সন্তানের খেলার মধ্যে দেখতে পাবেন নিজের জীবনের আয়না

অধরা মাধুরী পরমা অধরা মাধুরী পরমা , সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ০৩:০০ পিএম, ৩১ মার্চ ২০২৬
স্ট্রেচারের মতো দেখতে কোনো ভাঙা যন্ত্রাংশের ওপর শোয়ানো হয়েছে একটি পুতুল, আর মহা উৎসাহের সঙ্গে সেই পুতুলের দেহ নিয়ে রওনা হয়েছে শিশু চারজন। ছবি/গাজার একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ইন্সটাগ্রাম থেকে সংগৃহীত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোরাঘুরি করছে একটি অদ্ভুত ভিডিও। ভিডিওটির কথা জানার আগে একবার ভেবে দেখুন তো – আপনার পরিবারের সন্তানদের কী কখনো লাশের দাফন-কাফন করার ধাপগুলো অনুকরণ করে খেলতে দেখেছেন?

প্রশ্নটা অবশ্যই অদ্ভুত। কোনো বাবা-মা তার ছোট্ট সন্তানকে এ দৃশ্যই দেখাতে চান না, খেলায় এর অনুকরণকে উৎসাহ দেওয়া তো অনেক পরের ব্যাপার। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে গাজার এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের প্রকাশ করা ভিডিওটি এই প্রশ্নটির চেয়েও অস্বস্তিকর।

ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে গাজার চারজন শিশুকে। বয়স ৩-৪ হতে পারে। ধুলো মাখা মলিন শরীর, তবে মুখে হাসি। হাসির কারণ হলো, এই ভয়ংকর অবস্থার মধ্যেও তারা বেঁচে আছে এবং একসঙ্গে খেলছে। কিন্তু তাদের খেলার দিকে একটু ভালো করে তাকালেই দেখবেন যে, তারা স্ট্রেচার বা খাটিয়ায় করে আহত অথবা মৃত ব্যক্তিকে কাঁধে করে নিয়ে যাওয়ার অনুকরণ করছে।

ছোট্ট একটা স্ট্রেচারের মতো দেখতে কোনো ভাঙা যন্ত্রাংশের ওপর শোয়ানো হয়েছে একটি পুতুল, আর মহা উৎসাহের সঙ্গে সেই পুতুলের দেহ নিয়ে রওনা হয়েছে শিশু চারজন।

আপনার আশেপাশে তাকান। শিশুরা কী খেলে? রান্নাবাড়ি, ডাক্তার-রোগী, চোর-পুলিশ, টিচার-টিচার আরও কত কী। এই খেলাগুলো শিশুদের জন্য বিনোদন বলে অনেকে খেয়ালই করেন না যে, তারা কোথায় থেকে খেলতে শিখছে? তারা সরাসরি আপনার থেকেই শিখছে কিসের অনুকরণে সে খেলবে।

ঠিক যেমন গাজার ওই চার শিশু জন্মের পর থেকে লাশ দেখতে দেখতে লাশ দাফন করাই তাদের খেলায় পরিণত হয়েছে।

তাই আপনার শিশু কী খেলছে সেদিকে ভালো করে তাকালেই শিশু আপনাকে দেখিয়ে দেবে যে আপনি তার সামনে কী কী করেন।

গবেষণাও বলছে, শিশুরা শুধু নির্দেশনা নয়, বরং পর্যবেক্ষণ ও অনুকরণের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি শেখে। মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরার সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্ব অনুযায়ী, শিশুরা আশপাশের মানুষ—বিশেষ করে বাবা-মা ও পরিবারের বড়দের আচরণ দেখে সেটি নিজের আচরণে রূপান্তর করে। অর্থাৎ আপনি কী বলছেন তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ আপনি কী করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের তথ্য অনুযায়ী, ছোটবেলায় দেখা অভিজ্ঞতা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। সহিংসতা, ভয় বা চাপপূর্ণ পরিবেশে বড় হওয়া শিশুরা তাদের খেলায় সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটায়, যা ভবিষ্যতে তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।

একইভাবে ইউনিসেফের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুদ্ধ বা সংকটময় পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের খেলাধুলায় বাস্তব জীবনের ট্রমা প্রতিফলিত হয়। তারা খেলনার মাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রক্রিয়াজাত করার চেষ্টা করে - যা একদিকে স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়া, অন্যদিকে একটি সতর্ক সংকেতও।

এই জায়গায় এসে অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর খেলা থামিয়ে দেওয়া নয়, বরং সেই খেলার ভেতরের বার্তাটি বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। যদি দেখেন তার খেলায় ভয়, সহিংসতা বা অস্বাভাবিক আচরণ বারবার ফিরে আসছে, তাহলে তার সঙ্গে কথা বলুন, নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করুন এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, শিশুরা কথা দিয়ে সবসময় নিজেদের প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু খেলায় তারা সব বলে দেয় - তাদের ভয়, অভিজ্ঞতা, আনন্দ আর শেখা প্রতিটি আচরণ। তাই সন্তানের খেলাকে অবহেলা নয়, বরং গুরুত্ব দিয়ে দেখুন। কারণ এই খেলাই অনেক সময় বলে দেয়, সে কেমন পৃথিবীতে বড় হচ্ছে।

সূত্র: আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস, ইউনিসেফ, সাইকোলজি টুডে, হার্ভার্ড সেন্টার অন দ্য ডেভেলপিং চাইল্ড

এএমপি/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।