩১ ডিসেম্বর এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের পরিদর্শক শেখ লুৎফর রহমান এ মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৩ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ার অবকাশকালীন দায়রা জজ রুহুল আমীন আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।

এরপর গত ৩ জানুয়ারি তিনি হাইকোর্টে জামিন চেয়ে আবেদন করেন। ওই জামিন আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ৮ জানুয়ারি আসামির জামিন প্রশ্নে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। মঙ্গলবার সেই রুল চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে আদেশ দেন আদালত।

এফএইচ/বিএ/এসএইচএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।