জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ ও সচেতনতার বিকল্প নেই
ড. সৈয়দ হুমায়ুন কবির
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস এলেই ‘স্বাস্থ্য’-নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি, পরিকল্পনা ও সচেতনতা মূলক বক্তব্য নতুন করে উচ্চারিত হয়। গণমাধ্যম, নীতি নির্ধারক এবং বিভিন্ন সংস্থা স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো-স্বাস্থ্য এখনো সমাজের অনেক মানুষের জন্য অধরা এক মৌলিক অধিকার হিসেবেই রয়ে গেছে। বিশেষ করে প্রান্তিক ও সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে মান সম্মত স্বাস্থ্যসেবা এখনো সহজলভ্য নয়। চিকিৎসা সেবা পাওয়া মানেই যে স্বাস্থ্য নিশ্চিত হওয়া, এমন ধারণ পুরোপুরি সঠিক নয়; কারণ স্বাস্থ্য কেবল রোগের চিকিৎসা নয়, বরং শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার সমন্বিত অবস্থা।
এক্ষেত্রে একটি কার্যকর, সহজলভ্য এবং সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে প্রতিরোধ মূলক সেবা, সময়োপযোগী চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা-সবকিছু একসঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে। আর এই পুরো কাঠামোর ভিত্তি হতে হবে শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। কারণ প্রাথমিক স্তরে যদি রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিশ্চিত করা যায়, তবে জটিল রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একইসঙ্গে এটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ কমায় এবং জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা আরও সাশ্রয় ও কার্যকর করে তোলে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অসম বণ্টন। শহর ও গ্রাম, সুবিধাভোগী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্য সেবার যে বৈষম্য রয়েছে, তা এখনো সুস্পষ্ট এবং উদ্বেগজনক। শহরাঞ্চলে তুলনামূলকভাবে উন্নত হাসপাতাল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা থাকলেও গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় এসব সেবা অনেকটাই সীমিত। ফলে গ্রামাঞ্চলে মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যও অনেক সময় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, যা সময়, অর্থ ও ঝুঁকি-সব দিক থেকেই তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।
এই বৈষম্যের কারণে অনেক মানুষ সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পায় না। অনেকক্ষেত্রে রোগ প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত না হয়ে জটিল আকার ধারণ করে, যা পরবর্তীতে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি এবং মৃত্যু ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, একটি বড় জনগোষ্ঠী এখনো রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে ন্যূনতম সচেতনতা থেকেও বঞ্চিত। স্বাস্থ্যবিধি মানা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা, টিকাদানের গুরুত্ব বোঝা কিংবা পুষ্টিকর খাদ্যা অভ্যাস গড়ে তোলার মতো মৌলিক বিষয় গুলো অনেকের কাছেই এখনো অজানা বা অবহেলিত।

অথচ একটি কার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কেবল রোগের চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা কে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা-এসবই একটি সুস্থ সমাজ গঠনের মূলভিত্তি। তাই স্বাস্থ্যখাতে বৈষম্য দূর করে প্রাথমিক পর্যায়ে সবার জন্য সমান ও মান সম্মত সেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে হাম ও ডেঙ্গু পুনরুত্থানের মাধ্যমে। একসময় নিয়ন্ত্রণে থাকা হাম রোগটি আবার কিছু এলাকায় দেখা দিচ্ছে, যা আমাদের টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা, অনিয়ম কিংবা সচেতনতার ঘাটতিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতা, ভুল ধারণা কিংবা সেবার অপ্রাপ্য তার কারণে শিশুরা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা পাচ্ছে না। ফলে সংক্রামক রোগ সহজেই ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে, যা একটি সুসংগঠিত জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত।
অন্যদিকে ডেঙ্গু এখন প্রায় প্রতি বছরই নগর জীবনের এক ভয়াবহ আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। বর্ষা মৌসুম এলেই হাসপাতাল গুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে যায়, আর নগরবাসীকে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হয়। অথচ ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূল উপায় অত্যন্ত মৌলিক-পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, জমে থাকা পানি অপসারণ, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সর্বোপরি জনসচেতনতা বৃদ্ধি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না বা ধারাবাহিকতা বজায় থাকে না। অনেক সময় উদ্যোগ গুলো মৌসুমি বা সাময়িক হয়ে থাকে, যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে-আমরা কি এখনো প্রতিক্রিয়াশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যেই আটকে আছি? অর্থাৎ, রোগ ছড়িয়ে পড়ার পরই আমরা তৎপর হই, কিন্তু আগে ভাগে প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা গ্রহণে যথেষ্ট গুরুত্ব দিই না। যদি সত্যিই একটি টেকসই ও কার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, তবে আমাদের এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিরোধ কেন্দ্রিক, পরিকল্পিত এবং দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে।
অবশ্য স্বাস্থ্যখাতে অগ্রগতিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। শিশু মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারি সময় বাংলাদেশের টিকা দান কার্যক্রম দ্রুততা ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হওয়ায় তা আন্তর্জাতিক ভাবে প্রশংসিত হয়েছে। সীমিত সময়ের মধ্যেও এই ধরনের সাফল্য দেশের সক্ষমতা ও সম্ভাবনার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তুলে ধরে।
তবে এই অর্জনের আড়ালে এখনো কিছু কঠিন ও অস্বস্তিকর বাস্তবতা রয়ে গেছে, যা আমাদের দৃষ্টি এড়ানো উচিত নয়। মাতৃ মৃত্যুর হার এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি, এবং কিশোরী গর্ভধারণ উচ্চহার একটি বড় সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পুষ্টিহীনতা, প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং স্বাস্থ্যসেবায় অসম প্রবেশাধিকারের মতো সমস্যা। ফলে বোঝা যায়, উন্নয়ন ঘটলেও তা এখনো সমানভাবে সমাজের সব স্তরে পৌঁছাতে পারেনি; বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এখনো অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়-টেকসই ও অন্তর্ভুক্তি মূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা জোরদার করা, প্রতিরোধ মূলক অবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং কার্যকর নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সুসমন্বয় নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। শুধু চিকিৎসা অবকাঠামো বৃদ্ধি করলেই হবে না; বরং স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশকে সেই পথেই এগোতে হবে, তবে আরও বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী কৌশল গ্রহণ মাধ্যমে। স্থানীয় বাস্তবতা, জনসংখ্যার চাহিদা এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে স্বাস্থ্য সেবা সত্যিকার অর্থেই সবার জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয় এবং কার্যকর হয়ে ওঠে।
স্বাস্থ্যখাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন দীর্ঘ মেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ। শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানো, নারী ও কিশোরী বান্ধব স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা এবং পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এসব উদ্যোগ টেকসই হবে না।
একই সঙ্গে সমাজের ভূমিকা এখানেও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ততা ছাড়া স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব নয়। কারণ স্বাস্থ্য কেবল চিকিৎসকের দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামাজিক চর্চা, যা প্রতিটি মানুষের আচরণ ও অভ্যাসের সঙ্গে জড়িত।
স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য গুলো কেবল আনুষ্ঠানিক শ্লোগান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হবে না; বরং এগুলোকে বাস্তব জীবনে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। একটি সুস্থ ও সচেতন সমাজ গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী ও জনবান্ধব নীতি প্রণয়ন, সেই নীতির সঠিক ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, এবং সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় ও আন্তরিক অংশগ্রহণ। সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যখাতের পেশাজীবী এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
লেখক: জনস্বাস্থ্য ও ক্যানসারর প্রতিরোধ গবেষক, সভাপতি ওয়ার্ল্ড ক্যানসার সোসাইটি বাংলাদেশ
এসএকেওয়াই