শুধু প্রাণায়ামেই কমতে পারে স্ট্রেস
দিনভর ব্যস্ততা, কাজের চাপ আর অজস্র চিন্তার ভিড়ে অনেকেই এখন মানসিকভাবে ক্লান্ত। রাতে ঘুম এলেও মন শান্ত থাকে না, ছোট বিষয়েও বিরক্তি বাড়ে। এমন অবস্থায় অনেকেই সমাধান খোঁজেন জটিল পথে।
অথচ গবেষণা বলছে - শুধু নিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাসের অভ্যাসও মানসিক স্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রাচীন যোগচর্চার একটি অংশ প্রাণায়াম - যা মূলত সচেতনভাবে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার পদ্ধতি - নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে। সেসব গবেষণা থেকে কী জানা যাচ্ছে, জেনে নিন -
স্ট্রেস কমাতে কী ভূমিকা রাখে?
২০২২ সালে প্রকাশিত একটি র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল্ড স্টাডিতে দেখা গেছে, নিয়মিত প্রাণায়াম অনুশীলন শরীরের স্ট্রেস প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। ভারতের গভর্নমেন্ট ইয়োগা অ্যান্ড ন্যাচারোপ্যাথি মেডিক্যাল কলেজ এবং শ্রী রামচন্দ্র মেডিক্যাল কলেজ-এর গবেষকেরা এই গবেষণা পরিচালনা করেন।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রাণায়াম চর্চার ফলে কর্টিসল (স্ট্রেস হরমোন) প্রতিক্রিয়ায় পরিবর্তন দেখা যায়, যা শরীরের স্ট্রেসের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
সহজভাবে বললে - নিয়মিত শ্বাসের ব্যায়াম শরীরকে ‘স্ট্রেস হ্যান্ডলিং মোডে আরও দক্ষ করে তুলতে পারে।
মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে কী ঘটে?
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ন্যাচারাল মেডিসিন-এর একটি ক্লিনিকাল গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাণায়াম করলে হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি (এইচআরভি) বৃদ্ধি পায়।
এইচআরভি বেশি থাকা মানে হলো –
- শরীরের প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম (রিল্যাক্সেশন সিস্টেম) বেশি সক্রিয়
- মানসিক চাপ মোকাবিলার ক্ষমতা বেশি
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ধীর ও গভীর শ্বাস নেওয়া এবং শ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করা - এই দুটো বিষয়ই স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাৎক্ষণিক প্রভাবও দেখা যায়
ভারতের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র কয়েক মিনিটের প্রাণায়াম অনুশীলনেও শরীরের স্নায়ুতন্ত্রে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে - যদিও এই পরিবর্তনগুলো আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
তাহলে মানসিক স্বাস্থ্যে কীভাবে উপকার করে?
গবেষণাগুলোর সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে -
- শ্বাস ধীর করলে মস্তিষ্ক ফাইট-অর-ফ্লাইট অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে
- স্নায়ুতন্ত্র শান্ত হয়
- স্ট্রেসের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হয়
- আবেগ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়
অর্থাৎ, প্রাণায়াম সরাসরি মুড ভালো করে, এমনটা না হলেও, এটি এমন একটি শারীরিক পরিবেশ তৈরি করে যেখানে মন স্বাভাবিকভাবেই স্থির হতে শুরু করে।
তবে কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে
সব গবেষণাই একই রকম শক্তিশালী নয়। অনেক স্টাডিতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কম। কোনোটায় সময়কাল তুলনামূলক ছোট। আবার বিভিন্ন ধরনের প্রণায়াম আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়নি।
তাই গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি ও বড় পরিসরের গবেষণা এখনও প্রয়োজন।
মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে সবসময় জটিল সমাধান দরকার হয় না। বৈজ্ঞানিক গবেষণাও এখন ইঙ্গিত দিচ্ছে - সঠিকভাবে শ্বাস নেওয়ার মতো সহজ একটি অভ্যাসই স্ট্রেস কমাতে, মনকে শান্ত করতে এবং শরীরকে ভারসাম্যে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
সূত্র: এক্সপ্লোর জার্নাল (২০২২), জার্নাল অব সাইকোসোম্যাটিক রিসার্চ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ন্যাচারাল মেডিসিন, এস-ভিয়াসা ইউনিভার্সিটি
এএমপি/এমএস