সকালে ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল দেখার অভ্যাস, শরীরের যে ক্ষতি হচ্ছে
বর্তমান সময়ে ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল হাতে নেওয়া অনেকেরই দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। চোখ খুলেই অনেকেই প্রথমে নোটিফিকেশন চেক করেন, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল করতে শুরু করেন।
দিনের শুরুটা যেন মোবাইল স্ক্রিনের মাধ্যমেই হয়। কিন্তু এই অভ্যাস শরীর ও মনের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা অনেকেই ভাবেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুম চোখে মোবাইল দেখার অভ্যাস ধীরে ধীরে শরীর ও মস্তিষ্কের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করতে পারে।
আসুন জেনে নেওয়া যাক কী কী প্রভাব ফেলে-
মস্তিষ্কের ওপর চাপ সৃষ্টি
ঘুমানোর সময় আমাদের মস্তিষ্কও বিশ্রাম নেয়। তখন মস্তিষ্ক সাধারণত ডেল্টা মোডে থাকে, যা গভীর ঘুমের অবস্থা নির্দেশ করে। ঘুম ভাঙার সময় ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক থিটা ও আলফা মোডে পৌঁছায়। এই পর্যায়ে শরীর ও মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে জেগে ওঠে এবং সচল হওয়ার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যদি কেউ মোবাইল হাতে নিয়ে নানা তথ্য দেখতে শুরু করেন, তখন মস্তিষ্ককে হঠাৎ করেই সক্রিয় হতে হয়। অর্থাৎ মস্তিষ্ক ডেল্টা অবস্থা থেকে দ্রুত বিটা মোডে চলে যায়, যা এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।

চোখের যে ক্ষতি হয়
চোখের ক্ষেত্রেও এই অভ্যাস ক্ষতিকর হতে পারে। ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকালে চোখ সরাসরি নীল আলো বা ব্লু লাইটের সংস্পর্শে আসে। এই আলো চোখের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এবং অনেকের ক্ষেত্রে চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া বা ড্রাই আইয়ের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এছাড়া চোখে জ্বালাপোড়া, ঝাপসা দেখা বা চোখ দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে।
মনোযোগের ওপর প্রভাব ফেলে
সকালে ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল দেখার অভ্যাস মনোযোগের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। দিনের শুরুতেই যদি মন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা তথ্য বা মন্তব্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে কাজে মন বসানো কঠিন হয়ে যায়। অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক মন্তব্য বা তুলনামূলক কনটেন্ট মানুষের মনে দীর্ঘ সময় প্রভাব ফেলে। ফলে সারাদিন কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে।
মানসিক চাপ বাড়ে
সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময় শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বেশি থাকে। এই হরমোন শরীরকে জাগ্রত করতে সাহায্য করে। কিন্তু সেই সময় আবার যদি কেউ ফোনের বিভিন্ন নোটিফিকেশন, বার্তা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট দেখতে শুরু করেন, তাহলে মস্তিষ্কের ওপর আরও বেশি চাপ পড়ে। অনেক সময় নেতিবাচক খবর, মন্তব্য বা কাজের চাপের বার্তা সকালে মনকে অস্থির করে তুলতে পারে। এর ফলে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা আরও বেড়ে যায় এবং দিন শুরুর আগেই মানসিক চাপ তৈরি হয়। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটির সমস্যাও বাড়তে পারে।
- আরও পড়ুন:
ওজনের ওপর ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ও রোজার প্রভাব কি একইরকম
ঘুমের আগে রিলস দেখার অভ্যাসে বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি
ঘুমের সমস্যা সৃষ্টি করে
এই অভ্যাস ঘুমের স্বাভাবিক চক্রকেও ব্যাহত করতে পারে। স্মার্টফোনের নীল আলো মস্তিষ্কে মেলাটোনিন হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণে বাধা দেয়। এই হরমোন ঘুমের চক্র নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠেই বা রাতে ঘুমানোর আগে বেশি সময় ফোন ব্যবহার করলে ঘুমের ছন্দ নষ্ট হতে পারে এবং ধীরে ধীরে অনিদ্রার সমস্যাও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা তাই পরামর্শ দেন, ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ব্যবহার না করাই ভালো। অন্তত ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা সময় নিজের জন্য রাখা উচিত। এই সময়টায় হালকা ব্যায়াম, স্ট্রেচিং, ধ্যান বা কিছুক্ষণ খোলা বাতাসে হাঁটাহাঁটি করলে শরীর ও মন ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
সকালের শুরুটা যদি শান্তভাবে করা যায়, তাহলে পুরো দিনটিই অনেক বেশি সতেজ ও মনোযোগী হয়ে ওঠে। তাই সুস্থ জীবনযাপনের জন্য ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল দেখার অভ্যাসে নিয়ন্ত্রণ আনা জরুরি।
সূত্র:দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হেলথলাইন
এসএকেওয়াই